Dhaka ০৯:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কুকুর-কুমির ভিডিও: দুর্ঘটনা না গুজব?

নিজেস্ব প্রতিবেদক
12 / 100 SEO Score

 

 দিঘীতে কুমিরের একটি কুকুর শিকার করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর এ নিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।

বাগেরহাটের হজরত খানজাহান আলীর মাজার-এর দিঘীতে কুমিরের কুকুর শিকার করার ভাইরাল ভিডিওকে কেন্দ্র করে অনেক নেটিজেন দাবি করেন, কুকুরটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে কুমিরের খাবার হিসেবে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ আবার অভিযোগ করেন, কুকুরটির পা বেঁধে পানিতে দেওয়া হয়েছিল। এসব পোস্টে লাখো ভিউ ও শত শত মন্তব্য দেখা গেছে।

তবে মাজারের খাদেম, নিরাপত্তাকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, এ ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ দুর্ঘটনা এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো তথ্যের অনেকটাই ভুল।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৮ এপ্রিল বিকালে একটি অসুস্থ কুকুর মাজার এলাকায় কয়েকজনকে কামড় দেয়। স্থানীয়রা কুকুরটিকে তাড়াতে লাঠি ছুড়ে মারলে সেটি দৌড়ে নারীদের ঘাট থেকে প্রধান ঘাটের দিকে চলে যায়।

এ সময় মাজারের নিরাপত্তাকর্মী মো. ফোরকান হাওলাদারকে আঁচড় দেয়। তিনি পা ঝাড়া দিলে কুকুরটি পানিতে পড়ে যায়। পরে দিঘীতে থাকা কুমিরটি কুকুরটিকে ধরে পানির নিচে নিয়ে যায়। এই অংশটুকুই ভিডিওতে ধারণ হয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ওই এলাকার স্থানীয় আরাফাত জানান, কুকুরটি অসুস্থ ছিল এবং কয়েকজনকে কামড়ানোর পাশাপাশি দুই-তিনটি মুরগিও মেরে ফেলে। সামনে যাকে পাচ্ছিল তাকেই তাড়া করছিল।

এ সময় কয়েকজন দোকানি ও স্থানীয় লোক কুকুরটিকে তাড়ালে সেটি দিঘীর দিকে চলে যায় এবং পরে পানিতে পড়ে যায়।

মাজারের নিরাপত্তাপ্রহরী মো. ফোরকান হাওলাদার জানান, কুকুরটির আঁচড়ে আহত হয়ে তিনি বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে টিকা নিয়েছেন। তার ভাষায়, একটা পাগলা কুকুর কয়েকজনকে কামড়ায়।

আমি ঘাটে লোকজনকে সতর্ক করছিলাম। কুকুরটা এসে আমাকে আঁচড় দেয়। পা ঝাড়া দিলে সেটি পানিতে পড়ে যায় তখন কুমির ধরে নিয়ে যায়।

মাজারের পাশের দোকানি বিনা আক্তার জানান, কুকুরটি তার দোকানের সামনেও কয়েকজনকে আক্রমণ করে এবং একটি শিশুকেও কামড় দেয়। পরে কুকুরটি পানিতে পড়ে গেলে কুমির ধরে নিয়ে যায়। এ নিয়ে এখন সামাজিক মাধ্যমে নানা মিথ্যা গল্প ছড়ানো হচ্ছে।

ওই কুমিরের সঙ্গে বন্ধুর সম্পর্ক থাকা মেহেদী হাসান তপু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাজারের দিঘীর কুমিরটির সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলা, কুমিরের কাছে গিয়ে খাওয়ানো, গায়ে হাত দিয়ে আদর করা বিভিন্ন রকম ভিডিওতে আপনারা আমাকে দেখছেন।

বন্ধুর মতো আচরণ করে আমি যা বলি কুমিরটি তাই করে। তবে পূর্ণিমার সময় কুমিরটি ডিম দেওয়ায় ওই সময় মাদী কুমির কিছুটা বেশি হিংস্র হয়ে থাকে।

তার মতে, কুকুরটি হঠাৎ কুমিরের সামনে পড়ে যাওয়ায় তখন কাউকে উদ্ধার করতে নামা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

তিনি আরও বলেন, আপনারা অনেকেই দেখেছেন, কুমিরটার সঙ্গে আমার একটা গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কাছাকাছি থাকায় ওর আচরণ কিছুটা বুঝতে পারি।

এরপরেও আমি সব সময় সাবধানতা অবলম্বন করি। কারণ এটি বন্য প্রাণী, যে কোনো সময় আচরণ বদলে আক্রমণ করতে পারে। তাই আমি নিজেও সতর্ক থাকি এবং অন্যদেরও অযথা কাছে না যেতে বলি। ঘটনাটির সময় কেউ পানিতে নামলে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।

মাজারের খাদেমরা জানান, বর্তমানে দিঘীতে একটি মাত্র কুমির রয়েছে। এটি খানজাহান (রহ.)–এর সময়কার নয়। আগের কুমিরগুলো বিলুপ্তির পথে গেলে ২০০৫ সালে ভারত থেকে এনে নতুন কুমিরটি ছাড়া হয়।

মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাটি দুর্ঘটনাজনিত হলেও সামাজিক মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।” তিনি যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানান।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

কুকুর-কুমির ভিডিও: দুর্ঘটনা না গুজব?

Update Time : ০২:৫৯:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
12 / 100 SEO Score

 

 দিঘীতে কুমিরের একটি কুকুর শিকার করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর এ নিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।

বাগেরহাটের হজরত খানজাহান আলীর মাজার-এর দিঘীতে কুমিরের কুকুর শিকার করার ভাইরাল ভিডিওকে কেন্দ্র করে অনেক নেটিজেন দাবি করেন, কুকুরটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে কুমিরের খাবার হিসেবে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ আবার অভিযোগ করেন, কুকুরটির পা বেঁধে পানিতে দেওয়া হয়েছিল। এসব পোস্টে লাখো ভিউ ও শত শত মন্তব্য দেখা গেছে।

তবে মাজারের খাদেম, নিরাপত্তাকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, এ ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ দুর্ঘটনা এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো তথ্যের অনেকটাই ভুল।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৮ এপ্রিল বিকালে একটি অসুস্থ কুকুর মাজার এলাকায় কয়েকজনকে কামড় দেয়। স্থানীয়রা কুকুরটিকে তাড়াতে লাঠি ছুড়ে মারলে সেটি দৌড়ে নারীদের ঘাট থেকে প্রধান ঘাটের দিকে চলে যায়।

এ সময় মাজারের নিরাপত্তাকর্মী মো. ফোরকান হাওলাদারকে আঁচড় দেয়। তিনি পা ঝাড়া দিলে কুকুরটি পানিতে পড়ে যায়। পরে দিঘীতে থাকা কুমিরটি কুকুরটিকে ধরে পানির নিচে নিয়ে যায়। এই অংশটুকুই ভিডিওতে ধারণ হয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ওই এলাকার স্থানীয় আরাফাত জানান, কুকুরটি অসুস্থ ছিল এবং কয়েকজনকে কামড়ানোর পাশাপাশি দুই-তিনটি মুরগিও মেরে ফেলে। সামনে যাকে পাচ্ছিল তাকেই তাড়া করছিল।

এ সময় কয়েকজন দোকানি ও স্থানীয় লোক কুকুরটিকে তাড়ালে সেটি দিঘীর দিকে চলে যায় এবং পরে পানিতে পড়ে যায়।

মাজারের নিরাপত্তাপ্রহরী মো. ফোরকান হাওলাদার জানান, কুকুরটির আঁচড়ে আহত হয়ে তিনি বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে টিকা নিয়েছেন। তার ভাষায়, একটা পাগলা কুকুর কয়েকজনকে কামড়ায়।

আমি ঘাটে লোকজনকে সতর্ক করছিলাম। কুকুরটা এসে আমাকে আঁচড় দেয়। পা ঝাড়া দিলে সেটি পানিতে পড়ে যায় তখন কুমির ধরে নিয়ে যায়।

মাজারের পাশের দোকানি বিনা আক্তার জানান, কুকুরটি তার দোকানের সামনেও কয়েকজনকে আক্রমণ করে এবং একটি শিশুকেও কামড় দেয়। পরে কুকুরটি পানিতে পড়ে গেলে কুমির ধরে নিয়ে যায়। এ নিয়ে এখন সামাজিক মাধ্যমে নানা মিথ্যা গল্প ছড়ানো হচ্ছে।

ওই কুমিরের সঙ্গে বন্ধুর সম্পর্ক থাকা মেহেদী হাসান তপু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাজারের দিঘীর কুমিরটির সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলা, কুমিরের কাছে গিয়ে খাওয়ানো, গায়ে হাত দিয়ে আদর করা বিভিন্ন রকম ভিডিওতে আপনারা আমাকে দেখছেন।

বন্ধুর মতো আচরণ করে আমি যা বলি কুমিরটি তাই করে। তবে পূর্ণিমার সময় কুমিরটি ডিম দেওয়ায় ওই সময় মাদী কুমির কিছুটা বেশি হিংস্র হয়ে থাকে।

তার মতে, কুকুরটি হঠাৎ কুমিরের সামনে পড়ে যাওয়ায় তখন কাউকে উদ্ধার করতে নামা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

তিনি আরও বলেন, আপনারা অনেকেই দেখেছেন, কুমিরটার সঙ্গে আমার একটা গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কাছাকাছি থাকায় ওর আচরণ কিছুটা বুঝতে পারি।

এরপরেও আমি সব সময় সাবধানতা অবলম্বন করি। কারণ এটি বন্য প্রাণী, যে কোনো সময় আচরণ বদলে আক্রমণ করতে পারে। তাই আমি নিজেও সতর্ক থাকি এবং অন্যদেরও অযথা কাছে না যেতে বলি। ঘটনাটির সময় কেউ পানিতে নামলে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।

মাজারের খাদেমরা জানান, বর্তমানে দিঘীতে একটি মাত্র কুমির রয়েছে। এটি খানজাহান (রহ.)–এর সময়কার নয়। আগের কুমিরগুলো বিলুপ্তির পথে গেলে ২০০৫ সালে ভারত থেকে এনে নতুন কুমিরটি ছাড়া হয়।

মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাটি দুর্ঘটনাজনিত হলেও সামাজিক মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।” তিনি যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানান।