গরমে ফ্যাশন হোক আরামদায়ক
ৱবৈশাখের তীব্র রোদ, ধুলোভরা রাস্তা আর ভ্যাপসা গরমে নাগরিক জীবন ক্লান্ত। বাইরে বের হলেই শরীর ঘামে ভিজে যাওয়ায় তৈরি হয় অস্বস্তিকর অনুভূতি।
এ সময় স্বস্তি পেতে প্রয়োজন সঠিক পোশাক। গরমের ফ্যাশন শুধু সুন্দর দেখানোর বিষয় নয়, বরং হয়ে উঠেছে আরাম এবং নিজের স্টাইল প্রকাশের উপায়।
বর্তমান সময়ে ফ্যাশনসচেতন মানুষ ভালোভাবেই বোঝেন, স্টাইল মানে শুধু সাজগোজ নয়, বরং আরামের মধ্যে থাকে আসল রুচির পরিচয়। সে কারণে পোশাকে গুরুত্ব পাচ্ছে এমন ফেব্রিক ও রং, যা গরমেও শরীরকে রাখে ঠান্ডা আর মনকে সতেজ।
‘লেস ইজ মোর’ মানে হচ্ছে অল্পের মধ্যে সুন্দর কিছু ফুটিয়ে তোলা। এই সহজ কিন্তু আধুনিক ধারণাকে সামনে রেখে দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো তাদের নতুন কালেকশনে এনেছে আরামদায়ক, ব্যবহারিক এবং স্টাইলিশ পোশাকের এক নতুন রূপ।
গ্রীষ্মের ফেব্রিক ট্রেন্ড
গ্রীষ্মের ফ্যাশনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ফেব্রিক। কারণ যতই সুন্দর ডিজাইন হোক না কেন, যদি পোশাক আরামদায়ক না হয়, তবে সেটি দীর্ঘসময় পরা সম্ভব নয়।
সুতি কাপড় বরাবরের মতোই এ মৌসুমের প্রথম পছন্দ। এর স্বাভাবিক বায়ু চলাচল এবং ঘাম শোষণের ক্ষমতা শরীরকে ঠান্ডা ও স্বস্তিতে রাখে। এবার সুতির পাশাপাশি ফ্যাশনপ্রেমীদের নজর কাড়ছে আরও
কিছু ফেব্রিক–
লিনেন ও হ্যান্ডলুম: অফিস কিংবা ফরমাল পরিবেশে লিনেন এখন এক ধরনের এলিগ্যান্ট স্টেটমেন্ট। এর হালকা গঠন শরীরে লেগে থাকে না। ফলে দীর্ঘসময় আরাম বজায় থাকে।
ভয়েল: অত্যন্ত হালকা ও নরম এ কাপড়গুলো গরমে এনে দেয় এক অনন্য স্বস্তি; যেন শরীরে ভারী কিছুই নেই।
খাদি: ঐতিহ্যের ছোঁয়া নিয়ে আসা খাদি এখন আধুনিক কাটে নতুন রূপ পেয়েছে। কুর্তি, টপস কিংবা ড্রেস–সবখানেই এটি দারুণ মানিয়ে যাচ্ছে।
পোশাকের রং নির্বাচন
গরমে রং শুধু স্টাইলের বিষয় নয়, বরং তা সরাসরি প্রভাব ফেলে আরাম বা স্বস্তির ওপর। গাঢ় রং তাপ বেশি শোষণ করে। ফলে অস্বস্তি বাড়ে। তাই এবারের ফ্যাশনে প্রাধান্য পাচ্ছে হালকা, স্নিগ্ধ ও প্রশান্তিদায়ক রং।
প্যাস্টেল প্যালেট, আইসি ব্লু, মিন্ট গ্রিন, লেমন ইয়েলো, পিচ, ল্যাভেন্ডার–এই রংগুলো যেন গরমের মধ্যে এক ফোঁটা শীতলতার ছোঁয়া এনে দেয়। এগুলো চোখে যেমন আরামদায়ক, তেমনি লুকে আনে একটি পরিষ্কার ও এলিগ্যান্ট ফিনিশ।
অন্যদিকে সাদা, অফ-হোয়াইট কিংবা ক্রিম রং বরাবরের মতোই গ্রীষ্মের রাজকীয় পছন্দ। এ রংগুলো সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। ফলে শরীরও তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে।
এবারের গ্রীষ্মের ট্রেন্ড
গ্রীষ্মের তাপদাহকে মাথায় রেখেই দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো তাদের নতুন কালেকশনে এনেছে আরামদায়ক ও স্টাইলিশ পোশাকের বৈচিত্র্য। ফেব্রিক, কাট ও রং–সবকিছুতেই এবার প্রাধান্য পেয়েছে স্বস্তির বিষয়টি।
ফ্যাশন হাউস কে ক্র্যাফটের স্বত্বাধিকারী খালিদ মাহমুদ খান জানান, আরামদায়ক কুর্তি, কামিজ, হাফ শার্ট ও ফতুয়ার ডিজাইন ও ফেব্রিক নির্বাচনে আবহাওয়ার কথা বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রধানত সুতির নানা রকম কাপড়ে লুজ ফিটেড কুর্তি ও শার্ট রাখা হয়েছে এবার। ফতুয়ার কালেকশনে সাদা এবং প্যাস্টেল শেড সামার উপযোগী রংয়ের কাপড়ে আই সুদিং কম্বিনেশনে ডিজাইন করা হয়েছে।
এবার গরমে আড়ংয়ের সুতি, খাদি ও জামদানি কালেকশনে ব্লক প্রিন্ট, টাই-ডাই ও ন্যাচারাল শেডের ব্যবহার চোখে পড়ে। এখানে দৈনন্দিন ব্যবহারের কুর্তি, কামিজ বা টপস পাওয়া যাচ্ছে।
আবার গরম উপযোগী হালকা শাড়ি, বিশেষ করে সুতি বা জামদানি শাড়িও পাবেন।
অঞ্জন’স, রঙ বাংলাদেশ গ্রীষ্মের জন্য নিয়ে এসেছে লিনেন, ভয়েল, সুতির কালেকশন। অফিস কিংবা ক্যাজুয়াল–দুই ক্ষেত্রেই এসব পোশাক মানানসই।
তরুণদের পছন্দের তালিকায় থাকা দেশাল, বিবিয়ানার মতো হাউসগুলো এবার এনেছে ঢিলেঢালা, রঙিন ও ফিউশন স্টাইলের পোশাক। এসব হাউসের কো-অর্ড সেট, ওভারসাইজড কুর্তি বা ক্যাজুয়াল ড্রেস যা একদিকে ট্রেন্ডি, অন্যদিকে সাশ্রয়ী।
ফ্যাশন হাউস আরণ্যক, বিশ্বরঙ প্রাকৃতিক রং, হ্যান্ডলুম ফেব্রিক ও ক্ল্যাসিক কাটে তাদের গ্রীষ্মকালীন কালেকশন সাজিয়েছে।
এথনিক স্টাইলে নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ড
বাঙালি নারীর ফ্যাশনে শাড়ি সবসময়ই এক চিরন্তন আবেদন নিয়ে উপস্থিত। তবে গরমের এ মৌসুমে সেই শাড়ির ধরনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। ভারী সিল্ক বা জর্জেটের বদলে এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে হালকা ও বাতাস চলাচলকারী তাঁতের শাড়ি।
টাঙ্গাইল কিংবা নরম সুতি শাড়ি এখন দৈনন্দিন জীবনে আরাম আর স্টাইল–দুটোকেই একসঙ্গে নিশ্চিত করছে।
গরমের উৎসব বা বিশেষ দিনের কথা উঠলেই এখনও সুতি জামদানি নিজের জায়গা ধরে রেখেছে। সূক্ষ্ম বুননের এ শাড়ি শুধু নান্দনিক সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং তীব্র গরমেও শরীরকে রাখে স্বস্তিতে ও হালকা অনুভূতিতে।
ফ্যাশনের আরেকটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কামিজ ও কুর্তির ডিজাইনে। টাইট ফিটিংয়ের জায়গা দখল করেছে ঢিলেঢালা ও রিলাক্সড কাট; যা এখন আরামদায়ক পোশাকের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছে। তরুণ প্রজন্মের কাছেও এই স্টাইল দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
পোশাকের নিচের অংশ বা বটম স্টাইলেও এসেছে বৈচিত্র্য। পালাজো, ধুতি সালোয়ার ও লেডিজ প্যান্ট এখন ফ্যাশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে; যা একদিকে আরাম দেয়, অন্যদিকে লুকেও আনে আধুনিকতার ছোঁয়া।
পোশাকের হাতার ডিজাইনে পরিবর্তনও চোখে পড়ার মতো। থ্রি-কোয়ার্টার হাতা, লেইসের কাজ বা হালকা এমব্রয়ডারি এখন শুধু পোশাকের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং রোদ থেকে ত্বককে সুরক্ষাও দিচ্ছে কার্যকরভাবে।
বিশেষ করে ফ্যাশনসচেতন মেয়েদের ফ্যাশনে কো-অর্ড সেট, ওভারসাইজড শার্ট, নো-মেকআপ লুক এবং কমফোর্ট ফুটওয়্যার এখন সবচেয়ে বেশি ট্রেন্ডে রয়েছে।
অন্যদিকে ছেলেদের ফ্যাশনেও গরমে লিনেন ও কটন শার্ট, ওভারসাইজড টি-শার্ট এবং ঢিলেঢালা প্যান্ট বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
উভয় ক্ষেত্রেই প্যাস্টেল ও ন্যাচারাল রঙের ব্যবহার এবং স্লাইড স্যান্ডেল, ক্যানভাস জুতা বা লোফারের মতো আরামদায়ক ফুটওয়্যার স্টাইল স্টেটমেন্ট হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
























