Dhaka ০৫:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃষ্টি নামলেই ডুবে ঢাকা

জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ শেষ হচ্ছে না নগরবাসীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
10 / 100 SEO Score

 

*** ড্রেনেজের প্রতিবন্ধকতায় ধীর পানি নিষ্কাশন, বাড়ছে যানজট
*** জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় মাঠে ডিএসসিসির জরুরি টিম
**** স্থায়ী সমাধানে খাল-ড্রেনেজ সংস্কার ও সমন্বিত পরিকল্পনার উদ্যোগ

বৃষ্টি নামলেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও তারও বেশি। জলাবদ্ধ সড়কে আটকে পড়ে যানবাহন, ধীর হয়ে যায় নগরীর স্বাভাবিক চলাচল। ভোগান্তিতে পড়েন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও পথচারীরা। রোববার ভোর থেকে টানা বৃষ্টিতে ঢাকার বিভিন্ন নিচু এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে আবারও দেখা গেল সেই পরিচিত চিত্র। কোথাও সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও গাড়ির ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে, কোথাও পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে হয়েছে মানুষকে।

পল্টন, মালিবাগ, মৌচাক, কাকরাইল, মতিঝিল, আরামবাগ, গুলিস্তান, মুগদা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, গোড়ান, মানিকনগর ও তালতলাসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও পানির উচ্চতা এতটাই বেড়ে যায় যে রিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের চাকা প্রায় ডুবে যায়। ফুটপাত দিয়েও স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে। জলাবদ্ধতার কারণে যানবাহনের গতি কমে যাওয়ায় বিভিন্ন সড়কে তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট।

অল্প দূরত্বের পথ পাড়ি দিতেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি সময় লাগে। জলাবদ্ধ সড়কে আটকে পড়ে বেশ কিছু সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়ি। কোথাও চালকদের গাড়ি ঠেলে সরিয়ে নিতে দেখা যায়। অতিরিক্ত পানির কারণে অনেক সড়কে রিকশা ও ভ্যান চলাচলও ব্যাহত হয়।

রামপুরা এলাকার বাসিন্দা মহিমা আক্তার বলেন, বৃষ্টির পর রাস্তায় পানি জমে যাওয়ায় সকাল থেকেই চলাচলে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে না পারায় অল্প দূরত্বের পথ পাড়ি দিতেও বেশি সময় লাগছে। পানি বেশি থাকায় হেঁটে যাওয়ারও সুযোগ নেই।

মৌচাক এলাকার পথচারী লিটন মাহমুদ বলেন, রাস্তায় পানি জমে থাকায় হেঁটে চলাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যানজট থাকায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

মতিঝিলের পথচারী সাজেদুর রহমান জানান, ভোরে বৃষ্টি হলেও পরে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে ছিল। কোথাও কোথাও হাঁটুপানি থাকায় অফিসপাড়ায় মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়েছে।

সিএনজিচালক এরশাদ আলী বলেন, সকাল থেকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। মতিঝিলেও অনেক জায়গা পানিতে ডুবে ছিল। বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতার পানিতে সিএনজির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ায় চালকদের গাড়ি ঠেলে নিতে হয়েছে।

জলাবদ্ধতার মধ্যে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সকাল থেকেই সড়কে দায়িত্ব পালন করেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। তবে পানি জমে থাকায় তাঁদেরও বেগ পেতে হয়। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সবুজবাগ জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মামুনুর রশীদ বলেন, বৃষ্টির পর মালিবাগ, মৌচাক ও কাকরাইল হয়ে খিলগাঁও এলাকার সড়কে ব্যাপক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। কোথাও সড়কের এক লেন দিয়েও যান চলাচল করানো সম্ভব হয়নি।

পানি নিষ্কাশনের জন্য সিটি করপোরেশনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, সড়ক থেকে পানি না সরলে যান চলাচল স্বাভাবিক করা কঠিন।

এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে ভোর থেকেই মাঠে কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। ডিএসসিসির মুখপাত্র রাসেল রহমান জানান, ভোর ৪টা থেকে মুষলধারে বজ্রসহ বৃষ্টির কারণে সংস্থার আওতাধীন কিছু নিম্নাঞ্চল ও ঢালু সড়কে সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ড্রেনেজ লাইনের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং পানি নিষ্কাশনের কাজ চলছে।

তবে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি রাজধানীর জলাবদ্ধতার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ডিএসসিসি এ বছর ৩৩টি জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করেছে। এসব এলাকায় ড্রেন, খাল ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কারের পাশাপাশি ভারী বৃষ্টির সময় পানি সরাতে বহনযোগ্য পাম্প ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চারটি খালের পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধারের কাজও চলমান রয়েছে।

ডিএসসিসির ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটেও জলাবদ্ধতা নিরসনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি ৫৭টি ওয়ার্ডের জন্য একটি ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এর লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়ানো এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমানো।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও ড্রেনেজ ও ম্যানহোল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং খাল সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নিয়েছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে জলাবদ্ধতা প্রশমনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ সচল রাখতে খাল সংরক্ষণের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।

শুধু সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম নয়, খালগুলোকে দখলমুক্ত ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের জুনে স্থানীয় সরকার বিভাগ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার খালগুলোর সীমানা নির্ধারণে দুটি কমিটি গঠন করেছে। এসব কমিটির কাজের মধ্যে খালের প্রকৃত সীমানা চিহ্নিত করা, দখলমুক্তকরণে সহায়তা করা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয় রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে ড্রেন, খাল ও বক্স কালভার্ট থেকে ময়লা-পলি অপসারণ এবং ভারী বৃষ্টির সময় পাম্প ব্যবহার করে পানি সরানো। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় ড্রেনেজ অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে খাল ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ পুনরুদ্ধারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে শুধু ড্রেন পরিষ্কার বা পাম্প দিয়ে পানি সরানো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ রক্ষা করতে হবে। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি ড্রেন ও খালে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করাও জরুরি। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনও ঢাকার পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাকে প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিকায়ন এবং নদী-খাল-জলাশয়কে একটি সংযুক্ত পানি নিষ্কাশন নেটওয়ার্কে আনার প্রস্তাব দিয়েছে।

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। রোববার ঢাকার আকাশ আংশিক মেঘলা থেকে মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে। এ সময় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।

দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণও হতে পারে।

প্রতি বর্ষায় বৃষ্টির সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার একই চিত্র ফিরে আসায় নগরবাসীর প্রশ্ন—এই দুর্ভোগের স্থায়ী অবসান কবে? তাৎক্ষণিকভাবে পানি সরানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো, খাল ও জলাশয় রক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রমই পারে বৃষ্টির পর ঢাকার চেনা জলাবদ্ধতার চিত্র বদলাতে।

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

2 + 18 =

About Author Information

বৃষ্টি নামলেই ডুবে ঢাকা

জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ শেষ হচ্ছে না নগরবাসীর

Update Time : ০৭:৪৯:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
10 / 100 SEO Score

 

*** ড্রেনেজের প্রতিবন্ধকতায় ধীর পানি নিষ্কাশন, বাড়ছে যানজট
*** জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় মাঠে ডিএসসিসির জরুরি টিম
**** স্থায়ী সমাধানে খাল-ড্রেনেজ সংস্কার ও সমন্বিত পরিকল্পনার উদ্যোগ

বৃষ্টি নামলেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও তারও বেশি। জলাবদ্ধ সড়কে আটকে পড়ে যানবাহন, ধীর হয়ে যায় নগরীর স্বাভাবিক চলাচল। ভোগান্তিতে পড়েন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও পথচারীরা। রোববার ভোর থেকে টানা বৃষ্টিতে ঢাকার বিভিন্ন নিচু এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে আবারও দেখা গেল সেই পরিচিত চিত্র। কোথাও সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও গাড়ির ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে, কোথাও পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে হয়েছে মানুষকে।

পল্টন, মালিবাগ, মৌচাক, কাকরাইল, মতিঝিল, আরামবাগ, গুলিস্তান, মুগদা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, গোড়ান, মানিকনগর ও তালতলাসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও পানির উচ্চতা এতটাই বেড়ে যায় যে রিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের চাকা প্রায় ডুবে যায়। ফুটপাত দিয়েও স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে। জলাবদ্ধতার কারণে যানবাহনের গতি কমে যাওয়ায় বিভিন্ন সড়কে তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট।

অল্প দূরত্বের পথ পাড়ি দিতেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি সময় লাগে। জলাবদ্ধ সড়কে আটকে পড়ে বেশ কিছু সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়ি। কোথাও চালকদের গাড়ি ঠেলে সরিয়ে নিতে দেখা যায়। অতিরিক্ত পানির কারণে অনেক সড়কে রিকশা ও ভ্যান চলাচলও ব্যাহত হয়।

রামপুরা এলাকার বাসিন্দা মহিমা আক্তার বলেন, বৃষ্টির পর রাস্তায় পানি জমে যাওয়ায় সকাল থেকেই চলাচলে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে না পারায় অল্প দূরত্বের পথ পাড়ি দিতেও বেশি সময় লাগছে। পানি বেশি থাকায় হেঁটে যাওয়ারও সুযোগ নেই।

মৌচাক এলাকার পথচারী লিটন মাহমুদ বলেন, রাস্তায় পানি জমে থাকায় হেঁটে চলাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যানজট থাকায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

মতিঝিলের পথচারী সাজেদুর রহমান জানান, ভোরে বৃষ্টি হলেও পরে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে ছিল। কোথাও কোথাও হাঁটুপানি থাকায় অফিসপাড়ায় মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়েছে।

সিএনজিচালক এরশাদ আলী বলেন, সকাল থেকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। মতিঝিলেও অনেক জায়গা পানিতে ডুবে ছিল। বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতার পানিতে সিএনজির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ায় চালকদের গাড়ি ঠেলে নিতে হয়েছে।

জলাবদ্ধতার মধ্যে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সকাল থেকেই সড়কে দায়িত্ব পালন করেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। তবে পানি জমে থাকায় তাঁদেরও বেগ পেতে হয়। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সবুজবাগ জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মামুনুর রশীদ বলেন, বৃষ্টির পর মালিবাগ, মৌচাক ও কাকরাইল হয়ে খিলগাঁও এলাকার সড়কে ব্যাপক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। কোথাও সড়কের এক লেন দিয়েও যান চলাচল করানো সম্ভব হয়নি।

পানি নিষ্কাশনের জন্য সিটি করপোরেশনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, সড়ক থেকে পানি না সরলে যান চলাচল স্বাভাবিক করা কঠিন।

এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে ভোর থেকেই মাঠে কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। ডিএসসিসির মুখপাত্র রাসেল রহমান জানান, ভোর ৪টা থেকে মুষলধারে বজ্রসহ বৃষ্টির কারণে সংস্থার আওতাধীন কিছু নিম্নাঞ্চল ও ঢালু সড়কে সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ড্রেনেজ লাইনের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং পানি নিষ্কাশনের কাজ চলছে।

তবে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি রাজধানীর জলাবদ্ধতার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ডিএসসিসি এ বছর ৩৩টি জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করেছে। এসব এলাকায় ড্রেন, খাল ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কারের পাশাপাশি ভারী বৃষ্টির সময় পানি সরাতে বহনযোগ্য পাম্প ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চারটি খালের পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধারের কাজও চলমান রয়েছে।

ডিএসসিসির ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটেও জলাবদ্ধতা নিরসনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি ৫৭টি ওয়ার্ডের জন্য একটি ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এর লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়ানো এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমানো।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও ড্রেনেজ ও ম্যানহোল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং খাল সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নিয়েছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে জলাবদ্ধতা প্রশমনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ সচল রাখতে খাল সংরক্ষণের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।

শুধু সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম নয়, খালগুলোকে দখলমুক্ত ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের জুনে স্থানীয় সরকার বিভাগ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার খালগুলোর সীমানা নির্ধারণে দুটি কমিটি গঠন করেছে। এসব কমিটির কাজের মধ্যে খালের প্রকৃত সীমানা চিহ্নিত করা, দখলমুক্তকরণে সহায়তা করা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয় রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে ড্রেন, খাল ও বক্স কালভার্ট থেকে ময়লা-পলি অপসারণ এবং ভারী বৃষ্টির সময় পাম্প ব্যবহার করে পানি সরানো। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় ড্রেনেজ অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে খাল ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ পুনরুদ্ধারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে শুধু ড্রেন পরিষ্কার বা পাম্প দিয়ে পানি সরানো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ রক্ষা করতে হবে। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি ড্রেন ও খালে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করাও জরুরি। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনও ঢাকার পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাকে প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিকায়ন এবং নদী-খাল-জলাশয়কে একটি সংযুক্ত পানি নিষ্কাশন নেটওয়ার্কে আনার প্রস্তাব দিয়েছে।

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। রোববার ঢাকার আকাশ আংশিক মেঘলা থেকে মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে। এ সময় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।

দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণও হতে পারে।

প্রতি বর্ষায় বৃষ্টির সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার একই চিত্র ফিরে আসায় নগরবাসীর প্রশ্ন—এই দুর্ভোগের স্থায়ী অবসান কবে? তাৎক্ষণিকভাবে পানি সরানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো, খাল ও জলাশয় রক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রমই পারে বৃষ্টির পর ঢাকার চেনা জলাবদ্ধতার চিত্র বদলাতে।