ঢাকার যানজট নিরসনে সরকারের নতুন পরিকল্পনা
****যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তানের যানজট নিরসনে বুয়েটের সুপারিশ
****টোল আদায় হবে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে, চার মাসে অ্যাপ
***কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট সরবে গাবতলীতে
***ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল যাবে কেরানীগঞ্জে
রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনে নতুন করে একাধিক উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যানবাহনের চাপ কমানো, গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা, বাস টার্মিনালের ওপর চাপ কমানো, পার্কিং সুবিধা বাড়ানো এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাজধানীর যানজট পরিস্থিতির উন্নতি করতে চায় সরকার।
ঢাকা মহানগরীর চলমান যানজট পরিস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফ্লাইওভারে যানবাহনের চাপ, গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা, বাস টার্মিনালের পুনর্বিন্যাস, পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন নিয়ে শনিবার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে তেজগাঁও কার্যালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে রাজধানীর যানজট কমাতে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন বা ইটিসি ব্যবস্থা চালু, যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান এলাকায় যানজট নিরসনে বুয়েটের বিদ্যমান প্রতিবেদন পর্যালোচনা, ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর এবং কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট গাবতলীতে নেওয়া।
টোল প্লাজায় ইটিসি, চার মাসে অ্যাপ: ঢাকার যানজট ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর অংশ হিসেবে এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারের টোল প্লাজাগুলোতে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন বা ইটিসি ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্তমানে টোল আদায়ের জন্য যানবাহনকে নির্দিষ্ট স্থানে থামতে হয়। এতে ব্যস্ত সময়ে টোল প্লাজার সামনে যানবাহনের সারি তৈরি হয়ে সড়কে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ইটিসি ব্যবস্থা চালু হলে প্রযুক্তির মাধ্যমে টোল আদায়ের প্রক্রিয়া দ্রুত করার সুযোগ তৈরি হবে। এতে যানবাহনের অপেক্ষার সময় কমানো এবং টোল প্লাজার সামনে অপ্রয়োজনীয় জট এড়ানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। টোল আদায় ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও সহজ করতে একটি অ্যাপ তৈরির সিদ্ধান্তও হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগামী চার মাসের মধ্যে অ্যাপ তৈরির কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে টোল ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়বে। একই সঙ্গে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সড়ক বিভাগ, ট্রাফিক পুলিশ, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক সমন্বয়কে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তানে বুয়েটের প্রতিবেদন: রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত ও যানজটপ্রবণ এলাকা যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের আশপাশের যানজট নিরসনেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট আগে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। সেই বিদ্যমান প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে নতুন করে করণীয় নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বুয়েটকে বিদ্যমান প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এ জন্য সময় দেওয়া হয়েছে ১৫ দিন। নতুন প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে ওই এলাকায় যানজট কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশকে সমন্বিতভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যাত্রাবাড়ী রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হওয়ায় এই এলাকার যানজটের প্রভাব আশপাশের বিভিন্ন সড়কেও পড়ে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় প্রবেশ করা যানবাহনের পাশাপাশি রাজধানীর গণপরিবহনের বড় একটি অংশও এই পথে চলাচল করে।
ফলে যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক করা গেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশের সড়কগুলোর ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে বুয়েটের সুপারিশ বাস্তবায়নের পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও আইন প্রয়োগের বিষয়টিও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল যাবে কেরানীগঞ্জে: রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশে বাস ও আন্তঃজেলা যানবাহনের চাপ কমাতে ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ করা হবে। ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল স্থানান্তর করা হলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকার ওপর আন্তঃজেলা বাসের চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে স্থায়ী বাস টার্মিনাল নির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। তাই স্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণের আগ পর্যন্ত ঝিলমিল প্রকল্পের ১৫ একর জমিতে একটি অস্থায়ী বাস টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী চার মাসের মধ্যে অস্থায়ী টার্মিনালটি নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে গাবতলী বাস টার্মিনালের পেছনের অংশ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বাস টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানো এবং যানবাহন ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কাজ দ্রুত বাস্তবায়নে সড়ক বিভাগ, ট্রাফিক পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে।
ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল স্থানান্তরের ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, যাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধা, বাসের রুট পুনর্বিন্যাস এবং পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় পরিকল্পিতভাবে করা গেলে টার্মিনাল স্থানান্তরের সুফল পাওয়া সহজ হবে।
কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট সরবে: রাজধানীর ব্যস্ত কারওয়ান বাজার এলাকার যানজট কমাতে কিচেন মার্কেটটি গাবতলীতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কারওয়ান বাজারে ব্যবসায়ী, ক্রেতা, পণ্যবাহী যানবাহন ও গণপরিবহনের চাপ একসঙ্গে তৈরি হওয়ায় সড়কে প্রায়ই যানজট দেখা যায়। কিচেন মার্কেটের কার্যক্রম গাবতলীতে স্থানান্তর করা গেলে এই এলাকার যানবাহনের চাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সচিবালয় এলাকার যানজট নিরসনেও পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিকল্প পার্কিংয়ের স্থানও অনুসন্ধান করা হবে।
সচিবালয়কেন্দ্রিক যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং আশপাশের সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে রাজধানীতে অটোরিকশা চলাচল আরও সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত করতে পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ ছাড়া অনুমোদনহীন ডাবল ডেকার ও স্লিপার বাসের চলাচলের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে অনুমোদন ও নির্ধারিত নিয়ম না মেনে যানবাহন চলাচল করলে তা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। এ কারণে এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে রাজধানীর যানজট কমাতে নেওয়া উদ্যোগগুলোর মধ্যে কিছু দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য, আবার কিছু দীর্ঘমেয়াদি। টোল ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার, যানজটপ্রবণ এলাকায় বিশেষ পরিকল্পনা, বাস টার্মিনাল স্থানান্তর, বাজার পুনর্বিন্যাস, পার্কিং সুবিধা বাড়ানো এবং অটোরিকশা চলাচলে শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগ একই সঙ্গে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে হলে শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়াই যথেষ্ট নয়; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। রাজধানীর যানজট একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা হওয়ায় একক কোনো উদ্যোগে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তাই অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই হবে সরকারের নতুন পরিকল্পনার বড় পরীক্ষা।















