বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে পদায়ন ও চলতি দায়িত্ব নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)–এর বিভিন্ন পদে পদায়ন ও চলতি দায়িত্ব প্রদান নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কারিগরি পদে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও গবেষণা-সংক্রান্ত শর্ত পূরণ না করেই কয়েকজন কর্মকর্তাকে সদস্য পরিচালক পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকের হাতে আসা বিএআরসির স্মারক নং ১২.০০.০০০০.০৬২.০১৯.০০২.২০.২২৮, তারিখ ৪ জুন ২০২৬–এর অফিস আদেশে দেখা যায়, ক্রমিক নম্বর ২–এ বিএআরসির পরিচালক (সাপোর্ট সার্ভিস) মোঃ আব্দুল মুত্তাকিনকে পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন বিভাগের সদস্য পরিচালক হিসেবে রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বিএআরসির আরেকটি প্রস্তাবনায় স্মারক নং ১২.২০.০০০০.০২০.১১.০০৮.১৭-৮৫৮, তারিখ ৮ মার্চ ২০২৬–এর মাধ্যমে অজিত কুমার চক্রবর্তীকে সদস্য পরিচালক (মৎস্য), গ্রেড-২, চলতি দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাডেমিক ও পেশাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আব্দুল মুত্তাকিন অ্যাকাউন্টিং বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং অজিত কুমার চক্রবর্তীর ক্ষেত্রেও মৎস্য বিষয়ে প্রয়োজনীয় একাডেমিক যোগ্যতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। তারা মনে করেন, কৃষি গবেষণার কারিগরি পদে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের একাডেমিক যোগ্যতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগে আরও বলা হয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কারিগরি কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে সাধারণত বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (SO), জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (SSO), প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (PSO), মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (CSO) অথবা সমমানের পদে নির্ধারিত মেয়াদের অভিজ্ঞতা এবং গবেষণা প্রকাশনার মতো যোগ্যতা বিবেচনা করা হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় কারিগরি পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতার পাশাপাশি যোগ্যতা ও অন্যান্য নির্ধারিত শর্ত পূরণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, এসব নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ না করে একজন কর্মকর্তা কীভাবে সদস্য পরিচালক পর্যায়ের দায়িত্বে যেতে পারেন। তাদের মতে, বিষয়টি পরিষ্কার করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরির পদক্রম, গবেষণা অভিজ্ঞতা, প্রকাশিত গবেষণাপত্র এবং পদোন্নতির নথি প্রকাশ্যে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিএআরসির পদোন্নতি সংক্রান্ত বিধানের অনুচ্ছেদ ১৩-এর (২) উপধারার উদ্ধৃতি দিয়ে অভিযোগকারীরা বলেন, “কেবলমাত্র জ্যেষ্ঠতার কারণে কোন ব্যক্তি অধিকার হিসেবে তাহার পদোন্নতি দাবি করিতে পারিবে না।” তাদের দাবি, কারিগরি পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিধিবদ্ধ যোগ্যতা ও গবেষণা-সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করা দরকার।
তারা আরও দাবি করেন, নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তাদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু পদ রয়েছে—যেমন পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন), পরিচালক (সেবা ও সরবরাহ), কম্পিউটার ও জিআইএস–সংশ্লিষ্ট পদ। এর বাইরে কোনো নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তাকে কারিগরি গবেষণা বিভাগের সদস্য পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকলে সেটিও বিধিসম্মত কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কৃষি সচিব তাদের জানিয়েছেন, অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের গবেষণা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আফসারী খনম–এর বক্তব্যও অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি নাকি বলেছেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং যোগ্য ব্যক্তি না থাকায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগকারীরা এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে দাবি করেছেন, বিএআরসিতে ৩৫ জনের বেশি মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। ফলে যোগ্য কর্মকর্তা না থাকার ব্যাখ্যাটি তারা গ্রহণযোগ্য মনে করছেন না।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, অজিত কুমার চক্রবর্তীর মৎস্য বিভাগের চলতি দায়িত্বের বিষয়টি উত্থাপন করা হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার প্রতিক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. আবদুস সালাম–এর ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তার সময়ে বিভিন্ন পদে প্রস্তাবনা ও দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন। অর্থের বিনিময়ে প্রস্তাবনা পাঠানোর যে অভিযোগ করা হয়েছে, তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে উপস্থাপন করা হয়নি; ফলে বিষয়টি স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কৃষিবিদ অভিযোগ করে বলেন, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে পেশাগত যোগ্যতা, গবেষণা দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিধিমালা অনুসরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার প্রত্যাশা থাকে। তাদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে তার একাডেমিক যোগ্যতা ও গবেষণা অভিজ্ঞতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হলে তা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা কার্যক্রম এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে পদোন্নতির ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)সহ জাতীয় কৃষি গবেষণা ব্যবস্থার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা যোগ্য বিজ্ঞানীদের পদোন্নতি ও দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি কর্মকর্তাদের দক্ষতা যথাযথভাবে কাজে লাগানো না হলে দেশের কৃষি গবেষণা ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
এদিকে বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যানের ভবিষ্যৎ পদায়ন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার পর তিনি কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের একটি পদে নিয়োগ পাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তবে এই দাবিরও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সার্বিকভাবে, বিএআরসিতে সদস্য পরিচালক পদে রুটিন ও চলতি দায়িত্ব প্রদান, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কারিগরি পদে পদোন্নতির বিধান এবং গবেষণা-অভিজ্ঞতার শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এ নিয়ে একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্তের দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীদের মতে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও পদোন্নতির নথি, শিক্ষাগত সনদ, চাকরির পদক্রম, গবেষণাপত্র, বিধিমালার সংশ্লিষ্ট ধারা এবং বিএআরসি কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবনা যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। তারা কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত তদন্ত করে অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।










