Dhaka ১০:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: পুরোনো পদ্ধতি, নতুন সিন্ডিকেট

নিজস্ব প্রতিবেদক
7 / 100 SEO Score

 

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। পুনরায় চালুর প্রক্রিয়ায় আবারও ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। আলোচনায় এসেছে পুরোনো পদ্ধতিতে নতুন সিন্ডিকেট বিতর্ক।

মালয়েশিয়া ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস) বাংলাদেশি ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশের পর গত শুক্রবার আরও ৩১২টি ‘অ্যাসোসিয়েট’ এজেন্সির অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে কয়েকটি অখ্যাত এজেন্সির নামও রয়েছে। লাইসেন্স পাওয়ার পর একজন কর্মীও পাঠায়নি, এমন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ২ হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৫টির নাম প্রকাশ করায় সংক্ষুব্ধ হয়েছে অন্য এজেন্সিগুলো।

সংক্ষুব্ধ এজেন্সিগুলোর প্রতিনিধিদের অভিযোগ, অখ্যাত এজেন্সির নামে নেপথ্যে শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে নতুন একটি প্রভাবশালী চক্র। ফলে আগের মতোই বিশাল অভিবাসন ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে বাজার বন্ধ হওয়ার পেছনে যেমন মালয়েশিয়ার নিজস্ব নীতিগত কারণ ছিল, তেমনি বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও অস্বচ্ছতা ও নিয়োগব্যবস্থার দুর্বলতা বড় ভূমিকা রেখেছে। তাই এবারের আলোচনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে দৃঢ় অবস্থান হওয়া উচিত, কোনো ধরনের একচেটিয়া নিয়োগব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়।

বারবার একই পদ্ধতি: মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে যতবার আলোচনা হয়েছে, ততবারই একটি শব্দ সামনে আসে, ‘সিন্ডিকেট’। অতীতে শ্রমবাজার খোলার পরপরই কিছু প্রভাবশালী রিক্রুটিং এজেন্সি বা গোষ্ঠী পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিল। এর ফলে কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুয়া চাকরির প্রতিশ্রুতি, চুক্তি লঙ্ঘন এবং নানা ধরনের শোষণের ঘটনা ঘটে। কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অনেক কর্মী বিদেশে যাওয়ার জন্য জমি বিক্রি করেছেন, উচ্চ সুদে ঋণ নিয়েছেন কিংবা পরিবারের শেষ সম্বলটুকুও বন্ধক রেখেছেন। ঋণ নিয়ে বিদেশে পৌঁছে প্রথম দুই-তিন বছর তাদের আয় মূলত ঋণ পরিশোধেই চলে যায়।

জানা যায়, ২০০৯ সালে প্রথম দফায় বন্ধ হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। এরপর ২০১৬ সালের শেষে বাজার আবার খোলে। সেবার ১০টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দেয় মালয়েশিয়া। সেগুলো সিন্ডিকেট নামে পরিচিতি পায়। ২০১৭ ও ২০১৮, এই দুই বছরে এই এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭৭৯ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় যান। জিটুজি প্লাস নামে এই পদ্ধতিতে কর্মীপ্রতি ৩৭ হাজার টাকা ব্যয় নির্ধারণ করেছিল দুই দেশ। কিন্তু নেওয়া হয়েছিল ৩ লাখ টাকা। প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে এই পদ্ধতি বন্ধ করে মালয়েশিয়া। বন্ধ হয় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশ চুক্তি করে। এতে আবার সুযোগ রাখা হয় বাংলাদেশের কোন কোন এজেন্সি কর্মী পাঠাবে। তখন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সব এজেন্সির জন্য কর্মী পাঠানোর সুযোগ উন্মুক্ত রাখার ওপর জোর দেয়নি, বরং তারা এজেন্সি নির্ধারণের দায়িত্ব দেয় মালয়েশিয়াকে। ব্যবসায়ীরা আপত্তি জানালেও তৎকালীন সরকার এ পদ্ধতিকেই সমর্থন করে।

মালয়েশিয়া কর্মী পাঠাতে ২৫ এজেন্সিকে বাছাই করে। এগুলোর অধিকাংশের মালিক ছিলেন তৎকালীন এমপি-মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা। সেবারও সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল সব এজেন্সিই ধাপে ধাপে কর্মী পাঠানোর কাজ পাবে। সে অনুযায়ী সরকারি এজেন্সি বোয়েসেলসহ পরে আরও ৭৬ এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দিয়েছিল মালয়েশিয়া। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৭৯০ জন কর্মী এই পদ্ধতিতে মালয়েশিয়া যান। কর্মীপ্রতি ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। মালয়েশিয়ায় শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা ইউনিয়নের জরিপ অনুযায়ী কর্মীপ্রতি নেওয়া হয়েছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। প্রায় ১৭ হাজার কর্মী এ কারণে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও মালয়েশিয়া যেতে পারেননি। মালয়েশিয়া যেতে টাকা দিয়ে রাখা লাখের বেশি কর্মী একই বছরের মে মাসের শেষ সপ্তাহে বিমানবন্দরে ভিড় করেছিলেন। তাদের আহাজারি তখন আলোচিত ঘটনা ছিল। শেষের দিকে ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুরের বিমান ভাড়া ৩০ হাজার টাকা বেড়ে ৩ লাখ টাকা হয়েছিল।

আগের তিন বারের অভিজ্ঞতার পরও আগের পদ্ধতিতেই ফিরে গেল বাংলাদেশ। আগের মন্ত্রীদের মতো বর্তমান প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও আশাবাদী। তার আশা, ধাপে ধাপে সব এজেন্সি কর্মী পাঠানোর কাজ পাবে। তবে বাদ পড়া এজেন্সি ও অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, আগের ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর আবারও কেন একই ধরনের সীমিত তালিকা। একইসঙ্গে তালিকাটি কোন মানদণ্ডে তৈরি করা হয়েছে এবং অন্য বৈধ এজেন্সিগুলোকে কেন সুযোগ দেওয়া হয়নি, এমন প্রশ্নও করছেন অনেকে। এটি সিন্ডিকেটমুক্ত ব্যবস্থা নয়, পুরোনো ব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোয় উপস্থাপনের কৌশল মাত্র।

জনশক্তি ব্যবসায়ীরা বলেছেন, মালয়েশিয়ায় থাকা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রকদের শর্তে রাজি না হলে শ্রমবাজার খোলা কঠিন। মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগে সরকার অনুমোদিত প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী আমিনুল ইসলাম বিন আবদুর নূর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ার নাগরিক। তিনিসহ প্রতিষ্ঠানটির আট কর্মকর্তা ২০২২ সালের আগস্টে গ্রেফতার হয়েছিলেন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে। বাংলাদেশে তার হয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মালিক রুহুল আমিন স্বপন। সিআইডির তদন্তে তার সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক পাওয়া গেছে। গত মাসে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ক্যাথারসিসের লাইসেন্স বাতিল করেছে।

৩১২টি এজেন্সিকে সহযোগী হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগকে অতীতেরই পুনরাবৃত্তি বলছেন ব্যবসায়ীরা। বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, অতীতেও সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা ৭০০-৮০০ এজেন্সি কর্মী পাঠিয়েছে। তবে নিজ নামে নয়, সিন্ডিকেটে থাকা এজেন্সির লাইসেন্স ব্যবহার করে ছাড়পত্র নিতে হতো। এতে কর্মীদের ব্যয় বাড়ত। এমন অবস্থায় ২৫টি এজেন্সিই মূল নিয়ন্ত্রণে থাকবে, বাকিরা তাদের অধীনস্থ হয়ে সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করবে, যা অতীতেও ছিল। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিও পুরোনো পদ্ধতিতে ২৫ এজেন্সির কর্মী পাঠানোর খবরে প্রতিবাদ এবং উদ্বেগ জানিয়েছে। দল দুটি পৃথক বিবৃতিতে বলেছে, পুরো প্রক্রিয়াটি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ হতে হবে, যাতে আগের মতো দুর্নীতি না হয়। কোন প্রক্রিয়ায় এজেন্সি বাছাই করা হয়েছে, তা জানাতে হবে। তাদের অভিযোগ বর্তমান সরকারের একটি অংশ এই সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।

মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে ২৫ এজেন্সি নিয়ে বায়রার উদ্বেগ
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠাতে মাত্র ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশের খবরে গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বায়রার সদস্যরা। তাদের আশঙ্কা, সীমিতসংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমবাজার পরিচালিত হলে অতীতের মতো আবারও সিন্ডিকেট ও একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। গত ২৩ আগস্ট গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলেন বায়রার সদস্যরা। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অতীতে সীমিতসংখ্যক এজেন্সিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সুযোগ দেওয়ায় সিন্ডিকেশন, অনিয়ম, বৈষম্য, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছিল। এতে সাধারণ কর্মীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের অনেক বৈধ ও অভিজ্ঞ রিক্রুটিং এজেন্সি ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

15 + ten =

About Author Information

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: পুরোনো পদ্ধতি, নতুন সিন্ডিকেট

Update Time : ০৩:০৪:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
7 / 100 SEO Score

 

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। পুনরায় চালুর প্রক্রিয়ায় আবারও ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। আলোচনায় এসেছে পুরোনো পদ্ধতিতে নতুন সিন্ডিকেট বিতর্ক।

মালয়েশিয়া ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস) বাংলাদেশি ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশের পর গত শুক্রবার আরও ৩১২টি ‘অ্যাসোসিয়েট’ এজেন্সির অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে কয়েকটি অখ্যাত এজেন্সির নামও রয়েছে। লাইসেন্স পাওয়ার পর একজন কর্মীও পাঠায়নি, এমন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ২ হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৫টির নাম প্রকাশ করায় সংক্ষুব্ধ হয়েছে অন্য এজেন্সিগুলো।

সংক্ষুব্ধ এজেন্সিগুলোর প্রতিনিধিদের অভিযোগ, অখ্যাত এজেন্সির নামে নেপথ্যে শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে নতুন একটি প্রভাবশালী চক্র। ফলে আগের মতোই বিশাল অভিবাসন ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে বাজার বন্ধ হওয়ার পেছনে যেমন মালয়েশিয়ার নিজস্ব নীতিগত কারণ ছিল, তেমনি বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও অস্বচ্ছতা ও নিয়োগব্যবস্থার দুর্বলতা বড় ভূমিকা রেখেছে। তাই এবারের আলোচনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে দৃঢ় অবস্থান হওয়া উচিত, কোনো ধরনের একচেটিয়া নিয়োগব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়।

বারবার একই পদ্ধতি: মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে যতবার আলোচনা হয়েছে, ততবারই একটি শব্দ সামনে আসে, ‘সিন্ডিকেট’। অতীতে শ্রমবাজার খোলার পরপরই কিছু প্রভাবশালী রিক্রুটিং এজেন্সি বা গোষ্ঠী পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিল। এর ফলে কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুয়া চাকরির প্রতিশ্রুতি, চুক্তি লঙ্ঘন এবং নানা ধরনের শোষণের ঘটনা ঘটে। কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অনেক কর্মী বিদেশে যাওয়ার জন্য জমি বিক্রি করেছেন, উচ্চ সুদে ঋণ নিয়েছেন কিংবা পরিবারের শেষ সম্বলটুকুও বন্ধক রেখেছেন। ঋণ নিয়ে বিদেশে পৌঁছে প্রথম দুই-তিন বছর তাদের আয় মূলত ঋণ পরিশোধেই চলে যায়।

জানা যায়, ২০০৯ সালে প্রথম দফায় বন্ধ হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। এরপর ২০১৬ সালের শেষে বাজার আবার খোলে। সেবার ১০টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দেয় মালয়েশিয়া। সেগুলো সিন্ডিকেট নামে পরিচিতি পায়। ২০১৭ ও ২০১৮, এই দুই বছরে এই এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭৭৯ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় যান। জিটুজি প্লাস নামে এই পদ্ধতিতে কর্মীপ্রতি ৩৭ হাজার টাকা ব্যয় নির্ধারণ করেছিল দুই দেশ। কিন্তু নেওয়া হয়েছিল ৩ লাখ টাকা। প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে এই পদ্ধতি বন্ধ করে মালয়েশিয়া। বন্ধ হয় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশ চুক্তি করে। এতে আবার সুযোগ রাখা হয় বাংলাদেশের কোন কোন এজেন্সি কর্মী পাঠাবে। তখন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সব এজেন্সির জন্য কর্মী পাঠানোর সুযোগ উন্মুক্ত রাখার ওপর জোর দেয়নি, বরং তারা এজেন্সি নির্ধারণের দায়িত্ব দেয় মালয়েশিয়াকে। ব্যবসায়ীরা আপত্তি জানালেও তৎকালীন সরকার এ পদ্ধতিকেই সমর্থন করে।

মালয়েশিয়া কর্মী পাঠাতে ২৫ এজেন্সিকে বাছাই করে। এগুলোর অধিকাংশের মালিক ছিলেন তৎকালীন এমপি-মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা। সেবারও সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল সব এজেন্সিই ধাপে ধাপে কর্মী পাঠানোর কাজ পাবে। সে অনুযায়ী সরকারি এজেন্সি বোয়েসেলসহ পরে আরও ৭৬ এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দিয়েছিল মালয়েশিয়া। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৭৯০ জন কর্মী এই পদ্ধতিতে মালয়েশিয়া যান। কর্মীপ্রতি ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। মালয়েশিয়ায় শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা ইউনিয়নের জরিপ অনুযায়ী কর্মীপ্রতি নেওয়া হয়েছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। প্রায় ১৭ হাজার কর্মী এ কারণে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও মালয়েশিয়া যেতে পারেননি। মালয়েশিয়া যেতে টাকা দিয়ে রাখা লাখের বেশি কর্মী একই বছরের মে মাসের শেষ সপ্তাহে বিমানবন্দরে ভিড় করেছিলেন। তাদের আহাজারি তখন আলোচিত ঘটনা ছিল। শেষের দিকে ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুরের বিমান ভাড়া ৩০ হাজার টাকা বেড়ে ৩ লাখ টাকা হয়েছিল।

আগের তিন বারের অভিজ্ঞতার পরও আগের পদ্ধতিতেই ফিরে গেল বাংলাদেশ। আগের মন্ত্রীদের মতো বর্তমান প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও আশাবাদী। তার আশা, ধাপে ধাপে সব এজেন্সি কর্মী পাঠানোর কাজ পাবে। তবে বাদ পড়া এজেন্সি ও অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, আগের ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর আবারও কেন একই ধরনের সীমিত তালিকা। একইসঙ্গে তালিকাটি কোন মানদণ্ডে তৈরি করা হয়েছে এবং অন্য বৈধ এজেন্সিগুলোকে কেন সুযোগ দেওয়া হয়নি, এমন প্রশ্নও করছেন অনেকে। এটি সিন্ডিকেটমুক্ত ব্যবস্থা নয়, পুরোনো ব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোয় উপস্থাপনের কৌশল মাত্র।

জনশক্তি ব্যবসায়ীরা বলেছেন, মালয়েশিয়ায় থাকা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রকদের শর্তে রাজি না হলে শ্রমবাজার খোলা কঠিন। মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগে সরকার অনুমোদিত প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী আমিনুল ইসলাম বিন আবদুর নূর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ার নাগরিক। তিনিসহ প্রতিষ্ঠানটির আট কর্মকর্তা ২০২২ সালের আগস্টে গ্রেফতার হয়েছিলেন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে। বাংলাদেশে তার হয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মালিক রুহুল আমিন স্বপন। সিআইডির তদন্তে তার সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক পাওয়া গেছে। গত মাসে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ক্যাথারসিসের লাইসেন্স বাতিল করেছে।

৩১২টি এজেন্সিকে সহযোগী হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগকে অতীতেরই পুনরাবৃত্তি বলছেন ব্যবসায়ীরা। বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, অতীতেও সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা ৭০০-৮০০ এজেন্সি কর্মী পাঠিয়েছে। তবে নিজ নামে নয়, সিন্ডিকেটে থাকা এজেন্সির লাইসেন্স ব্যবহার করে ছাড়পত্র নিতে হতো। এতে কর্মীদের ব্যয় বাড়ত। এমন অবস্থায় ২৫টি এজেন্সিই মূল নিয়ন্ত্রণে থাকবে, বাকিরা তাদের অধীনস্থ হয়ে সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করবে, যা অতীতেও ছিল। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিও পুরোনো পদ্ধতিতে ২৫ এজেন্সির কর্মী পাঠানোর খবরে প্রতিবাদ এবং উদ্বেগ জানিয়েছে। দল দুটি পৃথক বিবৃতিতে বলেছে, পুরো প্রক্রিয়াটি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ হতে হবে, যাতে আগের মতো দুর্নীতি না হয়। কোন প্রক্রিয়ায় এজেন্সি বাছাই করা হয়েছে, তা জানাতে হবে। তাদের অভিযোগ বর্তমান সরকারের একটি অংশ এই সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।

মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে ২৫ এজেন্সি নিয়ে বায়রার উদ্বেগ
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠাতে মাত্র ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশের খবরে গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বায়রার সদস্যরা। তাদের আশঙ্কা, সীমিতসংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমবাজার পরিচালিত হলে অতীতের মতো আবারও সিন্ডিকেট ও একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। গত ২৩ আগস্ট গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলেন বায়রার সদস্যরা। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অতীতে সীমিতসংখ্যক এজেন্সিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সুযোগ দেওয়ায় সিন্ডিকেশন, অনিয়ম, বৈষম্য, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছিল। এতে সাধারণ কর্মীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের অনেক বৈধ ও অভিজ্ঞ রিক্রুটিং এজেন্সি ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।