Dhaka ০৫:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এআইভিত্তিক বাজার গোয়েন্দা ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা টিসিবির

নিজস্ব প্রতিবেদক
10 / 100 SEO Score

 

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা, সম্ভাব্য সংকট এবং সরবরাহব্যবস্থায় কোথাও বিঘ্ন ঘটার আগাম তথ্য জানতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-ভিত্তিক বাজার গোয়েন্দা ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ বলেন, দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল আরো কার্যকরভাবে সমন্বয় এবং বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, ‘কোথায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে বা কোথায় বিঘ্ন ঘটতে পারে- এমন তথ্য দিতে পারে, টিসিবির জন্য এমন একটি ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর হবে।’

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বাজারের প্রবণতা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের গতিবিধি বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার যে বৃহত্তর পরিকল্পনা নিয়েছেন, তার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান টিসিবি চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, ‘এটি টিসিবির মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হবে, ইনশাআল্লাহ। আগস্টের শুরুতে কাঁচা মরিচের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ফয়সল আজাদ বলেন, অনেক সময় বাজারে কোনো পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার পর টিসিবি বিষয়টি জানতে পারে।

তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি ব্যবস্থা বৃষ্টিপাত, পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন, উৎপাদন, আমদানি, মূল্য, পণ্যের সরবরাহ ও সরবরাহ প্রবাহসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সংকটের আগাম সতর্কবার্তা দিতে পারবে।

প্রস্তাবিত এ ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে টিসিবি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি মূল কমিটি ইতোমধ্যে কয়েক দফা বৈঠক করেছে।

টিসিবি চেয়ারম্যান বলেন, প্রকল্পের কার্যপরিধি বা টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে একটি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

বিভিন্ন পণ্যের দায়িত্ব বিভিন্ন সরকারি সংস্থার ওপর থাকায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় আরো জোরদার করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। বাজারদর ও পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে নিয়মিত সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ফয়সল আজাদ বলেন, প্রয়োজন হলে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টিসিবি তার নিয়মিত দায়িত্বের বাইরে থাকা পণ্য নিয়েও বাজারে হস্তক্ষেপ করে। অতীতে সংস্থাটি আলু বিক্রি করেছে এবং পেঁয়াজ সংগ্রহও করেছে, যদিও এসব পণ্য মূলত অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের আওতায় পড়ে।

বাড়ছে নিজস্ব গুদাম সক্ষমতা : অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে নতুন গুদাম নির্মাণ এবং পুরোনো কয়েকটি স্থাপনা পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা করছে টিসিবি।

ফয়সল আজাদ জানান, উত্তরা এলাকায় একটি নতুন গুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া টিসিবির পুরোনো কয়েকটি ভবন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ করা হবে।

টিসিবি নিজস্ব সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন বাড়াচ্ছে। এর ফলে ধীরে ধীরে ভাড়ায় গুদাম নেওয়ার ব্যয় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

টিসিবি চেয়ারম্যান বলেন, সংস্থাটি ইতোমধ্যে স্বয়ংক্রিয় সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে অনেক দূর এগিয়েছে। পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন এবং নতুন একটি মোবাইল অ্যাপ চালু হলে কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ভোক্তারাও আরো সুবিধা পাবেন।

অনলাইন লটারিতে ডিলার নির্বাচন : নতুন ডিলার নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ফয়সল আজাদ বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুসরণ, জেলা প্রশাসনের যাচাই-বাছাই এবং অনলাইন লটারির মাধ্যমে ডিলার নির্বাচন করা হচ্ছে।

নতুন ব্যবস্থায় প্রতি ১ হাজার ৫০০ স্মার্টকার্ডধারীর জন্য একজন ডিলার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, ডিলার নির্বাচনে বাইরের হস্তক্ষেপের সুযোগ কমানোর জন্যই এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

টিসিবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আবেদনপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর যোগ্য আবেদনকারীদের অনলাইন লটারির মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই।’

বাজারে জরুরি পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপের একটি ব্যবস্থা হিসেবে ট্রাক সেল কার্যক্রমও বজায় রাখছে টিসিবি। তবে, এটিকে নিয়মিত কার্যক্রম হিসেবে পরিচালনা করা হবে না বলে জানান তিনি।

পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে অথবা ঈদের মতো বিশেষ চাহিদার সময়ে প্রয়োজন হলে আবারও ট্রাক সেল শুরু করা হতে পারে।

জনবল, অর্থায়ন ও সংরক্ষণ সক্ষমতার সংকট :

টিসিবির কার্যক্রম পরিচালনায় জনবলসংকট, অর্থায়নের ব্যয়, পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগারের অভাব এবং জেলা প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীলতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন টিসিবি চেয়ারম্যান।

বর্তমানে টিসিবিতে প্রায় ২৭৫ জন কর্মী রয়েছেন। অন্যদিকে সংস্থাটির বার্ষিক পণ্য ক্রয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছর টিসিবি প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার পণ্য কিনেছে। চলতি অর্থবছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

ক্রমবর্ধমান দায়িত্ব পালনে টিসিবির সাংগঠনিক কাঠামো সম্প্রসারণ এবং দেশের প্রায় ২১টি স্থানে কার্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বাজারভিত্তিক পণ্য সংগ্রহ, লাভজনক বিক্রয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণের মতো নতুন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষায়িত জনবলও প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন ফয়সল আজাদ।

অর্থায়নকে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, টিসিবি সাধারণত পণ্য সংগ্রহের জন্য সরকারের কাছ থেকে ঋণ পায়। তবে, ভর্তুকির অর্থ পেতে বিলম্ব হলে সংস্থাটির সুদের ব্যয় বেড়ে যায়।

এ কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকেও টিসিবি-কে ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি ব্যাংক অনেক সময় তুলনামূলক কম সুদে ঋণ দিতে পারে। এতে অর্থায়নের ব্যয় কমবে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের ভর্তুকির চাপও কমানো সম্ভব হবে।’

আমদানিকারকদের ভ্যাট সুবিধার প্রস্তাব : টিসিবিতে আমদানি করা পণ্য সরবরাহকারী ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বিধানেও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন টিসিবি চেয়ারম্যান।

বর্তমানে বিদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে টিসিবিতে সরবরাহকারী ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদকদের তুলনায় অতিরিক্ত ভ্যাট ব্যয়ের মুখে পড়েন বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘এই সমস্যার সমাধান হলে আরো বেশি সরবরাহকারী অংশ নিতে পারবেন। প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং এর ফলে পণ্য সংগ্রহের দামও কমতে পারে।’

যোগ্য সরবরাহকারীর সংখ্যা বাড়লে সীমিতসংখ্যক দেশীয় উৎপাদকের ওপর নির্ভরতাও কমবে বলেও মনে করেন তিনি।

মানের সঙ্গে আপস নয় : আগামী দিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে টিসিবি চেয়ারম্যান বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, পণ্যের মান বজায় রাখা এবং প্রতিযোগিতামূলক পণ্য সংগ্রহ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারের ভর্তুকিনির্ভরতা কমানোই টিসিবির প্রধান লক্ষ্য।

তিনি বলেন, ‘পণ্যের মানের সঙ্গে আমরা কোনো আপস করব না।’ ভোক্তাদের চাহিদা ও জরিপের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে নতুন পণ্যও যুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি।

ফয়সল আজাদ বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য মানুষকে এসব পণ্য কিনতে বাধ্য করা নয়। এগুলো ঐচ্ছিক। মানুষের প্রয়োজন হলে তারা কম দামে এসব পণ্য কিনতে পারবেন।’

চলমান সংস্কার কার্যক্রম, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বাজার গোয়েন্দা ব্যবস্থা, উন্নত পণ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে টিসিবি আরো দক্ষ হয়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

এসব উদ্যোগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে টিসিবির ভূমিকা আরো শক্তিশালী করবে বলেও মনে করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান।

 

Tag :

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

3 × five =

About Author Information

এআইভিত্তিক বাজার গোয়েন্দা ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা টিসিবির

Update Time : ০৫:৫২:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
10 / 100 SEO Score

 

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা, সম্ভাব্য সংকট এবং সরবরাহব্যবস্থায় কোথাও বিঘ্ন ঘটার আগাম তথ্য জানতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-ভিত্তিক বাজার গোয়েন্দা ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ বলেন, দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল আরো কার্যকরভাবে সমন্বয় এবং বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, ‘কোথায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে বা কোথায় বিঘ্ন ঘটতে পারে- এমন তথ্য দিতে পারে, টিসিবির জন্য এমন একটি ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর হবে।’

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বাজারের প্রবণতা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের গতিবিধি বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার যে বৃহত্তর পরিকল্পনা নিয়েছেন, তার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান টিসিবি চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, ‘এটি টিসিবির মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হবে, ইনশাআল্লাহ। আগস্টের শুরুতে কাঁচা মরিচের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ফয়সল আজাদ বলেন, অনেক সময় বাজারে কোনো পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার পর টিসিবি বিষয়টি জানতে পারে।

তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি ব্যবস্থা বৃষ্টিপাত, পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন, উৎপাদন, আমদানি, মূল্য, পণ্যের সরবরাহ ও সরবরাহ প্রবাহসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সংকটের আগাম সতর্কবার্তা দিতে পারবে।

প্রস্তাবিত এ ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে টিসিবি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি মূল কমিটি ইতোমধ্যে কয়েক দফা বৈঠক করেছে।

টিসিবি চেয়ারম্যান বলেন, প্রকল্পের কার্যপরিধি বা টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে একটি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

বিভিন্ন পণ্যের দায়িত্ব বিভিন্ন সরকারি সংস্থার ওপর থাকায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় আরো জোরদার করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। বাজারদর ও পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে নিয়মিত সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ফয়সল আজাদ বলেন, প্রয়োজন হলে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টিসিবি তার নিয়মিত দায়িত্বের বাইরে থাকা পণ্য নিয়েও বাজারে হস্তক্ষেপ করে। অতীতে সংস্থাটি আলু বিক্রি করেছে এবং পেঁয়াজ সংগ্রহও করেছে, যদিও এসব পণ্য মূলত অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের আওতায় পড়ে।

বাড়ছে নিজস্ব গুদাম সক্ষমতা : অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে নতুন গুদাম নির্মাণ এবং পুরোনো কয়েকটি স্থাপনা পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা করছে টিসিবি।

ফয়সল আজাদ জানান, উত্তরা এলাকায় একটি নতুন গুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া টিসিবির পুরোনো কয়েকটি ভবন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ করা হবে।

টিসিবি নিজস্ব সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন বাড়াচ্ছে। এর ফলে ধীরে ধীরে ভাড়ায় গুদাম নেওয়ার ব্যয় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

টিসিবি চেয়ারম্যান বলেন, সংস্থাটি ইতোমধ্যে স্বয়ংক্রিয় সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে অনেক দূর এগিয়েছে। পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন এবং নতুন একটি মোবাইল অ্যাপ চালু হলে কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ভোক্তারাও আরো সুবিধা পাবেন।

অনলাইন লটারিতে ডিলার নির্বাচন : নতুন ডিলার নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ফয়সল আজাদ বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুসরণ, জেলা প্রশাসনের যাচাই-বাছাই এবং অনলাইন লটারির মাধ্যমে ডিলার নির্বাচন করা হচ্ছে।

নতুন ব্যবস্থায় প্রতি ১ হাজার ৫০০ স্মার্টকার্ডধারীর জন্য একজন ডিলার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, ডিলার নির্বাচনে বাইরের হস্তক্ষেপের সুযোগ কমানোর জন্যই এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

টিসিবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আবেদনপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর যোগ্য আবেদনকারীদের অনলাইন লটারির মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই।’

বাজারে জরুরি পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপের একটি ব্যবস্থা হিসেবে ট্রাক সেল কার্যক্রমও বজায় রাখছে টিসিবি। তবে, এটিকে নিয়মিত কার্যক্রম হিসেবে পরিচালনা করা হবে না বলে জানান তিনি।

পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে অথবা ঈদের মতো বিশেষ চাহিদার সময়ে প্রয়োজন হলে আবারও ট্রাক সেল শুরু করা হতে পারে।

জনবল, অর্থায়ন ও সংরক্ষণ সক্ষমতার সংকট :

টিসিবির কার্যক্রম পরিচালনায় জনবলসংকট, অর্থায়নের ব্যয়, পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগারের অভাব এবং জেলা প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীলতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন টিসিবি চেয়ারম্যান।

বর্তমানে টিসিবিতে প্রায় ২৭৫ জন কর্মী রয়েছেন। অন্যদিকে সংস্থাটির বার্ষিক পণ্য ক্রয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছর টিসিবি প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার পণ্য কিনেছে। চলতি অর্থবছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

ক্রমবর্ধমান দায়িত্ব পালনে টিসিবির সাংগঠনিক কাঠামো সম্প্রসারণ এবং দেশের প্রায় ২১টি স্থানে কার্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বাজারভিত্তিক পণ্য সংগ্রহ, লাভজনক বিক্রয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণের মতো নতুন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষায়িত জনবলও প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন ফয়সল আজাদ।

অর্থায়নকে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, টিসিবি সাধারণত পণ্য সংগ্রহের জন্য সরকারের কাছ থেকে ঋণ পায়। তবে, ভর্তুকির অর্থ পেতে বিলম্ব হলে সংস্থাটির সুদের ব্যয় বেড়ে যায়।

এ কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকেও টিসিবি-কে ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি ব্যাংক অনেক সময় তুলনামূলক কম সুদে ঋণ দিতে পারে। এতে অর্থায়নের ব্যয় কমবে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের ভর্তুকির চাপও কমানো সম্ভব হবে।’

আমদানিকারকদের ভ্যাট সুবিধার প্রস্তাব : টিসিবিতে আমদানি করা পণ্য সরবরাহকারী ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বিধানেও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন টিসিবি চেয়ারম্যান।

বর্তমানে বিদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে টিসিবিতে সরবরাহকারী ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদকদের তুলনায় অতিরিক্ত ভ্যাট ব্যয়ের মুখে পড়েন বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘এই সমস্যার সমাধান হলে আরো বেশি সরবরাহকারী অংশ নিতে পারবেন। প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং এর ফলে পণ্য সংগ্রহের দামও কমতে পারে।’

যোগ্য সরবরাহকারীর সংখ্যা বাড়লে সীমিতসংখ্যক দেশীয় উৎপাদকের ওপর নির্ভরতাও কমবে বলেও মনে করেন তিনি।

মানের সঙ্গে আপস নয় : আগামী দিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে টিসিবি চেয়ারম্যান বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, পণ্যের মান বজায় রাখা এবং প্রতিযোগিতামূলক পণ্য সংগ্রহ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারের ভর্তুকিনির্ভরতা কমানোই টিসিবির প্রধান লক্ষ্য।

তিনি বলেন, ‘পণ্যের মানের সঙ্গে আমরা কোনো আপস করব না।’ ভোক্তাদের চাহিদা ও জরিপের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে নতুন পণ্যও যুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি।

ফয়সল আজাদ বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য মানুষকে এসব পণ্য কিনতে বাধ্য করা নয়। এগুলো ঐচ্ছিক। মানুষের প্রয়োজন হলে তারা কম দামে এসব পণ্য কিনতে পারবেন।’

চলমান সংস্কার কার্যক্রম, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বাজার গোয়েন্দা ব্যবস্থা, উন্নত পণ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে টিসিবি আরো দক্ষ হয়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

এসব উদ্যোগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে টিসিবির ভূমিকা আরো শক্তিশালী করবে বলেও মনে করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান।