শিল্প পুনরুজ্জীবনে ৬০ হাজার কোটির অর্থনৈতিক প্রণোদনা
দেশের স্থবির অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এবং বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজ আনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রস্তাবিত এ উদ্যোগের মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফেরানো এবং কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলমান অর্থনৈতিক চাপ, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট এবং উৎপাদন খাতে ধীরগতির প্রভাব কাটিয়ে উঠতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর কাছে সরবরাহ করা হবে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে বিভিন্ন খাতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা হিসেবে দেওয়া হবে।
সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত পুনরুজ্জীবনের জন্য। এ খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। এই অর্থ দিয়ে কাঁচামাল আমদানি, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিল এবং উৎপাদন ব্যয় মেটানো হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা, এর ফলে অন্তত দুই লাখ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। সহজ শর্তে ঋণ সহায়তার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের উৎপাদন বাড়ানো ও শ্রমিক ধরে রাখতে সহায়তা দেওয়া হবে। এই খাতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কৃষিপণ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এই অর্থ ব্যয় হবে। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক উৎপাদন ও রপ্তানি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এ খাতে প্রায় ৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করা হবে। নতুন পণ্য ও বাজারে প্রবেশে উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়া হবে এই তহবিল থেকে। এছাড়া চামড়া ও জুতা শিল্প, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানি এবং প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট সুবিধার জন্যও পৃথক তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, স্টার্টআপ ফাইন্যান্সিং, পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদন এবং সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশেও বিশেষ সহায়তা দেওয়া হবে।
প্রস্তাবিত প্যাকেজের মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ২৫ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট এবং রপ্তানি বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব দেশের শিল্প ও বাণিজ্যে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সঠিক তদারকি ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা গেলে এই প্রণোদনা প্যাকেজ দেশের শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।




















