সরকারের ১৮০ দিন: কৃষির উন্নয়নে সরকারের বহুমুখী উদ্যোগ
*** কৃষক কার্ডে সাড়ে ১২ লাখ কৃষকের তথ্য
*** খাল খননে লক্ষ্যমাত্রার ৯৯ শতাংশ অর্জন
*** কৃষিঋণ মওকুফ ও প্রণোদনায় স্বস্তি কৃষকের
*** উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে আধুনিক কৃষিতে জোর
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে কৃষিখাতের উন্নয়ন ও কৃষকদের সহায়তায় বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষককে সরাসরি সরকারি সহায়তার আওতায় আনা, কৃষির অবকাঠামো উন্নয়ন, উৎপাদন বাড়ানো, সেচব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি নিশ্চিত করার বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃষক কার্ড চালু, খাল খনন ও পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ, কৃষিঋণ মওকুফসহ বিভিন্ন কর্মসূচি এরই মধ্যে বাস্তবায়ন বা বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ১৮০ দিনে কৃষিখাতে সবচেয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতির একটি হলো খাল খনন ও পুনঃখনন। পাশাপাশি কৃষকদের তথ্যভান্ডার তৈরির কাজ, উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনে নতুন প্রকল্প, শস্যবিমার খসড়া প্রণয়ন এবং কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃষক কার্ডে সাড়ে ১২ লাখ কৃষকের তথ্য: কৃষকদের সরাসরি সরকারি সহায়তার আওতায় আনতে কৃষক কার্ডকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকের জমি, উৎপাদন, ফসলের ধরনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডারে সংরক্ষণ করা হবে। ভবিষ্যতে কৃষি উপকরণ, যন্ত্রপাতি, সেচ সুবিধা ও বিভিন্ন সরকারি সহায়তা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এ তথ্যভান্ডার ব্যবহার করা হবে।
ইতিমধ্যে প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার কৃষকের তথ্যভান্ডার তৈরি হয়েছে। প্রাক্-পাইলট পর্যায়ে ২০ হাজার ৮৩২ জন কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রায় আড়াই কোটি কৃষককে এ ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষক কার্ড চালু হলে কৃষকদের সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকৃত কৃষক চিহ্নিত করা এবং কৃষি সহায়তা আরও লক্ষ্যভিত্তিকভাবে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
খাল খননে লক্ষ্যমাত্রার ৯৯ শতাংশ অর্জন: কৃষির সেচব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জলাবদ্ধতা কমাতে খাল খনন ও পুনঃখননের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথম ১৮০ দিনে ৪৭৮ দশমিক ৯ কিলোমিটার খাল খনন বা পুনঃখননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এর বিপরীতে ৪৭৫ দশমিক ৬১ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের কাজ শেষ হয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
আগামী পাঁচ বছরে জাতীয় পর্যায়ে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কৃষিখাতে ৬ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়িয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রেও এসব খাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে কৃষির পাশাপাশি পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ছয় মাসে ২৫ লাখ গাছের চারা রোপণ: কৃষির পাশাপাশি পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথম ছয় মাসে ২৫ লাখ গাছের চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে পাঁচ বছরে মোট ৩ কোটি চারা রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষিজমি, রাস্তার পাশ, খালপাড়সহ বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি কৃষির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
কৃষকের ঝুঁকি কমাতে শস্যবিমার উদ্যোগ: প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগবালাই কিংবা অন্যান্য কারণে ফসল নষ্ট হলে কৃষককে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এ ঝুঁকি কমাতে শস্যবিমা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এর একটি খসড়া প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়েছে।
শস্যবিমা চালু হলে ফসলের ক্ষতির পর কৃষক আর্থিক সুরক্ষা পেতে পারেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার থেকে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং কৃষিপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার কাজও এগিয়ে চলছে।
সার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন: কৃষকের কাছে নির্ধারিত দামে সার পৌঁছে দেওয়া এবং সার বিতরণে শৃঙ্খলা ফেরাতে সার ডিলার নিয়োগ ও সংরক্ষণসংক্রান্ত নীতিমালায় সংশোধন আনা হয়েছে।
কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে সারের সরবরাহ ও সঠিক ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ডিলার পর্যায় থেকে কৃষক পর্যায় পর্যন্ত সার বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলে উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন: প্রচলিত ধান ও অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি কৃষির বৈচিত্র্য বাড়াতে উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে উচ্চমূল্যের সবজি, ফল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে পৃথক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
উচ্চমূল্যের ফসলের উৎপাদন বাড়াতে পারলে একই জমি থেকে কৃষকের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ হলে বাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
কৃষিঋণ মওকুফে স্বস্তি ক্ষুদ্র কৃষকের: ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক চাপ কমাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত পাঁচ মাসে সাত লাখের বেশি কৃষকের ৬০০ কোটি টাকার বেশি কৃষিঋণ মওকুফ করেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।
এ ছাড়া চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বাড়াতে বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণে প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পেঁয়াজ, মরিচ, আমন ও গ্রীষ্মকালীন সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বাড়াতে এসব কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ারফ্লো মেশিন এবং সৌরবিদ্যুৎচালিত মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের উদ্যোগও এগিয়েছে। উৎপাদনের পর সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকের ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমবে এবং বাজারে সরবরাহের সময়ও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাড়ছে প্রস্তুতি: কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিপণ্য রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করতে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একই জায়গায় কৃষিপণ্য ওয়াশিং, প্যাকিং ও কোয়ারেন্টাইন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করে কৃষিপণ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে ঢাকায় ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট বা ভিএইচটি প্ল্যান্ট চালু করা হয়েছে। কোনো ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কৃষিপণ্য শোধনের সুবিধা থাকায় রপ্তানির ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির লক্ষ্য: সরকারের কৃষি পরিকল্পনায় শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, কৃষিকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও বাণিজ্যিক করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, বাণিজ্যিক কৃষি এবং ক্রপিং জোন তৈরির মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৃষকের কাছে সরকারি সহায়তা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি কৃষকের আয় ও জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রথম ১৮০ দিনে নেওয়া উদ্যোগগুলোর মধ্যে কিছু ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, আবার কিছু রয়েছে প্রাথমিক বা বাস্তবায়ন পর্যায়ে। এখন এসব কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং প্রকৃত কৃষকের কাছে এর সুফল পৌঁছে দেওয়াই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষক কার্ড, সেচব্যবস্থা, কৃষিঋণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উন্নয়নই শেষ পর্যন্ত কৃষিখাতের টেকসই অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি করতে পারে।















