ডিমের বাজারে অদৃশ্য হাত, লাভের ভাগ যায় মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে
প্রোটিনের অন্যতম সহজলভ্য উৎস ডিম। স্বল্প আয়ের মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে ডিমের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু বাজারে ডিমের দাম বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একদিকে বাড়তি দামের কারণে ভোক্তাকে হিসাব করে ডিম কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন করেও ন্যায্য মুনাফা পাচ্ছেন না খামারিরা। খামার থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছানোর পথে দামের বড় ব্যবধান তৈরি হলেও এর সুফল উৎপাদকের ঘরে পৌঁছাচ্ছে না। বরং সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা ও মুনাফার কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বর্তমানে খুচরা বাজারে একটি ডিম কিনতে ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে ১৩ টাকারও বেশি। অথচ একটি ডিম উৎপাদনে খামারির খরচ হচ্ছে প্রায় ১০ টাকা ২৫ পয়সা। খামার থেকে আড়তদার ডিম কিনছেন প্রায় ১১ টাকা ১১ পয়সায়। অর্থাৎ উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে খামারির হাতে থাকছে এক টাকারও কম। বিপরীতে কয়েক হাত ঘুরে একই ডিম খুচরা বাজারে পৌঁছানোর পর দাম বেড়ে যাচ্ছে আরও কয়েক টাকা।
দেশের ডিমের বাজারে এই বৈপরীত্য এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে উৎপাদন খরচের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না খামারিরা, অন্যদিকে বেশি দামে ডিম কিনতে গিয়ে চাপে পড়ছেন সাধারণ ভোক্তারা। মাঝখানে সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে যুক্ত ব্যবসায়ীদের মুনাফার কারণে খামার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত দামের ব্যবধান বাড়ছে বলে অভিযোগ করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তাদের দাবি, ডিমের বাজারে উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হওয়ার পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা এবং অস্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণপ্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে ডিমের দাম বাড়লে ভোক্তাকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হলেও সেই বাড়তি দামের পুরো সুবিধা পাচ্ছেন না উৎপাদক। আবার বাজারে দাম পড়ে গেলে লোকসানের বড় চাপও বহন করতে হচ্ছে খামারিদের।
এ পরিস্থিতিতে ডিমের বাজারে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফার কাঠামো স্বচ্ছ করা এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থা পুনর্গঠনের দাবি জোরালো হচ্ছে।
উৎপাদন বাড়লেও স্বস্তি নেই বাজারে: দেশে ডিমের উৎপাদন গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এক অর্থবছরে দেশে ডিম উৎপাদিত হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৪৯৩ কোটি পিস। পরবর্তী সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫০৯ কোটি পিসে। অর্থাৎ এ সময়ে ডিমের উৎপাদন বেড়েছে ৬৮ শতাংশের বেশি।
বর্তমানে দেশে প্রতিদিন ছয় কোটির বেশি ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে। বিপুলসংখ্যক ছোট ও মাঝারি খামারি নিজেদের বিনিয়োগ, শ্রম এবং ঝুঁকি নিয়ে এই উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন।
কিন্তু উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খামারিদের আয় ও বাজারে তাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়েনি। বরং উৎপাদন খরচ, পোলট্রি খাদ্যের দাম এবং বাজারদরের অনিশ্চয়তা তাদের ব্যবসাকে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতিদিন ছয় কোটির বেশি ডিমের প্রতিটিতে যদি সরবরাহব্যবস্থার মধ্যবর্তী স্তরে গড়ে দুই টাকা করে ব্যবধান তৈরি হয়, তাহলে সেই ব্যবধানের মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ কোটি টাকা। তবে এই হিসাবকে সরাসরি মধ্যস্বত্বভোগীদের নিট মুনাফা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরিবহন, সংরক্ষণ, শ্রম, ভাঙা ডিমের ক্ষতি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।
তবু উৎপাদন খরচ ও খামারির বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে খুচরা বাজারের দামের যে ব্যবধান দেখা যাচ্ছে, তা বাজারের বিভিন্ন স্তরে মূল্য সংযোজন ও মুনাফা বণ্টনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
দাম বাড়ে, কিন্তু খামারির আয় বাড়ে না: ডিমের বাজারে খামারির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, উৎপাদন করলেও তিনি সব সময় নিজের পণ্যের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন না। বাজারে চাহিদা, সরবরাহ, আড়তদারদের নির্ধারিত দর এবং ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্তের ওপর অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করতে হয় তাকে।
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদারের অভিযোগ, ডিম ও মুরগির উৎপাদন করেন প্রান্তিক খামারিরা, অথচ বাজারে দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের কার্যকর ভূমিকা নেই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ডিম ব্যবসায়ী সমিতির নির্ধারিত দর অনুসরণ করে দেশের বিভিন্ন আড়তে বেচাকেনা হয়। অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনে বার্তার মাধ্যমে দর জানানো হয় এবং সেই দরেই খামারিদের ডিম বিক্রি করতে হয়।
তার অভিযোগ, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব ও অতিমুনাফার প্রবণতা ডিমের দামের অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। উৎপাদন বেশি হলে খামারিকে কম দামে ডিম বিক্রি করতে হয়, আবার উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও সব সময় সেই অনুযায়ী বিক্রয়মূল্য বাড়ে না।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরীও মনে করেন, খামার থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছানোর পথে মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীদের কারণে ডিমের দামে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিটি ডিমে দুই টাকা বা তারও বেশি ব্যবধান দেখা যায়।
তিনি বলেন, ভোক্তাদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে খামারিরাই ডিমের দাম বাড়ান। বাস্তবে খামারিরা সব সময় বাজারদর নির্ধারণ করতে পারেন না। খামার থেকে বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে যারা যুক্ত থাকেন, তাদের ভূমিকার কারণে উৎপাদক ও ভোক্তার দামের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ডিমের বাজারে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া, বিভিন্ন স্তরের ব্যয় এবং ব্যবসায়ীদের মুনাফার হিসাব প্রকাশ করা গেলে এই ব্যবধানের কারণ আরও স্পষ্ট হবে।
উৎপাদন খরচের চাপ বাড়াচ্ছে পোলট্রি খাদ্য: ডিম উৎপাদনের মোট ব্যয়ের বড় অংশই চলে যায় মুরগির খাবার কিনতে। পোলট্রি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের হিসাবে, উৎপাদন ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি খরচ হয় খাদ্যের পেছনে। ফলে ভুট্টা, ব্রান ও তৈরি পোলট্রি ফিডের দাম বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়ে ডিমের উৎপাদন খরচে।
বগুড়ার খামারিরা জানান, পোলট্রি খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ায় খামার পরিচালনার ব্যয় ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের খাদ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি তৈরি ফিডের বস্তাপ্রতি খরচও বেড়েছে। অথচ উৎপাদন খরচ বাড়লেই ডিমের বিক্রয়মূল্য বাড়ানোর সুযোগ পান না খামারিরা।
তাদের ভাষ্য, ফিডসহ প্রায় সব উপকরণের দাম বাড়লেও ডিমের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে খামারিদের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। অনেক সময় উৎপাদন খরচের নিচে ডিম বিক্রি করতে হয়।
এখানে খামারিদের সংকট দ্বিমুখী। একদিকে খাদ্য, শ্রম, বিদ্যুৎ ও খামার পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে বাজারে ডিমের দাম কমে গেলে উৎপাদন অব্যাহত রেখেও লোকসান গুনতে হচ্ছে। আর দাম বাড়লে সেই বাড়তি দামের কতটা উৎপাদকের হাতে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করছে বাজারের সরবরাহব্যবস্থা ও দর নির্ধারণের ওপর।
লোকসানে খামারি, বন্ধ হচ্ছে প্রান্তিক খামার: ডিমের বাজারে দাম কমে যাওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন ছোট ও মাঝারি খামারিরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয়মূল্য কমে গেলে প্রতিটি ডিমেই লোকসান হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই লোকসান চলতে থাকলে খামারের পরিচালন ব্যয় মেটানো, ঋণ পরিশোধ এবং নতুন করে উৎপাদনে বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার খামারিরা বলেন, বছরের বড় একটি সময় খামারিদের লোকসানের মধ্যে থাকতে হয়। যখন বাজারে দাম বাড়ে, তখন সামান্য লাভ পাওয়া যায়। কিন্তু দাম কমে গেলে লোকসানের পরিমাণ অনেক বেশি হয়। এ কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনেক প্রান্তিক খামার বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেন তারা।
ডিম উৎপাদন অন্যান্য অনেক পণ্যের মতো তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ বা চালু করা যায় না। ডিম উৎপাদনের উপযোগী মুরগি তৈরি করতে সময়, অর্থ এবং অবকাঠামো প্রয়োজন। একবার খামার স্থাপন ও মুরগি পালনে বিনিয়োগ করার পর বাজারদর কমে গেলেও খামারির পক্ষে সহজে উৎপাদন বন্ধ করা সম্ভব হয় না।
কারণ, উৎপাদন বন্ধ করলেও আগের বিনিয়োগের ক্ষতি থেকে যায়। অন্যদিকে উৎপাদন চালু রাখলে খাদ্য ও পরিচালন ব্যয় বহন করতে হয়। ফলে অনেক খামারি লোকসান জেনেও উৎপাদন চালিয়ে যেতে বাধ্য হন। বাজারে দাম বাড়ার অপেক্ষায় থাকতে হয় তাদের।
এই পরিস্থিতিতে প্রান্তিক খামারিদের জন্য ন্যায্য বিক্রয়মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ডিমের উৎপাদনব্যবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে ছোট খামারগুলো বন্ধ হয়ে গেলে উৎপাদন ও বাজার সরবরাহে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাজারে অস্থিরতার দায় কার?
ডিমের বাজারে দাম বাড়া কিংবা কমার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। উৎপাদনের পরিমাণ, মৌসুমি চাহিদা, পোলট্রি খাদ্যের দাম, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা—সবকিছুই বাজারদরকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব স্বাভাবিক ব্যয়ের বাইরে বাজারের বিভিন্ন স্তরে অস্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ ও অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা থাকলে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদারের মতে, বাজারে কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাব ডিমের দাম নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। তিনি মনে করেন, বাজারে কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই অস্থিরতা কমানো কঠিন।
তবে সরবরাহব্যবস্থার মধ্যবর্তী সব ব্যবসায়ীকে একইভাবে দায়ী করার সুযোগ নেই। আড়তদার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের পরিবহন, শ্রম, পণ্য নষ্ট হওয়া এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় রয়েছে। তাই প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করতে খামার থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ক্রয়মূল্য, বিক্রয়মূল্য, পরিচালন ব্যয় ও মুনাফার তথ্য বিশ্লেষণ করা জরুরি।
বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি শনাক্ত করা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বিতভাবে দাম নির্ধারণের অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
দাম কমলে ব্যবস্থা নেই, বাড়লে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের আহ্বায়ক মশিউর রহমানের মতে, ডিমের বাজারে নীতিগত অসংগতি রয়েছে। তার অভিযোগ, বাজারে দাম বেড়ে গেলে সরকার সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু দাম কমে গিয়ে খামারিরা উৎপাদন খরচ তুলতে না পারলে তাদের সুরক্ষায় কার্যকর সর্বনিম্ন মূল্য নিশ্চিত করা হয় না।
তার প্রশ্ন, সরকার যখন ডিম উৎপাদনের খরচ সম্পর্কে ধারণা রাখে, তখন উৎপাদকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার বিষয়টি কেন সমান গুরুত্ব পাবে না?
বাজার ব্যবস্থাপনায় এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু খুচরা বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণ করলেই উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থ একসঙ্গে রক্ষা করা সম্ভব নয়। খামারির বিক্রয়মূল্য কম থাকলেও যদি খুচরা বাজারে দাম বেশি থাকে, তাহলে বোঝা যায়, সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে মূল্যবৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বাজারে ডিমের সরবরাহ কমে গেলে বা উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে খামারিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। তবে সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে উৎপাদন খরচ, বাজারের চাহিদা, সরবরাহ এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় রাখা জরুরি। নইলে একদিকে খামারি সুরক্ষিত হলেও অন্যদিকে ভোক্তার ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হওয়া উচিত বাজার ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য।
খামারি থেকে ভোক্তাসরাসরি সংযোগের প্রয়োজন: ডিমের বাজারে অস্বাভাবিক দামের ব্যবধান কমানোর অন্যতম উপায় হিসেবে উৎপাদক ও বাজারের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে অনেক প্রান্তিক খামারিকে স্থানীয় সংগ্রাহক বা আড়তদারের মাধ্যমে ডিম বিক্রি করতে হয়। উৎপাদনের পর দ্রুত ডিম বাজারজাত করার প্রয়োজন থাকায় অনেক সময় দর নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগও সীমিত থাকে। এই নির্ভরশীলতা কমাতে খামারিদের সমবায়ভিত্তিক বিপণন, সরাসরি সরবরাহ চুক্তি এবং আধুনিক সংগ্রহ ও পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে খামারিরা বাজারের তথ্য সহজে পাবেন এবং ক্রেতাদের কাছে সরাসরি পণ্য পৌঁছানোর সুযোগ বাড়বে। এতে অপ্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী স্তর কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যয় যথাযথভাবে হিসাব করতে হবে, যাতে নতুন ব্যবস্থায় উৎপাদকের পাশাপাশি ভোক্তাও উপকৃত হন।
একই সঙ্গে প্রতিদিনের খামার পর্যায়ের দর, আড়তদরের তথ্য এবং খুচরা বাজারের মূল্য নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে কোন পর্যায়ে কতটা দাম বাড়ছে, তা সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। বাজারে অস্বাভাবিক ব্যবধান দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষে দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও সহজ হবে।
ডিমের বাজারে স্বচ্ছতা আনাই বড় চ্যালেঞ্জ: দেশে ডিমের উৎপাদন বেড়েছে, মাথাপিছু সরবরাহও বেড়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, বর্তমানে মাথাপিছু বছরে ১৪০টির বেশি ডিমের সরবরাহ রয়েছে। অথচ উৎপাদন বাড়ার সুফল উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ের মধ্যে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, একজন সুস্থ মানুষের বছরে অন্তত ১০৪টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। পুষ্টির চাহিদা পূরণে ডিম গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাজারে দামের অস্থিরতা ও ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সাধারণ মানুষের নিয়মিত ডিম কেনার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে উৎপাদক ন্যায্য মূল্য না পেলে দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে ডিমের বাজারের সংকট কেবল দাম বাড়া বা কমার বিষয় নয়; এর সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা এবং বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতার প্রশ্নও জড়িত।
এ অবস্থায় শুধু খুচরা বাজারে দাম বেঁধে দেওয়া কিংবা সাময়িক অভিযান পরিচালনা করে স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন। প্রয়োজন উৎপাদন খরচের বাস্তবসম্মত হিসাব, স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ, সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি এবং প্রান্তিক খামারিদের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ডিমের দাম বাড়লে কারা কতটা লাভবান হচ্ছেন এবং দাম কমলে কারা লোকসান বহন করছেন—তার নির্ভরযোগ্য হিসাব সামনে আনা। এই তথ্য ছাড়া বাজারের প্রকৃত সমস্যা শনাক্ত করা কিংবা কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
ডিমের বাজারে তাই এখন মূল প্রশ্ন শুধু একটি ডিমের দাম কত, তা নয়। বরং খামারির উৎপাদন, ব্যবসায়ীর মুনাফা এবং ভোক্তার ব্যয়ের মধ্যে ন্যায্য ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ। উৎপাদকের ন্যায্য মূল্য ও ভোক্তার সাশ্রয়ী দামের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা গেলে তবেই ডিমের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে।
পোটিনের গাড়তি হচ্ছে এ রকম একটা কথা শুরতে নিয়ে এস ানিউজ টি আবার সাজাও
ডিমের বাজারে অদৃশ্য হাত, লাভের ভাগ যায় মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে
বিশেষ প্রতিবেদন
প্রোটিনের অন্যতম সহজলভ্য উৎস ডিম। স্বল্প আয়ের মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে ডিমের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু বাজারে ডিমের দাম বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একদিকে বাড়তি দামের কারণে ভোক্তাকে হিসাব করে ডিম কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন করেও ন্যায্য মুনাফা পাচ্ছেন না খামারিরা। খামার থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছানোর পথে দামের বড় ব্যবধান তৈরি হলেও এর সুফল উৎপাদকের ঘরে পৌঁছাচ্ছে না। বরং সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা ও মুনাফার কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বর্তমানে খুচরা বাজারে একটি ডিম কিনতে ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে ১৩ টাকারও বেশি। অথচ একটি ডিম উৎপাদনে খামারির খরচ হচ্ছে প্রায় ১০ টাকা ২৫ পয়সা। খামার থেকে আড়তদার ডিম কিনছেন প্রায় ১১ টাকা ১১ পয়সায়। অর্থাৎ উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে খামারির হাতে থাকছে এক টাকারও কম। বিপরীতে কয়েক হাত ঘুরে একই ডিম খুচরা বাজারে পৌঁছানোর পর দাম বেড়ে যাচ্ছে আরও কয়েক টাকা।
এই ব্যবধানের পুরোটা ব্যবসায়ীদের নিট মুনাফা নয়। পরিবহন, শ্রম, সংরক্ষণ ও পণ্য নষ্ট হওয়ার মতো ব্যয়ও রয়েছে। তবে খামারির বিক্রয়মূল্য ও ভোক্তার ক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় পার্থক্য কেন তৈরি হচ্ছে, তার স্বচ্ছ হিসাব নেই। ফলে একদিকে উৎপাদন করেও খামারি আর্থিক অনিশ্চয়তায় থাকছেন, অন্যদিকে বেশি দামে ডিম কিনতে গিয়ে চাপে পড়ছেন ভোক্তা।
দেশের ডিমের বাজারে এই বৈপরীত্য এখন বড় উদ্বেগের কারণ। উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদক ও ভোক্তা—কেউই বাজারব্যবস্থার সুফল পুরোপুরি পাচ্ছেন না বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, অস্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ এবং দুর্বল বাজার তদারকির কারণে ডিমের দামে অস্বাভাবিক ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ডিমের বাজারে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো জরুরি হয়ে উঠেছে।
উৎপাদন বাড়ছে, পুষ্টির চাহিদা পূরণে বাধা দাম
ডিম প্রাণিজ আমিষের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তুলনামূলক সহজলভ্য হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের খাদ্যতালিকায় এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মাছ, মাংস কিংবা অন্যান্য প্রাণিজ আমিষ নিয়মিত কেনার সামর্থ্য যাদের সীমিত, তাদের জন্য ডিম পুষ্টির চাহিদা পূরণের একটি কার্যকর উপায়। কিন্তু বাজারে ডিমের দাম বেড়ে গেলে এসব পরিবারের খাদ্য ব্যয় বাড়ে, আর অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী ডিম কেনাও কঠিন হয়ে পড়ে।
পুষ্টির চাহিদা পূরণে ডিমের গুরুত্ব বিবেচনায় দেশের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন। তবে শুধু উৎপাদন বাড়লেই সাধারণ মানুষের জন্য ডিম সাশ্রয়ী হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে ব্যয় ও মুনাফার কাঠামো কার্যকরভাবে পরিচালিত না হলে উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাথাপিছু বছরে ১৪০টির বেশি ডিমের সরবরাহ রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, একজন সুস্থ মানুষের বছরে অন্তত ১০৪টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ দেশে ডিমের সরবরাহ বাড়লেও সাশ্রয়ী দামে তা কেনার সুযোগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
এ ক্ষেত্রে বাজারদর ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। ভোক্তার জন্য দাম সাশ্রয়ী রাখতে গিয়ে খামারিকে উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করতে বাধ্য করা হলে দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার উৎপাদন পর্যায়ে দাম কম থাকলেও খুচরা বাজারে তা বেশি হলে সাধারণ মানুষও স্বস্তি পান না। তাই ডিমের বাজারে উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয়ের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এক দশকে উৎপাদন বেড়েছে ৬৮ শতাংশের বেশি
দেশে ডিমের উৎপাদন গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এক অর্থবছরে দেশে ডিম উৎপাদিত হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৪৯৩ কোটি পিস। পরবর্তী সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫০৯ কোটি পিসে। অর্থাৎ এ সময়ে ডিমের উৎপাদন বেড়েছে ৬৮ শতাংশের বেশি।
বর্তমানে দেশে প্রতিদিন ছয় কোটির বেশি ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশ আসে প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে। দেশের ডিমের চাহিদা পূরণে ছোট ও মাঝারি খামারগুলোর অবদান তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু উৎপাদনের এই অগ্রগতির সঙ্গে খামারিদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়েনি। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারদরের অনিশ্চয়তা এবং বিক্রয়মূল্য নির্ধারণে সীমিত ভূমিকার কারণে অনেক খামারিকে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে বাজারে ডিমের দাম বেড়ে গেলে ভোক্তার ব্যয় বাড়লেও সেই বাড়তি দামের কতটা উৎপাদকের হাতে পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতিদিন ছয় কোটির বেশি ডিমের প্রতিটিতে গড়ে দুই টাকা করে দামের ব্যবধান থাকলে মোট ব্যবধানের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ কোটি টাকা। তবে এ হিসাবকে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিট মুনাফা বলা যাবে না। সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে পরিচালন ব্যয় রয়েছে। মূল প্রশ্ন হলো, এসব ব্যয়ের প্রকৃত পরিমাণ কত এবং কোন পর্যায়ে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়ছে।
দাম নির্ধারণে খামারিদের নিয়ন্ত্রণ সীমিত
ডিমের বাজারে খামারিদের অন্যতম বড় সমস্যা হলো, উৎপাদন করলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেদের পণ্যের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন না। বাজারে চাহিদা, সরবরাহ, আড়তদারদের দর এবং ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে তাদের ডিম বিক্রি করতে হয়।
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদারের অভিযোগ, প্রান্তিক খামারিরা ডিম ও মুরগি উৎপাদন করলেও বাজারদর নির্ধারণে তাদের কার্যকর ভূমিকা নেই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ডিম ব্যবসায়ী সমিতির নির্ধারিত দর অনুসরণ করে দেশের বিভিন্ন আড়তে বেচাকেনা হয়। অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনে বার্তার মাধ্যমে দর জানানো হয় এবং সেই দরেই খামারিদের ডিম বিক্রি করতে হয়।
তার মতে, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব ও অতিমুনাফার প্রবণতা ডিমের দামের অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। উৎপাদন বেশি হলে খামারিকে কম দামে ডিম বিক্রি করতে হয়। আবার খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে গেলেও সব সময় সেই অনুপাতে বিক্রয়মূল্য বাড়ানোর সুযোগ থাকে না।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরীও মনে করেন, খামার থেকে বাজারে পৌঁছানোর পথে মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীদের কারণে ডিমের দামে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিটি ডিমে দুই টাকা বা তারও বেশি দামের ব্যবধান দেখা যায়।
তিনি বলেন, ভোক্তাদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে খামারিরাই ডিমের দাম বাড়ান। কিন্তু খামারিরা সব সময় বাজারদর নির্ধারণ করতে পারেন না। খামার থেকে বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে যারা যুক্ত থাকেন, তাদের ভূমিকার কারণে উৎপাদক ও ভোক্তার দামের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ডিমের বাজারে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া, বিভিন্ন স্তরের ব্যয় এবং ব্যবসায়ীদের মুনাফার হিসাব প্রকাশ করা গেলে এই ব্যবধানের কারণ আরও স্পষ্ট হবে।
উৎপাদন খরচের বড় বোঝা পোলট্রি খাদ্য
ডিম উৎপাদনের মোট ব্যয়ের বড় অংশ চলে যায় মুরগির খাবার কিনতে। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, পোলট্রি শিল্পের মোট উৎপাদন ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি খরচ হয় খাদ্যের পেছনে। ফলে ভুট্টা, ব্রান ও তৈরি পোলট্রি ফিডের দাম বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়ে ডিমের উৎপাদন খরচে।
বগুড়ার খামারি হাফিজুর রহমান জানান, পোলট্রি খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ায় খামার পরিচালনার ব্যয় ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের খাদ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি তৈরি ফিডের বস্তাপ্রতি খরচও বেড়েছে।
তার ভাষ্য, ফিডসহ প্রায় সব উপকরণের দাম বাড়লেও ডিমের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে খামারিদের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। অনেক সময় উৎপাদন খরচের নিচেও ডিম বিক্রি করতে হয়।
উৎপাদন ব্যয়ের এই চাপ খামারিদের জন্য দ্বিমুখী সংকট তৈরি করছে। একদিকে খাদ্য, শ্রম, বিদ্যুৎ ও খামার পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে বাজারে ডিমের দাম কমে গেলে উৎপাদন অব্যাহত রেখেও লোকসান গুনতে হচ্ছে। আবার দাম বাড়লে সেই বাড়তি দামের কতটা উৎপাদকের হাতে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করছে সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারদরের ওপর।
তাই উৎপাদন খরচ কমাতে পোলট্রি খাদ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা আনা, খাদ্য উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং খামারিদের উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
লোকসানের চাপে বন্ধ হচ্ছে প্রান্তিক খামার
ডিমের বাজারে দাম কমে যাওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন ছোট ও মাঝারি খামারিরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয়মূল্য কমে গেলে প্রতিটি ডিমেই লোকসান হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে খামারের পরিচালন ব্যয় মেটানো, ঋণ পরিশোধ এবং নতুন করে উৎপাদনে বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার খামারি নুরুল হক বলেন, বছরের বড় একটি সময় খামারিদের লোকসানের মধ্যে থাকতে হয়। যখন বাজারে দাম বাড়ে, তখন সামান্য লাভ পাওয়া যায়। কিন্তু দাম কমে গেলে লোকসানের পরিমাণ অনেক বেশি হয়। এ কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনেক প্রান্তিক খামার বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
ডিম উৎপাদন তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ বা চালু করা যায় না। ডিম উৎপাদনের উপযোগী মুরগি তৈরি করতে সময়, অর্থ এবং অবকাঠামো প্রয়োজন। একবার খামার স্থাপন ও মুরগি পালনে বিনিয়োগ করার পর বাজারদর কমে গেলেও খামারির পক্ষে সহজে উৎপাদন বন্ধ করা সম্ভব হয় না।
উৎপাদন বন্ধ করলেও আগের বিনিয়োগের ক্ষতি থেকে যায়। অন্যদিকে উৎপাদন চালু রাখলে খাদ্য ও পরিচালন ব্যয় বহন করতে হয়। ফলে অনেক খামারি লোকসান জেনেও উৎপাদন চালিয়ে যেতে বাধ্য হন। বাজারে দাম বাড়ার অপেক্ষায় থাকতে হয় তাদের।
এ পরিস্থিতিতে প্রান্তিক খামারিদের জন্য ন্যায্য বিক্রয়মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ডিমের উৎপাদনব্যবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে ছোট খামারগুলো বন্ধ হয়ে গেলে ভবিষ্যতে উৎপাদন ও বাজার সরবরাহে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দাম বাড়লে নিয়ন্ত্রণ, কমলে খামারির দায়
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের আহ্বায়ক মশিউর রহমানের মতে, ডিমের বাজারে নীতিগত অসংগতি রয়েছে। তার অভিযোগ, বাজারে দাম বেড়ে গেলে সরকার সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু দাম কমে গিয়ে খামারিরা উৎপাদন খরচ তুলতে না পারলে তাদের সুরক্ষায় কার্যকর সর্বনিম্ন মূল্য নিশ্চিত করা হয় না।
তার প্রশ্ন, সরকার যখন ডিম উৎপাদনের খরচ সম্পর্কে ধারণা রাখে, তখন উৎপাদকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার বিষয়টি কেন সমান গুরুত্ব পাবে না?
বাজার ব্যবস্থাপনায় এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু খুচরা বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণ করলেই উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থ একসঙ্গে রক্ষা করা সম্ভব নয়। খামারির বিক্রয়মূল্য কম থাকলেও যদি খুচরা বাজারে দাম বেশি থাকে, তাহলে সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে মূল্যবৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বাজারে ডিমের সরবরাহ কমে গেলে বা উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে খামারিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। তবে সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে উৎপাদন খরচ, বাজারের চাহিদা, সরবরাহ এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় রাখা জরুরি। নইলে একদিকে খামারি সুরক্ষিত হলেও অন্যদিকে ভোক্তার ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারে উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের মূল লক্ষ্য।
সরাসরি বাজারসংযোগে কমতে পারে দামের ব্যবধান
ডিমের বাজারে অস্বাভাবিক দামের ব্যবধান কমানোর অন্যতম উপায় হিসেবে উৎপাদক ও বাজারের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে অনেক প্রান্তিক খামারিকে স্থানীয় সংগ্রাহক বা আড়তদারের মাধ্যমে ডিম বিক্রি করতে হয়। উৎপাদনের পর দ্রুত ডিম বাজারজাত করার প্রয়োজন থাকায় অনেক সময় দর নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগও সীমিত থাকে। এই নির্ভরশীলতা কমাতে খামারিদের সমবায়ভিত্তিক বিপণন, সরাসরি সরবরাহ চুক্তি এবং আধুনিক সংগ্রহ ও পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে খামারিরা বাজারের তথ্য সহজে পাবেন এবং ক্রেতাদের কাছে সরাসরি পণ্য পৌঁছানোর সুযোগ বাড়বে। এতে অপ্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী স্তর কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যয় যথাযথভাবে হিসাব করতে হবে, যাতে নতুন ব্যবস্থায় উৎপাদকের পাশাপাশি ভোক্তাও উপকৃত হন।
একই সঙ্গে খামার পর্যায়ের দর, আড়তদরের তথ্য এবং খুচরা বাজারের মূল্য নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে কোন পর্যায়ে কতটা দাম বাড়ছে, তা শনাক্ত করা সহজ হবে। বাজারে অস্বাভাবিক ব্যবধান দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষে দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও সহজ হবে।
পুষ্টি নিশ্চিত করতে চাই সাশ্রয়ী ডিম
ডিমের বাজারের সংকট কেবল দাম বাড়া বা কমার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষের পুষ্টি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং প্রান্তিক খামারিদের টিকে থাকার প্রশ্ন। ডিমের দাম বেশি হলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর খাদ্য ব্যয় বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী ডিম কেনার সুযোগও সীমিত হয়।
অন্যদিকে উৎপাদক ন্যায্য মূল্য না পেলে দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে শুধু খুচরা বাজারে দাম বেঁধে দেওয়া কিংবা সাময়িক অভিযান পরিচালনা করে স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন।
প্রয়োজন উৎপাদন খরচের বাস্তবসম্মত হিসাব, স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ, সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি এবং প্রান্তিক খামারিদের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো। একই সঙ্গে পোলট্রি খাদ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ডিমের দাম বাড়লে কারা কতটা লাভবান হচ্ছেন এবং দাম কমলে কারা লোকসান বহন করছেন—তার নির্ভরযোগ্য হিসাব সামনে আনা। এই তথ্য ছাড়া বাজারের প্রকৃত সমস্যা শনাক্ত করা কিংবা কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
ডিমের বাজারে তাই এখন মূল প্রশ্ন শুধু একটি ডিমের দাম কত, তা নয়; বরং খামারির উৎপাদন খরচ, ব্যবসায়ীর ন্যায্য মুনাফা এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ। উৎপাদকের ন্যায্য মূল্য ও ভোক্তার সাশ্রয়ী দামের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা গেলে তবেই ডিমের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং পুষ্টির অন্যতম সহজলভ্য উৎসটি সাধারণ মানুষের নাগালে রাখা সম্ভব হবে।




















