জ্বালানি সংকট: উৎপাদন ব্যয় ঊর্ধ্বমুখী, বাড়ছে পণ্যের দাম
*** গ্যাসের কম চাপ ও অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহে কমছে শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা
*** জেনারেটর ও বিকল্প ব্যবস্থায় বাড়ছে কারখানার পরিচালন ব্যয়
*** রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ নিয়ে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা
দেশের শিল্প খাতে জ্বালানি সংকট ক্রমেই বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। গ্যাসের কম চাপ, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ ও লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন সচল রাখতে শিল্পোদ্যোক্তাদের জেনারেটরসহ বিভিন্ন বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। একই সময়ে জ্বালানির ঘাটতির কারণে কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব না হওয়ায় উৎপাদনের পরিমাণও কমছে। ফলে প্রতি ইউনিট পণ্যের গড় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, এ বাড়তি ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামেও প্রতিফলিত হবে।
দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি টেক্সটাইল, ডাইং, ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্পেও জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে।
গ্যাসের চাপ কম থাকলে অনেক শিল্পকারখানার উৎপাদনযন্ত্র নির্ধারিত ক্ষমতায় চালানো যায় না। উৎপাদনের গতি কমে যায় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্ডার সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার বিদ্যুৎ সরবরাহে হঠাৎ বিঘ্ন বা ভোল্টেজের ওঠানামা হলে আধুনিক ও সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা নষ্ট হলে কাঁচামাল বা উৎপাদনাধীন পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
উৎপাদন কমলেও স্থায়ী ব্যয় কমছে না: জ্বালানি সংকটের বড় প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ব্যয়ের ওপর। একটি কারখানা তার নির্ধারিত সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করলেও শ্রমিকের বেতন, ভবন ও জমির ভাড়া, ব্যাংকঋণের কিস্তি, রক্ষণাবেক্ষণসহ বেশির ভাগ নির্ধারিত ব্যয় অপরিবর্তিত থাকে। ফলে কম পণ্য উৎপাদনের বিপরীতে একই পরিমাণ স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে বিকল্প ব্যবস্থার অতিরিক্ত খরচ। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখতে অতিরিক্ত জ্বালানি ও বিকল্প ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে একই পরিমাণ পণ্য উৎপাদনে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে মুনাফা কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন চালু রাখাটাই আর্থিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে। উৎপাদনের পরিমাণ কমে গেলে প্রতি ইউনিট পণ্যের খরচ আরও বেড়ে যায়। এর ফলে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়।
রপ্তানি খাতেও বাড়ছে ঝুঁকি: জ্বালানি সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের রপ্তানি খাতে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও নিটওয়্যার শিল্পে সময়মতো উৎপাদন শেষ করতে না পারায় রপ্তানি আদেশের নির্ধারিত সময়সূচি ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, চলমান গ্যাস–সংকটের কারণে বিদ্যমান রপ্তানি আদেশ সময়মতো শিপমেন্ট করা যাচ্ছে না।
রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য এটি উদ্বেগের বিষয়। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। কোনো কারণে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব না হলে ক্রেতার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে নতুন রপ্তানি আদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে মূল্য ও সরবরাহ সক্ষমতার দিক থেকে প্রতিযোগিতা করতে হয়। জ্বালানি সংকটের কারণে যদি দেশের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, এতে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ঋণ ও পরিচালন ব্যয়েও বাড়ছে চাপ: উৎপাদন ব্যাহত হলেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দায় কমছে না। শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি, কারখানার ভাড়া ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় নিয়মিত বহন করতে হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ অর্থের প্রবাহে চাপ তৈরি হতে পারে।
বিকেএমইএর পক্ষ থেকে জ্বালানি সংকটের কারণে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তত ছয় মাস খেলাপি বা শ্রেণীকৃত ঋণ হিসেবে বিবেচনা না করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া জুন ও জুলাই মাসের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল আগামী ১২ মাসে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। বিল পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে সংকটে থাকা শিল্পকারখানার গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার অনুরোধও করা হয়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, সংকটের সময়ে এসব সুবিধা পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িক আর্থিক চাপ সামলে উৎপাদন চালু রাখতে পারবে। একই সঙ্গে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সরকার বা পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে নিয়মিত ব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা করা হলে উদ্যোক্তারা উৎপাদন ও রপ্তানি পরিকল্পনা আগেভাগে সমন্বয় করতে পারবেন।
প্রয়োজন স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান: শিল্প খাতের বর্তমান সংকট সাময়িকভাবে মোকাবিলা করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার ওপর জোর দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। তাঁদের মতে, শিল্পের ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনা জরুরি।
গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা বিবেচনায় স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পে গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎসহ বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
এ ছাড়া অবৈধ গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি গণপরিবহন ছাড়া অন্যান্য খাতে সিএনজির পরিবর্তে এলপিজি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এখন শিল্পের উৎপাদন, রপ্তানি, বিনিয়োগ ও পণ্যের দামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে। কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো না গেলে উৎপাদনের পরিমাণ কমে যায়, কিন্তু স্থায়ী ব্যয় অপরিবর্তিত থাকে। এর সঙ্গে বিকল্প জ্বালানির বাড়তি খরচ যুক্ত হওয়ায় উৎপাদনের গড় ব্যয় আরও বেড়ে যায়। সেই ব্যয় উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন বহন করতে না পারলে তার একটি অংশ পণ্যের দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
ফলে জ্বালানি সংকট এখন শুধু শিল্পকারখানার সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়ছে সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারেও। একদিকে উৎপাদন ও রপ্তানি ধরে রাখার চাপ, অন্যদিকে বাড়তি ব্যয় সামলানোর চ্যালেঞ্জ দুই দিক থেকেই চাপে পড়েছেন উদ্যোক্তারা। এ অবস্থায় জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।















