Dhaka ০৪:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান চুক্তি নেতানিয়াহুর জন্য বড় ধাক্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
6 / 100 SEO Score

 

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সম্পাদিত সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থানকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে এই চুক্তির ফলে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন খোদ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটনকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা করার যে দাপুটে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি তিনি গড়ে তুলেছিলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদ এবং ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এতকাল ধরে একটি সুনির্দিষ্ট দর্শনের ওপর নিজের রাজনৈতিক পরিচয় টিকিয়ে রেখেছিলেন। তার মূল দাবি ছিল যে তিনি একাই আমেরিকার প্রশাসনকে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের স্বার্থে চালিত করতে পারেন। মার্কিন রিপাবলিকান পার্টির নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে তিনি নিজেকে এমন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে প্রমাণ করেছিলেন যিনি যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করতে সক্ষম।

এক সময় আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদরা তাকে রসিকতা করে ‘আমেরিকান হুইস্পারার’ বা যুক্তরাষ্ট্রের কানপড়া দাতা বলে ডাকতেন, কারণ তিনি একটি ফোন কলেই ওয়াশিংটনের কৌশলগত সমীকরণ বদলে দিতে পারতেন।তবে গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে যে নতুন চুক্তি করেছেন, তা নেতানিয়াহুর এতকালের সাজানো গল্পকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছে।

বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদরা বলছেন যে এখন ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারণ করার পরিবর্তে নেতানিয়াহু আমেরিকার তৈরি করা শর্তগুলো মুখ বুজে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের দেশের স্বার্থে একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান খুঁজছেন যেখানে ইসরায়েলের আপত্তি বা ওজর-আপত্তিগুলোকে তিনি কেবল একটি সামান্য প্রতিবন্ধকতা ছাড়া আর কিছুই ভাবছেন না। এমনকি এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন যে তিনি নেতানিয়াহুকে কোনো নির্দেশ দিলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তা করতে বাধ্য হন।

সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ডেনিস রস বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে জানিয়েছেন যে নেতানিয়াহু এখন নিজের দেশেও এক চরম উভয়সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। একদিকে যুদ্ধ শেষ করতে মরিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র চাপ, অন্যদিকে লেবাননে কোনো ধরনের সামরিক ছাড় দেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নিজের কট্টর রাজনৈতিক ভোটব্যাংক।

এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এখন পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করলে দেশে তীব্র রাজনৈতিক ক্ষোভের মুখে পড়তে হবে, আবার যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হবে। এর ফলে আগামী শরৎকালীন সাধারণ নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্পূর্ণ একাকী হয়ে পড়েছেন।

নেতানিয়াহুর সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবিভ বুশিনস্কি এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন যে, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিটি মূলত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের জন্য একটি চূড়ান্ত ও মরণকামড়। তিনি কেবল ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধেই পরাজিত হননি, বরং নিজের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও হারিয়েছেন। তিনি এখন আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্পের সঙ্গেও একটি বড় ধরনের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন।’

অবশ্য এই বিষয়ে নেতানিয়াহুর দাপ্তরিক কার্যালয় থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে চলতি মাসের এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছিলেন যে ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক মূলত দুই অংশীদারের মতো, যেখানে অনেক বিষয়ে মিল থাকলেও কিছু বিষয়ে অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বিশাল সাফল্যকে খাটো করে দেখানোর জন্য একটি পদ্ধতিগত প্রচারণ চালানো হচ্ছে।

হোয়াইট হাউস এবং মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করেছেন যে ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি এখনও আগের মতোই অত্যন্ত সুদৃঢ় ও অটুট রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান যে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর হুমকি পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের বাধ্যবাধকতা নেই এবং দেশটির আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য এখন মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি যুদ্ধ থেকে নিজেদের পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া এবং আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

আঞ্চলিক রাজনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে ওয়াশিংটন এখন সরাসরি তেহরানের সঙ্গে গোপনে ও প্রকাশ্যে আলোচনা চালাচ্ছে এবং লেবানন সংঘাতকে একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্যে এনে যুদ্ধবিরতি তদারকির বিশেষ মেকানিজম তৈরি করেছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলকে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে।

অতীতে যাকে আমেরিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী ভাবত, সেই নেতানিয়াহুকে এখন শান্তি চুক্তির পথে একটি বড় বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এমনকি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও চুক্তি বিরোধীদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে বিশ্বের একমাত্র শক্তিশালী বন্ধু আমেরিকার সমালোচনা করার আগে তাদের ভাবা উচিত।

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক আলী ভায়েজ মনে করেন যে ইরান এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার এই ফাটল বা দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করবে। লেবাননে ইসরায়েলের যেকোনো ধরনের নতুন সামরিক পদক্ষেপকে ইরান মূলত ট্রাম্পের শান্তি কূটনীতি নস্যাৎ করার চক্রান্ত হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবে, যার ফলে হোয়াইট হাউসকে তাদের মিত্র দেশ অথবা এই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি—যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হবে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো নেতানিয়াহু এতকাল ধরে ডেমোক্র্যাটদের ঠেকাতে মার্কিন রিপাবলিকান পার্টির যে রাজনৈতিক সুরক্ষা জাল বা সেফটি নেট ব্যবহার করে আসছিলেন, তা এখন পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়েছে। মার্কিন বিশ্লেষকরা বলছেন যে রিপাবলিকানরা নেতানিয়াহুর স্বার্থে কোনোভাবেই তাদের নিজস্ব পপুলার নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির বাইরে যাবেন না।

এ ছাড়া ইরানের থিওক্র্যাটিক বা ধর্মীয় শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে দুটি প্রধান বাজি ধরে নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সাজিয়েছিলেন, তার একটিও সফল হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবসহ অন্যান্য প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো এখন ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়া ধীর করে দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে নিজেদের কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনর্স্থাপন করছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন

 

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

18 − 8 =

About Author Information

ইরান চুক্তি নেতানিয়াহুর জন্য বড় ধাক্কা

Update Time : ০৭:৩২:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
6 / 100 SEO Score

 

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সম্পাদিত সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থানকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে এই চুক্তির ফলে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন খোদ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটনকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা করার যে দাপুটে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি তিনি গড়ে তুলেছিলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদ এবং ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এতকাল ধরে একটি সুনির্দিষ্ট দর্শনের ওপর নিজের রাজনৈতিক পরিচয় টিকিয়ে রেখেছিলেন। তার মূল দাবি ছিল যে তিনি একাই আমেরিকার প্রশাসনকে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের স্বার্থে চালিত করতে পারেন। মার্কিন রিপাবলিকান পার্টির নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে তিনি নিজেকে এমন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে প্রমাণ করেছিলেন যিনি যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করতে সক্ষম।

এক সময় আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদরা তাকে রসিকতা করে ‘আমেরিকান হুইস্পারার’ বা যুক্তরাষ্ট্রের কানপড়া দাতা বলে ডাকতেন, কারণ তিনি একটি ফোন কলেই ওয়াশিংটনের কৌশলগত সমীকরণ বদলে দিতে পারতেন।তবে গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে যে নতুন চুক্তি করেছেন, তা নেতানিয়াহুর এতকালের সাজানো গল্পকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছে।

বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদরা বলছেন যে এখন ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারণ করার পরিবর্তে নেতানিয়াহু আমেরিকার তৈরি করা শর্তগুলো মুখ বুজে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের দেশের স্বার্থে একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান খুঁজছেন যেখানে ইসরায়েলের আপত্তি বা ওজর-আপত্তিগুলোকে তিনি কেবল একটি সামান্য প্রতিবন্ধকতা ছাড়া আর কিছুই ভাবছেন না। এমনকি এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন যে তিনি নেতানিয়াহুকে কোনো নির্দেশ দিলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তা করতে বাধ্য হন।

সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ডেনিস রস বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে জানিয়েছেন যে নেতানিয়াহু এখন নিজের দেশেও এক চরম উভয়সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। একদিকে যুদ্ধ শেষ করতে মরিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র চাপ, অন্যদিকে লেবাননে কোনো ধরনের সামরিক ছাড় দেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নিজের কট্টর রাজনৈতিক ভোটব্যাংক।

এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এখন পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করলে দেশে তীব্র রাজনৈতিক ক্ষোভের মুখে পড়তে হবে, আবার যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হবে। এর ফলে আগামী শরৎকালীন সাধারণ নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্পূর্ণ একাকী হয়ে পড়েছেন।

নেতানিয়াহুর সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবিভ বুশিনস্কি এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন যে, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিটি মূলত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের জন্য একটি চূড়ান্ত ও মরণকামড়। তিনি কেবল ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধেই পরাজিত হননি, বরং নিজের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও হারিয়েছেন। তিনি এখন আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্পের সঙ্গেও একটি বড় ধরনের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন।’

অবশ্য এই বিষয়ে নেতানিয়াহুর দাপ্তরিক কার্যালয় থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে চলতি মাসের এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছিলেন যে ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক মূলত দুই অংশীদারের মতো, যেখানে অনেক বিষয়ে মিল থাকলেও কিছু বিষয়ে অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বিশাল সাফল্যকে খাটো করে দেখানোর জন্য একটি পদ্ধতিগত প্রচারণ চালানো হচ্ছে।

হোয়াইট হাউস এবং মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করেছেন যে ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি এখনও আগের মতোই অত্যন্ত সুদৃঢ় ও অটুট রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান যে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর হুমকি পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের বাধ্যবাধকতা নেই এবং দেশটির আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য এখন মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি যুদ্ধ থেকে নিজেদের পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া এবং আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

আঞ্চলিক রাজনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে ওয়াশিংটন এখন সরাসরি তেহরানের সঙ্গে গোপনে ও প্রকাশ্যে আলোচনা চালাচ্ছে এবং লেবানন সংঘাতকে একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্যে এনে যুদ্ধবিরতি তদারকির বিশেষ মেকানিজম তৈরি করেছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলকে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে।

অতীতে যাকে আমেরিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী ভাবত, সেই নেতানিয়াহুকে এখন শান্তি চুক্তির পথে একটি বড় বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এমনকি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও চুক্তি বিরোধীদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে বিশ্বের একমাত্র শক্তিশালী বন্ধু আমেরিকার সমালোচনা করার আগে তাদের ভাবা উচিত।

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক আলী ভায়েজ মনে করেন যে ইরান এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার এই ফাটল বা দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করবে। লেবাননে ইসরায়েলের যেকোনো ধরনের নতুন সামরিক পদক্ষেপকে ইরান মূলত ট্রাম্পের শান্তি কূটনীতি নস্যাৎ করার চক্রান্ত হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবে, যার ফলে হোয়াইট হাউসকে তাদের মিত্র দেশ অথবা এই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি—যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হবে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো নেতানিয়াহু এতকাল ধরে ডেমোক্র্যাটদের ঠেকাতে মার্কিন রিপাবলিকান পার্টির যে রাজনৈতিক সুরক্ষা জাল বা সেফটি নেট ব্যবহার করে আসছিলেন, তা এখন পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়েছে। মার্কিন বিশ্লেষকরা বলছেন যে রিপাবলিকানরা নেতানিয়াহুর স্বার্থে কোনোভাবেই তাদের নিজস্ব পপুলার নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির বাইরে যাবেন না।

এ ছাড়া ইরানের থিওক্র্যাটিক বা ধর্মীয় শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে দুটি প্রধান বাজি ধরে নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সাজিয়েছিলেন, তার একটিও সফল হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবসহ অন্যান্য প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো এখন ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়া ধীর করে দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে নিজেদের কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনর্স্থাপন করছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন