ব্যবসার পরিবেশ সংস্কারে উদ্যোগী সরকার
*** ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়েছে সরকার
***কর ও নীতিতে সংস্কারে ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগ
****ডি-রেগুলেশনে কমছে ব্যবসার জটিলতা
***বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়াতে নতুন পদক্ষেপ
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়নে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো, নীতিগত জটিলতা কমানো, করব্যবস্থায় সংস্কার, নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ এবং বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বাজেটে ব্যবসাবান্ধব প্রস্তাব, অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স বা এআইটি সংশোধন, ডি-রেগুলেশন এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের নিয়মিত বৈঠককে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ীদের মতে, দীর্ঘদিনের জটিলতা একসঙ্গে দূর করা সম্ভব নয়। সরকারের নেওয়া সংস্কারগুলোর সুফল পেতে কিছুটা সময় প্রয়োজন। তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের মধ্যে আগের তুলনায় গতি ও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ফলে নীতিগত পর্যায়ে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী দিনে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ব্যবসার পরিবেশ সংস্কারে সরকারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো। ব্যবসায়ীদের সমস্যা শুনতে প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত বৈঠক করছেন। একই সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের আলোচনা হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীদের বাস্তব সমস্যাগুলো নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও বিল্ডের চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তার মতে, আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের বৈঠক বছরে এক-দুবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন নিয়মিত যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। সমস্যা শুনে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এই ধারাবাহিক যোগাযোগের ফলে নীতিনির্ধারণে বাস্তব অভিজ্ঞতা যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়ছে। কোন নিয়ম বা প্রক্রিয়া উদ্যোক্তাদের জন্য বেশি জটিল, কোথায় সময় ও ব্যয় বাড়ছে, এসব বিষয় দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথও তৈরি হচ্ছে।
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বাজেটের বিভিন্ন প্রস্তাবও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতারা। বিশেষ করে এআইটি সংশোধনকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের জন্য বাজেটে বেশকিছু ইতিবাচক প্রস্তাব ও সূচক রাখা হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
করব্যবস্থার জটিলতা কমানো এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে উদ্যোক্তাদের জন্য কাজের পরিবেশ সহজ হবে। একই সঙ্গে নীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হবে। এ কারণে বাজেটীয় সংস্কারের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
ডি-রেগুলেশনে কমবে জটিলতা: ব্যবসা পরিচালনায় অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে ডি-রেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা।
ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অনুমোদন ও জটিল প্রক্রিয়া উদ্যোক্তাদের সময় ও ব্যয় বাড়ায়। এসব ক্ষেত্রে সংস্কার আনা গেলে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ আরো সহজ হবে। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা হলে তারা দ্রুত বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন।
বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে গুরুত্ব: দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি বাড়াতেও সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। আমদানি প্রতিস্থাপক ও রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা, সিঙ্গেল উইন্ডো বাস্তবায়ন, লজিস্টিকস পলিসি বাস্তবায়ন এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা আরো সহজ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্যবসার বিভিন্ন পর্যায়ে সময় ও ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে সিঙ্গেল উইন্ডোর মাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ হলে বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসা শুরু ও পরিচালনা আরো সুবিধাজনক হতে পারে। একই সঙ্গে লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
অর্থায়ন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ: ব্যবসায়ীদের অর্থায়ন ব্যয় কমাতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবুর মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন প্যাকেজের আওতায় ব্যবসায়ীদের কস্ট অব ফান্ড কমানোর চেষ্টা করছে এবং এর সুফল ইতিমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থায়নের ব্যয় কমলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উৎপাদন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়বে। বিশেষ করে বিদ্যমান শিল্পগুলোকে টিকিয়ে রাখা এবং ভবিষ্যতে নতুন বিনিয়োগের ভিত্তি তৈরিতে কম ব্যয়ের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ধারাবাহিক উদ্যোগ: ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নের পথে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাবে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। পোশাক খাতেও উৎপাদন কমেছে। তবে ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, সরকারের সংস্কার উদ্যোগের ফল পেতে আরো সময় প্রয়োজন।
বিজিএমইএ সভাপতি মনে করেন, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলোর ভালো ফল পাওয়া যাবে। তার মতে, কোনো সংস্কারের ফল নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাওয়া যায় না; কিছু উদ্যোগের সুফল দ্রুত এলেও অনেক ক্ষেত্রে ফল পেতে সময় লাগে। তিনি আশা করছেন, আগামী ছয় মাসে এসব উদ্যোগের আরো দৃশ্যমান ফল পাওয়া যাবে।
সংস্কার বাস্তবায়নেই মিলবে সুফল: ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নীতিগত সংস্কারের পাশাপাশি ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা তৈরি হওয়া। বাজেটের ব্যবসাবান্ধব প্রস্তাব, এআইটি সংশোধন, ডি-রেগুলেশন, সিঙ্গেল উইন্ডো, লজিস্টিকস উন্নয়ন এবং অর্থায়ন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ,সব মিলিয়ে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
এখন এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নীতিগত সিদ্ধান্ত তখনই কার্যকর হয়, যখন তার সুফল উদ্যোক্তার দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কার্যক্রমে পৌঁছে যায়। সরকারের উদ্যোগগুলো বাস্তবে কার্যকর হলে ব্যবসায়ীদের আস্থা আরো বাড়বে, বিনিয়োগের পরিবেশ শক্তিশালী হবে এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে নতুন গতি তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সব মিলিয়ে ব্যবসার পরিবেশ সংস্কারে সরকারের উদ্যোগ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এখনো চলমান হলেও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, নীতিগত সংস্কার এবং বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে সহায়তার পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক ভিত্তি তৈরি করছে। এই সংস্কারের সুফল ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থা ও গতি দুটিই আরো বাড়বে।















