Dhaka ১০:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৬২ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত, লোডশেডিংয়ে নাকাল ঢাকাসহ সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
4 / 100 SEO Score

 

তীব্র গ্যাস-সংকট, কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহস্বল্পতার পাশাপাশি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারিগরি ত্রুটি ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে দেশে মারাত্মক বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাওয়ায় ঢাকাসহ সারা দেশে লোডশেডিংয়ের মাত্রা চরম আকার ধারণ করেছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় দিন-রাত সমানতালে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার ৬২টি কেন্দ্রে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্রে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ ছিল এবং বাকি ৪২টি কেন্দ্র সীমিত সক্ষমতায় চলেছে। ফলে দিনের বেলাতেই সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। এর আগে গত ১০ আগস্ট চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছিল।

বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও গত বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ চাহিদার সময় উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট। বিপরীতে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি অব্যবহৃত পড়ে ছিল কেবল জ্বালানি সংকটের কারণে। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ কমিয়ে গ্যাসের বড় অংশ এখন শিল্পকারখানায় দেওয়া হচ্ছে।

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই গ্যাস-সংকটের কারণে ঢাকার বাইরে পল্লী অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছিলেন। তবে গত ১২ আগস্ট থেকে সরকারি নির্দেশনায় রাজধানী ঢাকাতেও লোডশেডিং শুরু হয়েছে। ডিপিডিসি ও ডেসকো প্রতিদিন প্রতিটি এলাকায় এক ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা নিলেও মাঠপর্যায়ে তার চেয়েও বেশি লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। রাতের বেলা তো বটেই, দিনের ব্যস্ত সময়েও একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় রাজধানীর বহুতল ভবনগুলোতে লিফটে আটকে পড়ার আতঙ্ক এবং বাসাবাড়িতে তীব্র পানির সংকট দেখা দিচ্ছে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতিও বেশ নাজুক। দেশের ৮টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম। কারিগরি ত্রুটির কারণে পায়রা এবং বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে মাতারবাড়ী কেন্দ্রের একটি ইউনিট। এ ছাড়া কয়লা সরবরাহের সমস্যার কারণে গত ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের দেড় হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। দিনে ৯০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করলেও তারা কেবল পিক-আওয়ারে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সরবরাহ দিতে পারছে।

পরিস্থিতি সামলাতে উচ্চব্যয়ের জ্বালানি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বেশি চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হলেও ২৪টি কেন্দ্রে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল সরবরাহের ঘাটতি ছিল। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিমের মতে, বকেয়া পরিশোধসহ পিডিবির সঙ্গে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর চলমান বিরোধ নিষ্পত্তি করা গেলে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব।

এদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতি সরাসরি প্রভাব ফেলছে বাসাবাড়ির রান্না ও শিল্প উৎপাদনে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে গতকাল গ্যাসের সরবরাহ ছিল মাত্র ২৩৫ কোটি ঘনফুট। মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি গত জুলাইয়ে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। সেটি সচল হলেও নিয়মিত এলএনজি কার্গো সময়মতো না পৌঁছানোয় সংকট রয়েই গেছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম এই সার্বিক অব্যবস্থাপনার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, অযোগ্য জাহাজের ব্যবহার বা অনভিজ্ঞ কোম্পানির ওপর নির্ভরতার কারণে এ সংকট থেকে মুক্তি মিলছে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমূল কাঠামোগত সংস্কার, বিশৃঙ্খলা রোধ এবং দুর্নীতি বন্ধ না করলে এ ভোগান্তি থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

 

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

seventeen + 10 =

About Author Information

৬২ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত, লোডশেডিংয়ে নাকাল ঢাকাসহ সারাদেশ

Update Time : ০৪:১৯:২০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
4 / 100 SEO Score

 

তীব্র গ্যাস-সংকট, কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহস্বল্পতার পাশাপাশি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারিগরি ত্রুটি ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে দেশে মারাত্মক বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাওয়ায় ঢাকাসহ সারা দেশে লোডশেডিংয়ের মাত্রা চরম আকার ধারণ করেছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় দিন-রাত সমানতালে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার ৬২টি কেন্দ্রে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্রে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ ছিল এবং বাকি ৪২টি কেন্দ্র সীমিত সক্ষমতায় চলেছে। ফলে দিনের বেলাতেই সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। এর আগে গত ১০ আগস্ট চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছিল।

বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও গত বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ চাহিদার সময় উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট। বিপরীতে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি অব্যবহৃত পড়ে ছিল কেবল জ্বালানি সংকটের কারণে। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ কমিয়ে গ্যাসের বড় অংশ এখন শিল্পকারখানায় দেওয়া হচ্ছে।

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই গ্যাস-সংকটের কারণে ঢাকার বাইরে পল্লী অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছিলেন। তবে গত ১২ আগস্ট থেকে সরকারি নির্দেশনায় রাজধানী ঢাকাতেও লোডশেডিং শুরু হয়েছে। ডিপিডিসি ও ডেসকো প্রতিদিন প্রতিটি এলাকায় এক ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা নিলেও মাঠপর্যায়ে তার চেয়েও বেশি লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। রাতের বেলা তো বটেই, দিনের ব্যস্ত সময়েও একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় রাজধানীর বহুতল ভবনগুলোতে লিফটে আটকে পড়ার আতঙ্ক এবং বাসাবাড়িতে তীব্র পানির সংকট দেখা দিচ্ছে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতিও বেশ নাজুক। দেশের ৮টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম। কারিগরি ত্রুটির কারণে পায়রা এবং বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে মাতারবাড়ী কেন্দ্রের একটি ইউনিট। এ ছাড়া কয়লা সরবরাহের সমস্যার কারণে গত ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের দেড় হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। দিনে ৯০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করলেও তারা কেবল পিক-আওয়ারে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সরবরাহ দিতে পারছে।

পরিস্থিতি সামলাতে উচ্চব্যয়ের জ্বালানি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বেশি চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হলেও ২৪টি কেন্দ্রে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল সরবরাহের ঘাটতি ছিল। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিমের মতে, বকেয়া পরিশোধসহ পিডিবির সঙ্গে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর চলমান বিরোধ নিষ্পত্তি করা গেলে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব।

এদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতি সরাসরি প্রভাব ফেলছে বাসাবাড়ির রান্না ও শিল্প উৎপাদনে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে গতকাল গ্যাসের সরবরাহ ছিল মাত্র ২৩৫ কোটি ঘনফুট। মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি গত জুলাইয়ে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। সেটি সচল হলেও নিয়মিত এলএনজি কার্গো সময়মতো না পৌঁছানোয় সংকট রয়েই গেছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম এই সার্বিক অব্যবস্থাপনার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, অযোগ্য জাহাজের ব্যবহার বা অনভিজ্ঞ কোম্পানির ওপর নির্ভরতার কারণে এ সংকট থেকে মুক্তি মিলছে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমূল কাঠামোগত সংস্কার, বিশৃঙ্খলা রোধ এবং দুর্নীতি বন্ধ না করলে এ ভোগান্তি থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।