তেলের দাম বেড়েছে, ভাড়া বাড়ালে যাত্রী হারানোর শঙ্কা রাইডারদের
***তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়লেও বাড়েনি রাইডারদের আয়
****যাত্রী কমার শঙ্কায় আগের ভাড়াতেই চলছে রাইড
***জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় দিন শেষে হাতে থাকছে কম টাকা
****দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল রাইডারদের সংসারে বাড়ছে চাপ
দিনভর মোটরসাইকেল চালিয়ে যে আয় হয়, তার একটি বড় অংশ এখন চলে যাচ্ছে জ্বালানি কিনতেই। পেট্রোল ও অকটেনের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায় ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল রাইডারদের দৈনিক হিসাব-নিকাশে নতুন করে টান পড়েছে। অথচ জ্বালানির বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে ভাড়া বাড়ানোর সুযোগও দেখছেন না তারা। কারণ, ভাড়া বাড়লেই যাত্রী কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফলে আয় একই থাকলেও ব্যয় বেড়েছে রাইডারদের। দিনের শেষে মোট আয় থেকে মোটরসাইকেলের ভাড়া, জ্বালানি ও খাবারের খরচ বাদ দিয়ে পরিবারের জন্য যে অর্থ থাকে, সেটিও আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে। দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল এসব রাইডারের কাছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি তাই সরাসরি সংসারের বাজেটে আঘাত করছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে দেশের বাজারে নতুন দামে জ্বালানি তেল বিক্রি শুরু হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ প্রধান তিন ধরনের জ্বালানি তেলের দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বেড়েছে।
রাইডারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই দৈনিক নির্দিষ্ট আয় ধরে সংসারের খরচের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়ায় সেই হিসাব আর মিলছে না। একই সময় কাজ করেও এখন আগের চেয়ে বেশি অর্থ জ্বালানির পেছনে ব্যয় হচ্ছে।
একজন ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল রাইডার বলেন, আগে প্রতিদিন মোটামুটি ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হতো। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের দৈনিক ভাড়া দিতে হয় প্রায় ৬০০ টাকা। জ্বালানিতে খরচ হয় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। খাবার ও চা-নাশতার পেছনেও কিছু অর্থ চলে যায়। সব খরচ বাদ দিয়ে যে টাকা হাতে থাকে, তা দিয়েই পরিবারের বাজার ও সন্তানদের পড়াশোনাসহ অন্যান্য ব্যয় চালাতে হয়।
তিনি বলেন, এখন জ্বালানির দাম বেড়েছে, কিন্তু যাত্রীপ্রতি ভাড়া বাড়েনি। বেশি ভাড়া চাইলে অনেক যাত্রী বিকল্প পরিবহন ব্যবহার করতে পারেন। তাই ভাড়া বাড়ানোর ঝুঁকি নিতে পারছেন না তারা।
আরেক রাইডার বলেন, ‘সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তায় থাকতে হয়। আগে যে পরিমাণ জ্বালানি খরচ হতো, এখন একই দূরত্বে তার জন্য বেশি টাকা দিতে হচ্ছে। আয় একই থাকায় স্বাভাবিকভাবেই হাতে কম টাকা থাকছে।’
তার ভাষ্য, রাইডারদের আয় নির্ভর করে যাত্রীর সংখ্যার ওপর। ভাড়া বাড়িয়ে যদি যাত্রী কমে যায়, তাহলে মোট আয় আরও কমে যেতে পারে। এ কারণে জ্বালানির দাম বাড়লেও ভাড়া সমন্বয় করা সহজ নয়।
আরেকজন রাইডার বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের খরচ বেড়েছে। কিন্তু যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা নেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। বেশি ভাড়া বললেই কেউ কেউ অন্য বাহনে চলে যান। ফলে বাড়তি খরচটা শেষ পর্যন্ত আমাদেরই বহন করতে হচ্ছে।’
আয়-ব্যয়ের ব্যবধান বাড়ছে: ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল রাইডারদের একটি বড় অংশ দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তাদের ক্ষেত্রে জ্বালানি খরচ সামান্য বাড়লেও মাস শেষে তার প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ভাড়া নিয়ে যারা এই পেশায় যুক্ত, তাদের ওপর চাপ তুলনামূলক বেশি।
রাইডারদের হিসাবে, দৈনিক আয়ের একটি অংশ মোটরসাইকেলের মালিককে ভাড়া হিসেবে দিতে হয়। এরপর জ্বালানি, খাবার ও অন্যান্য খরচ রয়েছে। এসব ব্যয় বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থই পরিবারের জন্য ব্যবহার করতে হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার অর্থ হচ্ছে পরিবারের জন্য বরাদ্দ অর্থ কমে যাওয়া।
তাদের কেউ কেউ বলছেন, প্রতিদিন কাজের সময় বাড়িয়েও বাড়তি খরচ পুষিয়ে নেওয়া কঠিন। কারণ দীর্ঘসময় রাস্তায় থাকলেও যাত্রীসংখ্যা সবসময় একই থাকে না।
যাত্রী হারানোর ভয়: রাইডারদের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে ভাড়া সমন্বয় করা। গণপরিবহন ও অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থা থাকায় যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিতে অনাগ্রহী হতে পারেন। ফলে রাইডাররা একদিকে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে যাত্রী হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন।
একজন রাইডার বলেন, ‘আমরা ভাড়া বাড়াতে চাই না। কারণ যাত্রী কমে গেলে আয় আরও কমবে। আবার তেলের দাম বাড়ায় আগের ভাড়ায় চালালেও লাভ থাকছে না। মাঝখানে পড়ে গেছি।’
ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদেরও বাড়তি ব্যয়: জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল রাইডারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নিয়মিত মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন এমন মানুষদেরও মাসিক যাতায়াত ব্যয় বাড়বে।
অফিস, ব্যবসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত কাজে প্রতিদিন মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে এখন আগের তুলনায় বেশি টাকা গুনতে হবে। এতে পরিবারের অন্যান্য খাতের ব্যয়েও চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবহারকারীরা।
একজন মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী বলেন, ‘প্রতিদিনের যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভর করতে হয়। তেলের দাম বাড়ায় মাসিক খরচ স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। এই বাড়তি টাকা অন্য কোনো খাত থেকে কমাতে হবে।’
নিত্যপণ্যের বাজারেও প্রভাবের শঙ্কা: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে এর প্রভাব পণ্য পরিবহন ও বিভিন্ন সেবার ওপর পড়তে পারে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভোক্তা অধিকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু যানবাহনের খরচে সীমাবদ্ধ থাকে না। পণ্য পরিবহন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের ব্যয়ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
বাস্তবসম্মত ভাড়া নির্ধারণের দাবি: রাইডারদের দাবি, জ্বালানির বর্তমান মূল্য বিবেচনায় নিয়ে যাত্রী ও চালক—দুই পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য ভাড়া কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। এতে একদিকে যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে না, অন্যদিকে রাইডারদেরও বাড়তি জ্বালানি খরচ বহন করে লোকসানে কাজ করতে হবে না।
রাইডাররা বলছেন, তারা বাড়তি আয় চান না; অন্তত জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর যেন আগের মতো অর্থ হাতে থাকে, সেটিই তাদের প্রত্যাশা। কারণ এই আয়ের ওপরই নির্ভর করছে তাদের পরিবারের বাজার, সন্তানের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য প্রয়োজন।




















