দেশজুড়ে ভয়াবহ হচ্ছে হামের প্রকোপ
****এক মাসে প্রায় ২০০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে
****হাসপাতালগুলোতে বেড ও আইসিইউ সংকট
****টিকাদানে ঘাটতি ও ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে
****পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি ও জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা
দেশজুড়ে দ্রুত বাড়ছে হামের সংক্রমণ। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই ভিড় বাড়ছে আক্রান্ত শিশুদের। শ্বাসকষ্ট, জ্বর ও শরীরজুড়ে র্যাশ নিয়ে অনেক শিশুকে ক্যানুলা, অক্সিজেন ও নাকে নল দিয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। রোগীর চাপে বেড ও আইসিইউ সংকটও তীব্র হয়ে উঠেছে, ফলে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে। দেশে সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রাদুর্ভাব যে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয় বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল বড় হচ্ছে, যা কোনোভাবেই একটি স্থিতিশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিফলন হতে পারে না।
দেশে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক আকার নিয়েছে। গত এক মাসে প্রায় ২০০ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। প্রতিদিনই হাম ও সন্দেহজনক হামে শিশু মৃত্যুর খবর আসছে বিভিন্ন জেলা থেকে। সরকার টিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেও তা এখনও সীমিত পরিসরে থাকায় অনেক শিশু রয়ে গেছে ঝুঁকির মধ্যে। এ অবস্থায় দ্রুত ও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এক মাসে নিশ্চিত হাম ও সন্দেহজনক উপসর্গ মিলিয়ে ১৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সন্দেহজনক ১৬৬ জন এবং নিশ্চিত হামে ৩২ জন মারা গেছে। বুধবার (১৫ এপ্রিল) সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় তিন জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
জেলাভিত্তিক হিসাবে গত একমাসে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়, ৯৪ জন। রাজশাহীতে ৬৮ জন এবং চট্টগ্রামে ১৫ জন মারা গেছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা অটোচালকের সাত মাস বয়সী একমাত্র সন্তান ইউসুব। নিউমোনিয়া নিয়ে ২৪ দিন আগে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিল সে। নিউমোনিয়া কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার মুহূর্তেই গত মঙ্গলবার হাসপাতালেই তার শরীরে হাম ধরা পড়ে।
এর পর থেকেই সাইদ-মৌসুমি দম্পতির কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। হাম ধরা পড়ার পর থেকে ইউসুব ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। মাথায় ক্যানুলা, এক নাকে অক্সিজেনের পাইপ, অন্য নাক দিয়ে নলের মাধ্যমে চলছে খাবার গ্রহণ। হাত-পাসহ পুরো শরীর হামের লাল র্যাশে ভরে গেছে। ছেলের শিয়রে বসে অঝোরে কাঁদছেন মা মৌসুমি। কিছুক্ষণ আগেই চিকিৎসক জানিয়ে গেছেন, ইউসুবের শ্বাসকষ্ট ও অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় সে ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছে না, তার জরুরি আইসিইউ প্রয়োজন।
কিন্তু আইসিইউ’র জন্য বাবা আবু সাইদ দৌড়ঝাঁপ করে দেখলেন, সিরিয়াল অনেক দূরে। আগামী দুই-তিন দিনেও আইসিইউ পাওয়া সম্ভব নয়। কান্না করতে করতে স্ত্রীর পাশে এসে বসলেন সাইদ। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে অঝোরে জল ফেলছেন। এদিকে, ইউসুবের শ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট হওয়ায় সে কান্নার চেষ্টা করছে, কিন্তু শরীর এতটাই দুর্বল যে সেই সামর্থ্যটুকুও তার নেই। স্বজন হারানোর বেদনা ও আইসিইউ সংকট: হাসপাতালের আইসিইউ’র সামনে বাকরুদ্ধ হয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন জাকির হোসেন। মাত্র পাঁচ দিন আগে তার ছয় মাসের যমজ কন্যাসন্তানের একজন, রিসা, হামে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে মারা গেছে। অন্য সন্তান রুহিও এখন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। জাকিরের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতেই তিনি অঝোরে কেঁদে ওঠেন। বলেন, ‘আল্লাহ আমারে দুইটা ফুটফুটে কন্যা উপহার দিয়ে একজনকে (রিসা) নিয়ে গেছেন। রুহি আইসিইউতে আছে, ডাক্তার কইলো ওর অবস্থাও ভালো না। শ্বাস নিতে নাকি প্রচুর কষ্ট হয়। জানি না কপালে কী আছে! ওর মা প্রায় পাগলের মতো হয়ে গেছে।
একটু সামনে এগোতেই দুই মাস বয়সী আয়মানের কান্নায় যেন পুরো ওয়ার্ড ভারী হয়ে ওঠে। আয়মানের হাতেও ক্যানুলা, নাকে নল ও অক্সিজেনের পাইপ। মা জান্নাত আরা বেগম ছেলেকে বুকের ভেতর জড়িয়ে আগলে রেখে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, মুখের ভেতরেও ঘা হওয়ায় কিছুই খাওয়াতে পারছি না। পেটে সবসময় খিদে থাকে, শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। আর যে হাতে ক্যানুলা লাগানো, সে হাতে একটু নাড়া লাগলেই চিৎকার করে ওঠে।
হাসপাতালগুলোর সার্বিক অবস্থা: গত ১৩ এপ্রিল রাজধানীর এই দুটি হাসপাতাল সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, হামের ওয়ার্ডের প্রতিটি শিশু ক্যানুলা ও নাকে প্রবেশ করানো নলের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। অভিভাবকদের চোখেমুখে শুধুই উৎকণ্ঠা। বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালে ৬০টি শয্যার বিপরীতে প্রতিদিনই ৭৫-এর অধিক শিশু ভর্তি থাকে।
শিশু হাসপাতালের আইসিইউতে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, তাদের ১৪টি আইসিইউ বেডের সবকটিতেই রোগী রয়েছে। নতুন কোনো গুরুতর রোগী এই মুহূর্তে ভর্তি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা অনেক শিশুর আইসিইউ প্রয়োজন হলেও তা দেওয়া যাচ্ছে না। একটি আইসিইউ বেডের বিপরীতে একাধিক রোগীর সিরিয়াল রয়েছে।
নাকে নল দিয়ে খাবার দেওয়ার বিষয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. শ্রীবাস পাল বলেন, ‘যাদের তীব্র শ্বাসকষ্ট, তাদের আমরা নাকে নল দিয়ে খাবার দেই। কারণ, এই অবস্থায় মুখে খাবার দিলে তা শ্বাসনালীতে গিয়ে মৃত্যুঝুঁকি অনেকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়।’
সরকারি পদক্ষেপ: হাম নিয়ন্ত্রণে সরকার সারা দেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে। টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের আওতায় আনতে চালু করা হয়েছে ‘ক্যাচ-আপ’ কার্যক্রম। পাশাপাশি ইপিআই কার্যক্রম শক্তিশালী করা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে র্যাপিড রেসপন্স টিম সক্রিয় রাখা এবং আক্রান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
প্রথম ধাপে ১৮টি জেলা ও ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় ১২ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করা হয়েছে। এর আওতায় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের দ্রুত টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ‘হাম-রুবেলা জরুরি টিকাদান কর্মসূচি’র আওতায় ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত আট দিনে ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৩৪০ শিশু টিকা পেয়েছে। যেসব এলাকায় এখনও কর্মসূচি শুরু হয়নি, সেখানে ২০ এপ্রিল থেকে টিকা দেওয়া শুরু হবে।
এছাড়া হাসপাতালগুলোতে হাম রোগীদের জন্য আলাদা চিকিৎসা ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় রাখা হয়েছে। সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও কমিউনিটি পর্যায়েও প্রচার চলছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জানিয়েছেন, টিকাদানের ঘাটতি ও বড় পরিসরের নিয়মিত ক্যাম্পেইন না হওয়ায় হামের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সরকার দ্রুত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের আওতায় আনতে কাজ করছে। লক্ষ্য অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে শয্যা, ভেন্টিলেটর ও জনবল প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়। গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে টিকা নেওয়া এবং লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
এদিকে, সংসদে স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টিকাদান কার্যক্রমে অতীতের গাফিলতির কথা উল্লেখ করায় দায় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক মাসে প্রায় ২০০ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
বিশেষজ্ঞদের মত: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, একসময় দেশে হাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকলেও টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় এটি আবার বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। আগে যেখানে ৯৭-৯৮ শতাংশ শিশু টিকা পেত, এখন তা ৬০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এতে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ ভেঙে গিয়ে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে।
তিনি জানান, হাম খুব সহজে ছড়ায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসে, সংস্পর্শে আসা হাতের মাধ্যমে এবং ব্যবহার্য জিনিস ভাগাভাগি করলে। তাই ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
টিকাদানে ঘাটতির কারণ: সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অনুযায়ী, শিশুকে দুই ধাপে হামের টিকা দেওয়া হয়—৯ মাসে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ। দ্বিতীয় ডোজ না নিলে পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া যায় না।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০ সালে এমআর টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছে ৯১ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ৮৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ শিশু। পরবর্তী বছরগুলোতে কাভারেজ কিছুটা কমে যায়। ২০২৫ সালে তা নেমে দাঁড়ায় প্রথম ডোজ ৯২ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ ৯০ দশমিক ৭৮ শতাংশে। ফলে কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু পূর্ণ টিকার বাইরে থেকে গেছে।
এছাড়া চার বছর পর পর হওয়া ‘এমআর ক্যাচ-আপ’ কর্মসূচি করোনা মহামারির কারণে ব্যাহত হয়। ২০২৪ সালেও তা আয়োজন না হওয়ায় প্রায় ৫-৬ বছরের ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে, যা বর্তমান সংক্রমণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকাদান জোরদার, নজরদারি বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা বাড়ানোই এখন সবচেয়ে জরুরি।



















