ঢাকার পানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের বড় পরিকল্পনা
***ঢাকার পানির ভবিষ্যৎ রক্ষায় ৭ জলাধার পরিকল্পনা
***ভূগর্ভস্থ পানির চাপ কমাতে নতুন কৌশল
***আশুলিয়া-বেলাই বিল পাচ্ছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
***কৃত্রিম জলাধারে ১৭ হাজার কোটি লিটার পানি সংরক্ষণ করা যাবে
রাজধানীর ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঢাকা ও আশপাশে সাতটি কৃত্রিম জলাধার নির্মাণ করা হবে। এর মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ২০৫০ সাল পর্যন্ত রাজধানীর পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জলাধারগুলোতে প্রায় ১৭ হাজার কোটি লিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
গত ২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত একনেক সভায় ‘ঢাকা শহরে জরুরি পানি সরবরাহ’ প্রকল্পের আওতায় এ উদ্যোগের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত জলাধারগুলো হবে আশুলিয়া, বেলাই বিল, মকস বিল, উত্তরখান, দাশেরকান্দি, কল্যাণপুর ও গোড়ান-চাটবাড়ি এলাকায়।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুনর্ব্যবহার এবং পানির অপচয় কমানোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ঢাকার ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা পূরণে এসব জলাধার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সাতটি জলাধার নির্মাণে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হবে আশুলিয়া জলাধারে, যেখানে ব্যয়ের প্রস্তাব ১৩ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে বেলাই বিলের জন্য ৯ হাজার ২৭০ কোটি টাকা। এছাড়া মকস বিলে ৫ হাজার ৫৪৯ কোটি, উত্তরখানে ২ হাজার ২৮৯ কোটি এবং দাশেরকান্দিতে ২ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। তুলনামূলকভাবে ছোট দুটি প্রকল্প কল্যাণপুর ও গোড়ান-চাটবাড়ি জলাধারের জন্য মোট ৪৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ তার অধিভুক্ত ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় পানি সরবরাহ সেবা দেয়। তবে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নগরায়ণের ফলে এসব এলাকায় পানির চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
বর্তমানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ৩১৩ কোটি লিটার। বিপরীতে উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি লিটার। সরকারি হিসাবে, দ্রুত নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ২০৩০ সালে এ চাহিদা বেড়ে ৩৩০ কোটি লিটার এবং ২০৫০ সালে ৫৫০ কোটি লিটারে পৌঁছাতে পারে।
এ মুহূর্তে রাজধানীর পানি সরবরাহের প্রায় ৭৭ শতাংশই আসে ১ হাজার ৩৮৮টি গভীর নলকূপ থেকে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ঢাকা ওয়াসা ইতোমধ্যে মেঘনা ও পদ্মা নদীতে কয়েকটি ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনাগার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়াও স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার ঘাটতি পূরণে নতুন সম্পূরক উৎসও চিহ্নিত করতে হবে।
একনেক সভায় উত্থাপিত ওয়াসার প্রতিবেদনে ঢাকা মেট্রোপলিটন ও আশপাশে সাতটি জলাভূমির স্থানের প্রাথমিক মূল্যায়ন উপস্থাপন করা হয়েছে, যেগুলো ভূ-উপরিস্থ পানির জলাধার হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রধান নদী, প্রান্তিক নদী ও বৃষ্টির পানি সংগ্রহের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতারের ভাষ্য, রাজধানীতে জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির চাহিদাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। এ কারণেই সরকার এখন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে।
তিনি জানান, এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ঢাকা ও আশপাশে সাতটি জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কোথায় এবং কীভাবে জলাধার গড়ে তুলে রাজধানীর পানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব, তা নির্ধারণে ইতোমধ্যে প্রাথমিক সমীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রকল্পটি এখনও পরিকল্পনার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।জলাধারের পানি শুধু খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার হবে না। পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনেরও উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সমীক্ষায় যা পাওয়া গেছে: সরকারের প্রাথমিক সমীক্ষায় আশুলিয়া (১ হাজার হেক্টর) ও বেলাই বিল (২ হাজার ২৫০ হেক্টর) জলাধারকে ঢাকার জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ দুটি জলাধার থেকে প্রতিদিন ৪১ কোটিরও বেশি লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ৬৪০ হেক্টর আয়তনের মকস বিল সরাসরি ঢাকার জন্য উপযুক্ত না হলেও গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় পানি সরবরাহের সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, উত্তরখান ও দাশেরকান্দি জলাধারের পানি সরবরাহ সক্ষমতা তুলনামূলক কম। পাশাপাশি রাজউকের বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলসংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে ভবিষ্যতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে আইনগত জটিলতা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, কল্যাণপুর ও গোড়ান-চাটবাড়ি জলাশয়ের পানির মান ও প্রাপ্যতা সন্তোষজনক নয়। তাই প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোকে নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহের উৎস হিসেবে উপযুক্ত মনে করা হয়নি।
ওয়াসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই জলাধারগুলোকে গন্ধর্বপুর ও পদ্মা পানি শোধনাগারসহ অন্যান্য চলমান ও পরিকল্পিত প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয় করে রাজধানীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
ওয়াসার পরিকল্পনায় গন্ধর্বপুর ও পদ্মা পানি শোধনাগারের দ্বিতীয় ধাপের প্রকল্পও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। গন্ধর্বপুর ফেজ-২ প্রকল্পের ইনটেক, সঞ্চালন পাইপলাইন ও শোধনাগারের জন্য প্রয়োজনীয় জমি ইতোমধ্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে হালনাগাদ জরিপ ও প্রযুক্তিগত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
একইভাবে, পদ্মা পানি শোধনাগার ফেজ-২ প্রকল্পের ইনটেক ও শোধনাগারের জমি অধিগ্রহণ শেষ হলেও এখনও পাইপলাইনের রুট চূড়ান্ত করা এবং সেই অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণের কাজ বাকি রয়েছে। এ দুটি প্রকল্প একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৯৫ কোটি লিটার ভূ-উপরিস্থ পানি সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি হবে।
সমীক্ষায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, বালু, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও টঙ্গী খালের মতো প্রান্তিক নদীগুলোতে পর্যাপ্ত পানি থাকলেও দূষণের মাত্রা এত বেশি যে প্রচলিত পদ্ধতিতে তা পরিশোধন করা কঠিন। ফলে কার্যকর দূষণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এসব নদীকে পানি সরবরাহের উৎস হিসেবে ব্যবহার সম্ভব নয়। অন্যদিকে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ভূগর্ভস্থ জলস্তর পুনর্ভরণের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৮ কোটি লিটার পানি সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ জন্য রাজধানীজুড়ে প্রায় ৮৪ হাজার ৫০০টি পুনর্ভরণ ইউনিট স্থাপন করতে হবে।সরকারের প্রাথমিক সুপারিশে আশুলিয়া ও বেলাই বিল জলাধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ দুটি জলাধার নিয়ে দ্রুত বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করার পাশাপাশি প্রান্তিক নদীগুলোকে ভবিষ্যতের পানির উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে হলে আগে কার্যকরভাবে দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর দীর্ঘদিনের অতিনির্ভরতার কারণে তৈরি হওয়া ঝুঁকি কমাতে ঢাকা ওয়াসা ধীরে ধীরে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর কৌশল বাস্তবায়ন করছে। সংস্থাটির মতে, বৃহত্তর ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাই ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস সম্প্রসারণকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার ফেজ-১ ও ২ অন্যতম। শীতলক্ষ্যা নদীর সারুলিয়া পয়েন্ট থেকে পানি আহরণ করে দিনে মোট ৪৫ কোটি লিটার উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু সে জায়গায় ভয়াবহ দূষণ বেড়ে যাওয়ায় ইনটেক সোনারগাঁ উপজেলার হাড়িয়ায় মেঘনার ডান তীরে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন।
পদ্মা পানি শোধনাগার ফেজ-১: মুন্সিগঞ্জের যশলদিয়া এলাকায় পদ্মা নদী থেকে প্রতিদিন ৪৫ কোটি লিটার পানি শোধন করে সরবরাহ করা হচ্ছে।















