মূল্যস্ফীতির চাপ: আয় বাড়ার চেয়ে ব্যয় বাড়ছে বেশি
দেশে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ থেকে এখনো পুরোপুরি মুক্তি মিলছে না। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে ০ দশমিক ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। ফলে মূল্যস্ফীতির গতি কমার পরও মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতায় স্বস্তি ফেরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বিশেষ করে নিম্নআয়ের ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর ব্যয়ের চাপ এখনো বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) হালনাগাদ প্রতিবেদনে জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির এ চিত্র উঠে এসেছে। এর আগে জুনে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে তা কমেছে ০ দশমিক ৮৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। মূল্যস্ফীতির এমন কমে আসা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত হলেও মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব কতটা পড়ছে, তা নির্ভর করছে আয় বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্যের ওপর।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কমে আসা। ফলে বাজারে পণ্য ও সেবার দাম যে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, সেখান থেকেই নতুন করে দাম বাড়ছে। এ কারণে মূল্যস্ফীতি কমলেও সাধারণ মানুষের মাসিক ব্যয় আগের তুলনায় কমে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং মজুরি বৃদ্ধির হার যদি মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম থাকে, তাহলে প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ থেকেই যায়।
জুলাইয়ের পরিসংখ্যানে ঠিক এমন চিত্রই দেখা যাচ্ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ, অন্যদিকে মজুরি বৃদ্ধি ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। ব্যবধান মাত্র ০ দশমিক ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট হলেও এর অর্থ হলো, গড়ে মানুষের আয় যতটা বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ তার চেয়ে সামান্য বেশি বেড়েছে। নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য, বাসস্থান, যাতায়াত, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হয়। ফলে বাড়তি আয়ের বড় অংশ নতুন ব্যয় সামাল দিতেই শেষ হয়ে যায়।
গ্রামে মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি: মূল্যস্ফীতির প্রভাব শুধু জাতীয় পর্যায়েই নয়, অঞ্চলভেদেও ভিন্ন। জুলাইয়ে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার বেশি ছিল। এ মাসে গ্রামে সাধারণ মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশে। শহরে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ শহরের তুলনায় গ্রামে মূল্যস্ফীতি ০ দশমিক ১২ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে এ ব্যবধানের তাৎপর্য রয়েছে। গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষের আয় কৃষি, দিনমজুরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অনিয়মিত শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। এসব আয়ের ক্ষেত্রে নিয়মিত মজুরি সমন্বয় বা আয় বৃদ্ধির সুযোগ তুলনামূলক সীমিত। ফলে বাজারে পণ্য ও সেবার দাম বাড়লে আয় একই গতিতে না বাড়ায় তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমে যেতে পারে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে বড় পতন: জুলাইয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমার পেছনে খাদ্য মূল্যস্ফীতির নিম্নমুখী প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, এ মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুনে যা ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে ১ দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে আসা সাধারণ মানুষের জন্য তুলনামূলক স্বস্তির বিষয়। কারণ নিম্নআয়ের পরিবারের মোট ব্যয়ের বড় অংশ খাদ্যপণ্যে চলে যায়। খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার গতি কমলে পরিবারের মাসিক বাজেটে কিছুটা চাপ কমার সুযোগ তৈরি হয়। তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমলেও আগের দামের তুলনায় পণ্যগুলো সস্তা হয়ে যায়নি। ফলে দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্তর এখনো মানুষের ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি জুলাইয়ে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুনে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও কমেছে, তবে তা এখনো ৯ শতাংশের ঘরে রয়েছে। বাসস্থান, পোশাক, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার ব্যয় সাধারণ পরিবারের বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ খাতে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মানুষের ওপর চাপ বজায় থাকে।
গ্রাম-শহর উভয় জায়গাতেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে: গ্রামাঞ্চলে জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুনে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কমে ৯ দশমিক ৫৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা জুনে ছিল ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
শহরাঞ্চলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। জুলাইয়ে শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২১ শতাংশ। জুনে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি জুলাইয়ে কমে ৮ দশমিক ৯০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা জুনে ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ।
দাম বাড়ার গতি কমেছে, দাম কমেনি: পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট হিসাবে জুলাইয়ের ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ সাধারণ মূল্যস্ফীতির অর্থ হলো, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে কোনো পণ্য কিনতে ১০০ টাকা ব্যয় হলে একই পণ্য ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কিনতে গড়ে ১০৮ টাকা ৩২ পয়সা ব্যয় করতে হয়েছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমেছে মানেই বাজারে পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে এমনটি নয়।
এখানেই নিম্নআয়ের মানুষের সংকটটি সবচেয়ে স্পষ্ট। আয় বাড়লেও যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয় একই হারে বা তার চেয়ে বেশি বাড়ে, তাহলে বাড়তি আয়ের প্রকৃত সুফল পাওয়া কঠিন। অনেক পরিবার তখন সঞ্চয় কমিয়ে দৈনন্দিন ব্যয় চালায়, আবার কেউ কেউ প্রয়োজনীয় খরচের তালিকা ছোট করতে বাধ্য হয়। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চললে পরিবারের আর্থিক সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
বিবিএস বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও সেবার মূল্য সংগ্রহ করে প্রাপ্ত উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণ, বিশ্লেষণ ও যাচাইয়ের মাধ্যমে ভোক্তা মূল্যসূচক প্রস্তুত করে। সাধারণ, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত এই তিন শ্রেণিতে মূল্যসূচকের তথ্য প্রকাশ করা হয়।
সব মিলিয়ে জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিলেও সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি এখনো সীমিত। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে, সাধারণ মূল্যস্ফীতিও ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির হার এখনো মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। ফলে প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতায় টেকসই উন্নতি নিশ্চিত করতে মূল্যস্ফীতিকে আরও নিচে নামানোর পাশাপাশি মজুরি বৃদ্ধির গতিও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের আয় যদি জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় দ্রুত বাড়ে, তবেই মূল্যস্ফীতি কমার সুফল বাস্তবে তাদের জীবনে দৃশ্যমান হবে।















