রমজান মাস এলেই প্রতিটি পরিবারের ব্যয় যেমন বাড়ে, তেমনি বাড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা। ইফতার ও সেহরিকে কেন্দ্র করে চাল, ডাল, তেল, চিনি, খেজুর, ছোলা, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যবহার স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি হয়। ফলে অনেক সময় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত মুনাফার আশায় রমজানের শুরুতেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
তবে আসন্ন পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে এবার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তির আভাস মিলেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, টিসিবি ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, সরবরাহ বাড়ানো এবং বাজার তদারকি জোরদার করায় অনেক পণ্যের দাম বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। সরকার দাবি করছে, রমজানকেন্দ্রিক পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ নেই।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “রমজানকে কেন্দ্র করে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা ও খেজুরের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। সে কারণেই আমরা আগেভাগে আমদানি ও মজুত বাড়ানোর ব্যবস্থা নিয়েছি। যাতে বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি না ঘটে।”
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) জানিয়েছে, রাজধানীসহ সারাদেশে তাদের পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। কম দামে চাল, ডাল, তেল ও চিনি বিক্রি করা হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে রমজানের বাজার করতে পারেন। পাশাপাশি নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রমজান উপলক্ষে কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা অতিরিক্ত দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এজন্য রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় ভ্রাম্যমাণ টিম মাঠে কাজ করছে। তারা দোকান ও আড়ত পরিদর্শন করছে, মূল্যতালিকা ঝুলানো আছে কিনা এবং নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে কিনা তা যাচাই করছে।
অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, “রমজানকে সামনে রেখে কিছু ব্যবসায়ী সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেন। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি, মজুতদারি কিংবা ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করলে তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা করা হচ্ছে।”
এদিকে ব্যবসায়ীরাও বলছেন, এ বছর আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন ভালো থাকায় সরবরাহে তেমন কোনো সংকট নেই। ফলে বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা হওয়ার সম্ভাবনা কম। কাওরান বাজারের এক পাইকারি ব্যবসায়ী বলেন, “এবার ডাল, তেল, ছোলা, চিনি—সব কিছুরই মজুত ভালো। আগের বছরের তুলনায় পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক আছে। সরকারও নজরদারি বাড়িয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “যদি কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি না করে, তাহলে রমজানে দাম খুব বেশি বাড়ার কথা না।”
অন্যদিকে ভোক্তারাও বাজার পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা একজন গৃহিণী বলেন, “রমজান আসলেই বাজারে গেলে দুশ্চিন্তা থাকে। তবে এবার এখনো বড় কোনো লাফ দেখা যায়নি। আশা করছি সরকার নজরদারি রাখবে।”
আরেক ক্রেতা বলেন, “রমজানে আমাদের পরিবারের খরচ অনেক বেড়ে যায়। তাই দাম স্থিতিশীল থাকলে আমাদের জন্য সুবিধা হয়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুধু অভিযান নয়, সরবরাহ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও জরুরি। আমদানি, পরিবহন ও পাইকারি বাজারে স্বচ্ছতা থাকলে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, রমজান মাসে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—তিন পক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন। সরকারের নিয়মিত তদারকি, ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা এবং ভোক্তাদের সচেতনতা থাকলে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব।
পবিত্র রমজান সংযম ও সহমর্মিতার মাস। এই মাসে মানুষ যেন স্বস্তিতে বাজার করতে পারে, সে জন্য সরকার বাজার তদারকি আরও জোরদার করার আশ্বাস দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল থাকবে এবং সাধারণ মানুষ অযথা মূল্যচাপের শিকার হবেন না।
মনি রাজ 



















