Dhaka ১১:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বগুড়ায় ৭ শ্রমিকের মৃত্যু

জেলা প্রতিনিধি
8 / 100 SEO Score

 

 

বগুড়ায় নিয়ন্ত্রণ হারানো শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের বাসের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয় ৭ শ্রমিকের। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) দুপুরে হাসপাতালের করিডোর জুড়ে ছিল কান্না, আর্তনাদ আর স্বজন হারানোর আহাজারি। একের পর এক মরদেহ দেখে স্বজনদের বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ।

স্বামী আবু সাঈদ মণ্ডলের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন স্ত্রী রিনা বেগম। কখনো মরদেহ জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন, কখনো বিলাপ করে বলছিলেন, ‘আমাকে একা রেখে কোথায় চলে গেলে?’ পাশে থাকা স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কোনো সান্ত্বনাই যেন তার বুকের শূন্যতা পূরণ করতে পারছিল না।

আবু সাঈদ ও আমিরুলের স্বজন সানাউল প্রধান বলেন, ২ জনই দিনমজুর ছিলেন। সাঈদের পরিবারের সদস্য ৬ জন। সংসারের সব দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। কাজের সন্ধানে বগুড়ায় এসেছিলেন, কিন্তু আর বাড়ি ফেরা হলো না।

তিনি আরও বলেন, নিহত আমিরুলও ছিলেন ভূমিহীন। এক শতক জমির ওপর ছোট্ট একটি ঘর তুলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির মৃত্যুতে পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

নিহত নূর মোহাম্মদের ভাতিজা আল আমিন বলেন, ফজরের নামাজ পড়ে চাচা কামলার হাটে গিয়েছিলেন কৃষি শ্রমিক নেওয়ার জন্য। কে জানত, সেটাই হবে তার জীবনের শেষ পথচলা।

কৃষি শ্রমিক শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন ভোর ৫টার পর থেকেই এরুলিয়ার কামলার হাটে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শ্রমিকরা জড়ো হন। কৃষিজমির মালিকরা প্রয়োজন অনুযায়ী সেখান থেকে শ্রমিক নিয়ে যান। নিহত ও আহতদের অনেকেই সেখানে জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়ায় একটি কক্ষে থাকতেন।

তিনি বলেন, প্রতিদিনের মতো আমারও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার একটু দেরি হয়ে যায়। পরে গিয়ে দেখি চারদিকে মানুষের ভিড়, রক্তাক্ত মানুষ আর আর্তনাদ। তখন আহতদের উদ্ধারে অন্যদের সঙ্গে আমিও এগিয়ে যাই।

আরেক শ্রমিক মোশাররফ হোসেন সরকার বলেন, গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন শ্রমিকরা এই হাটে আসেন। বর্তমানে কৃষি কাজে একজন শ্রমিক দৈনিক প্রায় ৭০০ টাকা মজুরি পান। সেই সামান্য আয়ের ওপরই নির্ভর করে অসংখ্য পরিবারের জীবন।

প্রসঙ্গত, শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের সদর উপজেলার এরুলিয়া সিলকিবান্ধা এলাকায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা নওগাঁগামী শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে কাজের অপেক্ষায় থাকা কৃষি শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়। এতে ঘটনাস্থলে ৩ জন নিহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন।

নিহতরা হলেন— তাজিমুল (৪৭), বেল্লাল হোসেন, আবু সাঈদ (৪৫), আনারুল (৫৫), আমিরুল (৪০), নূর আলম (৪৫) ও জমির মালিক নূর মোহাম্মদ (৭৬)।

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

11 − 10 =

About Author Information

বগুড়ায় ৭ শ্রমিকের মৃত্যু

Update Time : ০২:৩৪:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬
8 / 100 SEO Score

 

 

বগুড়ায় নিয়ন্ত্রণ হারানো শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের বাসের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয় ৭ শ্রমিকের। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) দুপুরে হাসপাতালের করিডোর জুড়ে ছিল কান্না, আর্তনাদ আর স্বজন হারানোর আহাজারি। একের পর এক মরদেহ দেখে স্বজনদের বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ।

স্বামী আবু সাঈদ মণ্ডলের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন স্ত্রী রিনা বেগম। কখনো মরদেহ জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন, কখনো বিলাপ করে বলছিলেন, ‘আমাকে একা রেখে কোথায় চলে গেলে?’ পাশে থাকা স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কোনো সান্ত্বনাই যেন তার বুকের শূন্যতা পূরণ করতে পারছিল না।

আবু সাঈদ ও আমিরুলের স্বজন সানাউল প্রধান বলেন, ২ জনই দিনমজুর ছিলেন। সাঈদের পরিবারের সদস্য ৬ জন। সংসারের সব দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। কাজের সন্ধানে বগুড়ায় এসেছিলেন, কিন্তু আর বাড়ি ফেরা হলো না।

তিনি আরও বলেন, নিহত আমিরুলও ছিলেন ভূমিহীন। এক শতক জমির ওপর ছোট্ট একটি ঘর তুলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির মৃত্যুতে পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

নিহত নূর মোহাম্মদের ভাতিজা আল আমিন বলেন, ফজরের নামাজ পড়ে চাচা কামলার হাটে গিয়েছিলেন কৃষি শ্রমিক নেওয়ার জন্য। কে জানত, সেটাই হবে তার জীবনের শেষ পথচলা।

কৃষি শ্রমিক শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন ভোর ৫টার পর থেকেই এরুলিয়ার কামলার হাটে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শ্রমিকরা জড়ো হন। কৃষিজমির মালিকরা প্রয়োজন অনুযায়ী সেখান থেকে শ্রমিক নিয়ে যান। নিহত ও আহতদের অনেকেই সেখানে জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়ায় একটি কক্ষে থাকতেন।

তিনি বলেন, প্রতিদিনের মতো আমারও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার একটু দেরি হয়ে যায়। পরে গিয়ে দেখি চারদিকে মানুষের ভিড়, রক্তাক্ত মানুষ আর আর্তনাদ। তখন আহতদের উদ্ধারে অন্যদের সঙ্গে আমিও এগিয়ে যাই।

আরেক শ্রমিক মোশাররফ হোসেন সরকার বলেন, গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন শ্রমিকরা এই হাটে আসেন। বর্তমানে কৃষি কাজে একজন শ্রমিক দৈনিক প্রায় ৭০০ টাকা মজুরি পান। সেই সামান্য আয়ের ওপরই নির্ভর করে অসংখ্য পরিবারের জীবন।

প্রসঙ্গত, শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের সদর উপজেলার এরুলিয়া সিলকিবান্ধা এলাকায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা নওগাঁগামী শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে কাজের অপেক্ষায় থাকা কৃষি শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়। এতে ঘটনাস্থলে ৩ জন নিহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন।

নিহতরা হলেন— তাজিমুল (৪৭), বেল্লাল হোসেন, আবু সাঈদ (৪৫), আনারুল (৫৫), আমিরুল (৪০), নূর আলম (৪৫) ও জমির মালিক নূর মোহাম্মদ (৭৬)।