Dhaka ০৯:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ বাতিলের সিদ্ধান্ত: চিকিৎসা খরচ কি বাড়বে

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
10 / 100 SEO Score

 

*** আপাতত বহাল থাকছে পুরোনো মূল্য নিয়ন্ত্রণ
**** নতুন করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হবে
****প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে সিদ্ধান্ত সরকারের
***দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের বাড়তে পারে ব্যয়

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি–২০২৬ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে ওষুধ শিল্পে স্বস্তি দেখা দিলেও সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসায় নিয়মিত ব্যবহৃত ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে বিদ্যমান তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী নতুন তালিকা তৈরি করা হবে।

আগস্ট মাসের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬’ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’ অনুসারে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি করা তালিকাটি প্রণয়নের সময় ওই পরিষদ কার্যকর ছিল না। টাস্কফোর্সের মাধ্যমে তালিকা তৈরির কারণে এতে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ছিল বলে সরকার মনে করছে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত জানিয়েছেন, নতুন তালিকা করার প্রয়োজনেই ২০২৬ সালের তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন তা করা হয়নি। এখন জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নতুন তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

দেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রথম করা হয় ১৯৯৪ সালে। ওই তালিকায় ছিল ১১৭টি ওষুধ। পরে ২০১৬ সালের নীতিতে তালিকাটি বাড়িয়ে ২৮৫টি করা হয়। এরপর ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৯৫টি করে।

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এসব ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা থাকা। ফলে ২৯৫টি ওষুধের তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্তের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে—এর মধ্যে বাড়তি ১৭৮টি ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎ কী হবে।

তবে ২০২৬ সালের তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্ত মানেই সব ওষুধ তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের মূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া নয়। ১৯৯৪ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং ওই তালিকাভুক্ত ওষুধের সরকারি মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আপাতত বহাল রয়েছে। ফলে নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত পুরোনো ব্যবস্থাই কার্যকর থাকবে।

ওষুধ শিল্পের পক্ষ থেকে নতুন মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি ছিল। উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের মূল্য, জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ, বিনিময় হার এবং বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হলে শিল্পের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে বলে তাদের বক্তব্য ছিল।

এ কারণে নতুন মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্তকে শিল্প খাত ইতিবাচকভাবে দেখছে। তবে ভোক্তা ও জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগের জায়গা ভিন্ন। তাদের মতে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকার পরিধি কমে গেলে প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ সরকারি মূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এর ফলে বাজারে মূল্য নির্ধারণে কোম্পানিগুলোর স্বাধীনতা বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়তে পারে রোগীদের ওপর।

সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলন মনে করেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণ এমনিতেই জটিল একটি প্রক্রিয়া। ওষুধ কোম্পানিগুলোর দেওয়া উৎপাদন ব্যয় ও মার্কআপ যাচাই করতে সরকারি কর্মকর্তাদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়। এ অবস্থায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরও শিথিল হলে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত মূল্য চাপানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের বড় একটি অংশ সাধারণ মানুষকে নিজস্ব অর্থে বহন করতে হয়। এর মধ্যে ওষুধ অন্যতম প্রধান ব্যয়ের খাত। ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবারের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর।

বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে রোগীদের নিয়মিত ওষুধ কিনতে হয়। এসব ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা তৈরি হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ বাড়তে পারে।

লেখক ও প্রকৌশলী কল্লোল মোস্তফার মতে, ১৯৯৪ সালের ১১৭টি ওষুধের তালিকা বর্তমান সময়ের প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। গত তিন দশকে বাজারে অনেক নতুন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ এসেছে। এ কারণে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণের প্রয়োজন ছিল। তাঁর আশঙ্কা, নতুন তালিকা কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ মূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

অন্যদিকে স্বাস্থ্যবিষয়ক সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান মনে করেন, শুধু তালিকায় ওষুধের নাম অন্তর্ভুক্ত করলেই সাধারণ মানুষ সুফল পায় না। উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণে সরকারি তদারকি কার্যকর না হলে তালিকাভুক্ত অনেক ওষুধ বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া নাও যেতে পারে।

তাঁর মতে, একই জেনেরিকের অতিরিক্ত বা মিশ্র ফর্মুলেশনের বিভিন্ন ব্র্যান্ড বাজারে তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। ফলে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণও জরুরি।

সরকারের অবস্থান হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি তালিকাটি উদ্দেশ্যগতভাবে বাতিল করা হয়নি; বরং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার কারণে নতুন করে তালিকা তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে তালিকা প্রণয়ন করার কথা থাকলেও তখন সেই কমিটি ছিল না। একটি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। এ কারণে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি সংশোধন করে আইন অনুযায়ী নতুন তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

গত ২৯ জুন জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। ফলে এবার ওই পরিষদের মাধ্যমে নতুন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন তালিকায় কোন কোন ওষুধ অন্তর্ভুক্ত হবে, তার পাশাপাশি এসব ওষুধের মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন। সরকারকে একদিকে ওষুধ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় ও বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতাও নিশ্চিত করতে হবে।

তবে ২০২৬ সালের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্তের ফলে তাৎক্ষণিকভাবে সব ওষুধের দাম বেড়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ পুরোনো মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আপাতত বহাল রয়েছে। বরং উদ্বেগের বিষয় হলো, নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি কত দ্রুত প্রণয়ন করা হয় এবং সেখানে মূল্য নিয়ন্ত্রণের পরিধি কতটা রাখা হয়।

ওষুধ শিল্পের টেকসই বিকাশ ও সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী চিকিৎসা দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের জন্য বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থায় সেই ভারসাম্য কতটা প্রতিফলিত হয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের গতিপথ।

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

four × 4 =

About Author Information

ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ বাতিলের সিদ্ধান্ত: চিকিৎসা খরচ কি বাড়বে

Update Time : ০৭:৪১:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
10 / 100 SEO Score

 

*** আপাতত বহাল থাকছে পুরোনো মূল্য নিয়ন্ত্রণ
**** নতুন করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হবে
****প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে সিদ্ধান্ত সরকারের
***দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের বাড়তে পারে ব্যয়

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি–২০২৬ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে ওষুধ শিল্পে স্বস্তি দেখা দিলেও সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসায় নিয়মিত ব্যবহৃত ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে বিদ্যমান তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী নতুন তালিকা তৈরি করা হবে।

আগস্ট মাসের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬’ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’ অনুসারে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি করা তালিকাটি প্রণয়নের সময় ওই পরিষদ কার্যকর ছিল না। টাস্কফোর্সের মাধ্যমে তালিকা তৈরির কারণে এতে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ছিল বলে সরকার মনে করছে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত জানিয়েছেন, নতুন তালিকা করার প্রয়োজনেই ২০২৬ সালের তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন তা করা হয়নি। এখন জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নতুন তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

দেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রথম করা হয় ১৯৯৪ সালে। ওই তালিকায় ছিল ১১৭টি ওষুধ। পরে ২০১৬ সালের নীতিতে তালিকাটি বাড়িয়ে ২৮৫টি করা হয়। এরপর ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৯৫টি করে।

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এসব ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা থাকা। ফলে ২৯৫টি ওষুধের তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্তের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে—এর মধ্যে বাড়তি ১৭৮টি ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎ কী হবে।

তবে ২০২৬ সালের তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্ত মানেই সব ওষুধ তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের মূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া নয়। ১৯৯৪ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং ওই তালিকাভুক্ত ওষুধের সরকারি মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আপাতত বহাল রয়েছে। ফলে নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত পুরোনো ব্যবস্থাই কার্যকর থাকবে।

ওষুধ শিল্পের পক্ষ থেকে নতুন মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি ছিল। উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের মূল্য, জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ, বিনিময় হার এবং বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হলে শিল্পের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে বলে তাদের বক্তব্য ছিল।

এ কারণে নতুন মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্তকে শিল্প খাত ইতিবাচকভাবে দেখছে। তবে ভোক্তা ও জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগের জায়গা ভিন্ন। তাদের মতে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকার পরিধি কমে গেলে প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ সরকারি মূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এর ফলে বাজারে মূল্য নির্ধারণে কোম্পানিগুলোর স্বাধীনতা বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়তে পারে রোগীদের ওপর।

সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলন মনে করেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণ এমনিতেই জটিল একটি প্রক্রিয়া। ওষুধ কোম্পানিগুলোর দেওয়া উৎপাদন ব্যয় ও মার্কআপ যাচাই করতে সরকারি কর্মকর্তাদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়। এ অবস্থায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরও শিথিল হলে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত মূল্য চাপানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের বড় একটি অংশ সাধারণ মানুষকে নিজস্ব অর্থে বহন করতে হয়। এর মধ্যে ওষুধ অন্যতম প্রধান ব্যয়ের খাত। ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবারের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর।

বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে রোগীদের নিয়মিত ওষুধ কিনতে হয়। এসব ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা তৈরি হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ বাড়তে পারে।

লেখক ও প্রকৌশলী কল্লোল মোস্তফার মতে, ১৯৯৪ সালের ১১৭টি ওষুধের তালিকা বর্তমান সময়ের প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। গত তিন দশকে বাজারে অনেক নতুন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ এসেছে। এ কারণে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণের প্রয়োজন ছিল। তাঁর আশঙ্কা, নতুন তালিকা কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ মূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

অন্যদিকে স্বাস্থ্যবিষয়ক সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান মনে করেন, শুধু তালিকায় ওষুধের নাম অন্তর্ভুক্ত করলেই সাধারণ মানুষ সুফল পায় না। উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণে সরকারি তদারকি কার্যকর না হলে তালিকাভুক্ত অনেক ওষুধ বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া নাও যেতে পারে।

তাঁর মতে, একই জেনেরিকের অতিরিক্ত বা মিশ্র ফর্মুলেশনের বিভিন্ন ব্র্যান্ড বাজারে তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। ফলে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণও জরুরি।

সরকারের অবস্থান হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি তালিকাটি উদ্দেশ্যগতভাবে বাতিল করা হয়নি; বরং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার কারণে নতুন করে তালিকা তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে তালিকা প্রণয়ন করার কথা থাকলেও তখন সেই কমিটি ছিল না। একটি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। এ কারণে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি সংশোধন করে আইন অনুযায়ী নতুন তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

গত ২৯ জুন জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। ফলে এবার ওই পরিষদের মাধ্যমে নতুন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন তালিকায় কোন কোন ওষুধ অন্তর্ভুক্ত হবে, তার পাশাপাশি এসব ওষুধের মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন। সরকারকে একদিকে ওষুধ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় ও বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতাও নিশ্চিত করতে হবে।

তবে ২০২৬ সালের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্তের ফলে তাৎক্ষণিকভাবে সব ওষুধের দাম বেড়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ পুরোনো মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আপাতত বহাল রয়েছে। বরং উদ্বেগের বিষয় হলো, নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি কত দ্রুত প্রণয়ন করা হয় এবং সেখানে মূল্য নিয়ন্ত্রণের পরিধি কতটা রাখা হয়।

ওষুধ শিল্পের টেকসই বিকাশ ও সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী চিকিৎসা দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের জন্য বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থায় সেই ভারসাম্য কতটা প্রতিফলিত হয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের গতিপথ।