Dhaka ০৯:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পুষ্টিহীনতায় ভুগছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৬:৩৮:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ Time View
10 / 100 SEO Score

চলছে মুসলমান সম্প্রদায়ের সিয়াম সাধনার মাস মাহে রমজান। অন্যান্য মুসলিম দেশে এ সময় দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার নজির থাকলেও বাংলাদেশে তার উলটো চিত্র দেখা যাচ্ছে। রমজান এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা। চাল, ডাল, তেল, শাক-সবজি, ডিম, ব্রয়লার মুরগিসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে।

কয়েক দিনের ব্যবধানে সবজির দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। সারা দিন রোজা রেখে ইফতার ও সেহেরিতে প্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। বেঁচে থাকার জন্য খাবার জুটলেও পুষ্টির চাহিদা থেকে যাচ্ছে অপূর্ণ; ফলে বাড়ছে অসুস্থতা ও নানা রোগের ঝুঁকি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রোটিনের ঘাটতির কারণে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি না মিললে তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। দীর্ঘ মেয়াদে এই অপুষ্টি দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক বা গ্লোবাল হাংগার ইনডেক্স (জিএইচ আই) ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের ১১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। শিশু ও নারীর অপুষ্টির হার উদ্বেগজনক। দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশের বেশি খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অপুষ্টিজনিত কারণে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং ৩ শতাংশ শিশু জন্মের পাঁচ বছরের মধ্যে মারা যাচ্ছে। অপুষ্টির ফলে দেশে ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার শিশু খর্বকায় এবং ১১ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার। অপুষ্টি ও খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতা গ্রামীণ ও শহরতলির নারীদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে; নারীদের পুষ্টির ঘাটতি পরবর্তীকালে গর্ভজাত শিশুর জন্যও ক্ষতিকর।

ইউএসএআইডির তথ্যমতে, বাংলাদেশে ৫০ শতাংশ গর্ভবতী মা ও শিশু আগেই পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ খাবারের পরিমাণ কমালে সামনে পুষ্টিহীনতার পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে। দেশে গরিবের প্রোটিন হিসেবে পরিচিত ডিম ও দুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশু-কিশোরদের ওপর। এ বিষয়ে কথা হয় গৃহকর্মী স্বপ্না বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাজারে সবকিছুর দাম এত বেড়েছে যে, ঠিকমতো কিছুই কেনা যায় না। ভাতের সঙ্গে নুন-মরিচ দিয়েই দিন পার করতে হয়। এখন কাঁচা মরিচের দামও বেশি, শুকনা মরিচ দিয়ে ভাত খেয়ে চলতে হচ্ছে। বাসাবাড়িতে কাজ করে যে টাকা পান, তা দিয়ে ঘরভাড়া দেন আর গ্রামের মা ও সন্তানদের কাছে টাকা পাঠান। শরীর দুর্বল লাগে বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে, গৃহকর্মী নাহার বেগম জানান, ছয় সদস্যের পরিবারে তিন সন্তান ও বৃদ্ধ শাশুড়ি রয়েছেন। নাহার মাসে ১০ হাজার টাকা আয় করেন, স্বামী রিকশাচালক সবুজ মিয়া আয় করেন ১৫ হাজার টাকা। এই ২৫ হাজার টাকায় আগে সংসার চললেও এখন কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিনের পুষ্টিকর খাদ্যের তালিকায় শর্করা, আমিষ, ভিটামিন, খনিজ, পানি ও চর্বি—এই ছয় ধরনের উপাদানের সমন্বয় প্রয়োজন। দৈনিক খাদ্যে ৫০-৬০ শতাংশ শর্করা, ১৫ শতাংশ প্রোটিন ও ৩০-৩৫ শতাংশ স্নেহজাতীয় খাবার থাকা দরকার। সুষম খাবারের ঘাটতি হলে তা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দীর্ঘ মেয়াদে কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়।

ল্যাবএইড হাসপাতালের পুষ্টিবিদ সামিয়া তাসনিম বলেন, দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষ কেবল পেট ভরানোর জন্য খাবেন কিন্তু এতে পুষ্টি নিশ্চিত হয় না। তারা মূলত শর্করানির্ভর খাবার খান, প্রোটিনের ঘাটতি থাকে। ফলে আয়রনের ঘাটতি দেখা দেয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ওজন কমে, শিশুদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় ও পেশির গঠন ঠিকমতো হয় না। তিনি আরও বলেন, ফল কিনতে না পারলে রঙিন শাক-সবজি থেকে ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়—গাজর, মিষ্টি কুমড়া, বিটরুট ফলের বিকল্প পুষ্টির উত্স হতে পারে। মাছ-মাংস বা দুধ কেনা সম্ভব না হলে ডিম ও ডাল থেকে প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে; ডাল সহজলভ্য হওয়ায় পরিবারের সবাই তা খেতে পারেন।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আলোচিত সংবাদ

পুষ্টিহীনতায় ভুগছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ

Update Time : ০৬:৩৮:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
10 / 100 SEO Score

চলছে মুসলমান সম্প্রদায়ের সিয়াম সাধনার মাস মাহে রমজান। অন্যান্য মুসলিম দেশে এ সময় দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার নজির থাকলেও বাংলাদেশে তার উলটো চিত্র দেখা যাচ্ছে। রমজান এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা। চাল, ডাল, তেল, শাক-সবজি, ডিম, ব্রয়লার মুরগিসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে।

কয়েক দিনের ব্যবধানে সবজির দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। সারা দিন রোজা রেখে ইফতার ও সেহেরিতে প্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। বেঁচে থাকার জন্য খাবার জুটলেও পুষ্টির চাহিদা থেকে যাচ্ছে অপূর্ণ; ফলে বাড়ছে অসুস্থতা ও নানা রোগের ঝুঁকি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রোটিনের ঘাটতির কারণে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি না মিললে তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। দীর্ঘ মেয়াদে এই অপুষ্টি দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক বা গ্লোবাল হাংগার ইনডেক্স (জিএইচ আই) ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের ১১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। শিশু ও নারীর অপুষ্টির হার উদ্বেগজনক। দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশের বেশি খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অপুষ্টিজনিত কারণে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং ৩ শতাংশ শিশু জন্মের পাঁচ বছরের মধ্যে মারা যাচ্ছে। অপুষ্টির ফলে দেশে ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার শিশু খর্বকায় এবং ১১ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার। অপুষ্টি ও খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতা গ্রামীণ ও শহরতলির নারীদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে; নারীদের পুষ্টির ঘাটতি পরবর্তীকালে গর্ভজাত শিশুর জন্যও ক্ষতিকর।

ইউএসএআইডির তথ্যমতে, বাংলাদেশে ৫০ শতাংশ গর্ভবতী মা ও শিশু আগেই পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ খাবারের পরিমাণ কমালে সামনে পুষ্টিহীনতার পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে। দেশে গরিবের প্রোটিন হিসেবে পরিচিত ডিম ও দুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশু-কিশোরদের ওপর। এ বিষয়ে কথা হয় গৃহকর্মী স্বপ্না বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাজারে সবকিছুর দাম এত বেড়েছে যে, ঠিকমতো কিছুই কেনা যায় না। ভাতের সঙ্গে নুন-মরিচ দিয়েই দিন পার করতে হয়। এখন কাঁচা মরিচের দামও বেশি, শুকনা মরিচ দিয়ে ভাত খেয়ে চলতে হচ্ছে। বাসাবাড়িতে কাজ করে যে টাকা পান, তা দিয়ে ঘরভাড়া দেন আর গ্রামের মা ও সন্তানদের কাছে টাকা পাঠান। শরীর দুর্বল লাগে বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে, গৃহকর্মী নাহার বেগম জানান, ছয় সদস্যের পরিবারে তিন সন্তান ও বৃদ্ধ শাশুড়ি রয়েছেন। নাহার মাসে ১০ হাজার টাকা আয় করেন, স্বামী রিকশাচালক সবুজ মিয়া আয় করেন ১৫ হাজার টাকা। এই ২৫ হাজার টাকায় আগে সংসার চললেও এখন কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিনের পুষ্টিকর খাদ্যের তালিকায় শর্করা, আমিষ, ভিটামিন, খনিজ, পানি ও চর্বি—এই ছয় ধরনের উপাদানের সমন্বয় প্রয়োজন। দৈনিক খাদ্যে ৫০-৬০ শতাংশ শর্করা, ১৫ শতাংশ প্রোটিন ও ৩০-৩৫ শতাংশ স্নেহজাতীয় খাবার থাকা দরকার। সুষম খাবারের ঘাটতি হলে তা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দীর্ঘ মেয়াদে কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়।

ল্যাবএইড হাসপাতালের পুষ্টিবিদ সামিয়া তাসনিম বলেন, দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষ কেবল পেট ভরানোর জন্য খাবেন কিন্তু এতে পুষ্টি নিশ্চিত হয় না। তারা মূলত শর্করানির্ভর খাবার খান, প্রোটিনের ঘাটতি থাকে। ফলে আয়রনের ঘাটতি দেখা দেয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ওজন কমে, শিশুদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় ও পেশির গঠন ঠিকমতো হয় না। তিনি আরও বলেন, ফল কিনতে না পারলে রঙিন শাক-সবজি থেকে ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়—গাজর, মিষ্টি কুমড়া, বিটরুট ফলের বিকল্প পুষ্টির উত্স হতে পারে। মাছ-মাংস বা দুধ কেনা সম্ভব না হলে ডিম ও ডাল থেকে প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে; ডাল সহজলভ্য হওয়ায় পরিবারের সবাই তা খেতে পারেন।