স্বাস্থ্যখাতে দ্বিগুণ বাজেট
কমবে কি জনগণের চিকিৎসা ব্যয়
****২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা
****৪৬৩টি উপজেলা হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত
****স্টেন্ট, লেন্স ও ডায়ালাইসিস সামগ্রীর ওপর কর-ভ্যাট কমানোর উদ্যোগ
**** মানুষের স্বস্তি নির্ভর করবে বাজেট বাস্তবায়নের ওপর
স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে খাতটিতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকার এই বাজেটে হাসপাতাল সম্প্রসারণ, নতুন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের খরচ কমানোর নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রশ্ন থাকছে বড় এই বিনিয়োগের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাবে এবং দীর্ঘদিনের উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ থেকে জনগণ কতটা স্বস্তি পাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সঠিক বাস্তবায়ন, কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলেই কমতে পারে মানুষের নিজস্ব চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা।
এবারের স্বাস্থ্য বাজেটে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশের ৪৬৩টি উপজেলা সদর হাসপাতালকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি জনবল সংকটে থাকা হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লায় পাঁচটি নতুন শিশু হাসপাতাল চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়া আটটি ক্যানসার ইনস্টিটিউট, দুটি বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ১৮টি এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট সাধারণ হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী এবং পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হলে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না; বরং পরিকল্পিতভাবে বাজেটের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তা সম্ভব হলে দেশের চিকিৎসাসেবায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় অর্থের কার্যকর ব্যবহার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে কিছুটা সংশয় থেকেই যাচ্ছে। তারপরও জিডিপির এক শতাংশের বেশি স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তারা ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, অতীতেও স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও পরবর্তীতে অনেক সময় সংশোধিত বাজেটে সেই বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করতে না পারার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্যখাতের অনেক প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর ব্যয়ের সক্ষমতা রয়েছে।তিনি বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের আয় ও সরকারি বরাদ্দের সমন্বয়ে কার্যকরভাবে অর্থ ব্যবস্থাপনা করতে পারছে। দেশের বড় বড় মেডিকেল কলেজ ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোর আওতায় আনা গেলে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ফেরত যাওয়ার প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়নে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন স্বাস্থ্য কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। বিভাগীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হলে বরাদ্দের অর্থ সঠিকভাবে কাজে লাগানো সহজ হবে। পাশাপাশি অর্থ ছাড়ে বিলম্বের কারণেও অনেক সময় নির্ধারিত অর্থ যথাসময়ে ব্যয় করা যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানানো হচ্ছিল। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির এক শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। পরিচালন ব্যয়ের পাশাপাশি উন্নয়ন খাতেও বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে বরাদ্দের একটি বড় অংশ থোক হিসেবে রাখা হয়েছে। এই অর্থ ব্যবহারের জন্য নতুন প্রকল্প গ্রহণ ও অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। প্রকল্প প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত একাধিক ধাপ থাকায় দ্রুত অর্থ ব্যয় করা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দেশের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ এখনো সাধারণ মানুষকে নিজেদের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। তাই ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমাতে বাজেটে আরও সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল। ই-হেলথ কার্ডের মতো উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এটি বাস্তবে মানুষের চিকিৎসা খরচ কতটা কমাতে পারবে, তা নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। হাসপাতালের ওষুধ সরবরাহ ও ডায়াগনস্টিক সেবার মান উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ করা গেলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে জনগণের নিজস্ব ব্যয় কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের নজির তৈরি করেছে। গত সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এ বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ, যা স্বাস্থ্যখাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না। অতীতে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন বাজেট বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে। প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, জটিল ক্রয় প্রক্রিয়া, দক্ষ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক সময় বরাদ্দের অর্থ নির্ধারিত সময়ে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যখাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
এদিকে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের অর্থ ফেরত না যাওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. নাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, এবার বরাদ্দের একটি টাকাও ফেরত না যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই সরকারের প্রধান লক্ষ্য, যা নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ।
মন্ত্রী আরও বলেন, দেশের উপজেলা পর্যায়ের সব হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। জরুরি রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে আধুনিক অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি হেলিকপ্টার সেবা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
বাজেটের পাশাপাশি চিকিৎসা সামগ্রীতে প্রণোদনা, কমবে খরচ
চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমাতে স্বাস্থ্যখাতে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামের ওপর কর ও ভ্যাট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। এর ফলে চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্স, হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেন্ট এবং কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সামগ্রীর দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের জোগানদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। এতে প্রতিটি লেন্সের দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে বলে জানা গেছে। একইভাবে হার্টের রিং বা স্টেন্টের জোগানদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব থাকছে। এর ফলে প্রতিটি স্টেন্টের খরচ প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
কিডনি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। এতে একজন রোগীর ডায়ালাইসিস খরচ প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া হেমোডায়ালাইসিসের ব্লাড টিউবিং সেট আমদানির ক্ষেত্রেও সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট ও অগ্রিম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব থাকতে পারে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত আমদানিকৃত ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি মরদেহ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত মরচুয়ারি আমদানিতে আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
অন্যদিকে দেশীয় ওষুধ শিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে বাজেটে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের ও সাশ্রয়ী মূল্যের ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি শুল্ক সুবিধার তালিকায় নতুন করে আরও ৯টি পণ্য যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) উৎপাদনের ৫১টি নতুন কাঁচামালের আমদানি শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ওষুধ রপ্তানির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামাল রেয়াতি সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাবও রয়েছে।



















