Dhaka ০৭:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
২০৩০ লক্ষ্য নিয়ে রেলের রোডম্যাপ দাউদকান্দিতে চালবোঝাই ট্রাক উল্টে নিহত ৭ শেষ হলো বৈশাখী শোভাযাত্রা, ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ প্ল্যাকার্ডে ভিন্ন বার্তা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হরমুজ পার করলো চীনা জাহাজ শুরু বৈশাখী শোভাযাত্রা, চারুকলা থেকে বর্ণিল আয়োজনে মানুষের ঢল ইরানি নারী ফুটবল দলের অধিনায়কের বাজেয়াপ্ত সম্পদ ফেরত দিচ্ছে সরকার আজও সাতসকালে ‘অস্বাস্থ্যকর’ ঢাকার বাতাস রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ: ‘জাগো আলোক-লগ্নে’ গানে নববর্ষের সূচনা টাঙ্গাইলে আজ ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী বৈশাখী শোভাযাত্রা ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কড়া নিরাপত্তা

জাফলংয়ে সবেদের রঙ বদলের রাজনীতি

10 / 100 SEO Score

রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই—এই বহুল প্রচলিত প্রবাদ যেন নতুন করে প্রমাণ করলেন জাফলংয়ের আলোচিত পাথর ব্যবসায়ী ও কথিত ‘পাথরখেকো’ হিসেবে পরিচিত সবেদ ড্রাইভার। স্থানীয়দের ভাষায়, তিনি কোনো নির্দিষ্ট দলের নন; তিনি করেন ‘ক্ষমতার রাজনীতি’। আর ক্ষমতার পালাবদল হলেই বদলে যায় তার রাজনৈতিক পরিচয়, কিন্তু বদলায় না হাতে থাকা ফুলের তোড়া আর মুখের তোষামোদী হাসি।

২০১৯ সালের একটি বহুল আলোচিত দৃশ্য এখনো ঘুরে বেড়ায় জাফলংবাসীর স্মৃতিতে। তৎকালীন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ-কে শুভেচ্ছা জানাতে হাতে বিশাল লাল গোলাপের তোড়া নিয়ে হাজির হয়েছিলেন সবেদ ড্রাইভার। সে সময় তিনি নিজেকে পরিচয় দিতেন ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর ‘নিবেদিতপ্রাণ কর্মী’ হিসেবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাথর উত্তোলন, কোয়ারি নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির মতো নানা অভিযোগে নাম এলেও রাজনৈতিক ছায়াতলে থাকায় তিনি ছিলেন প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় নিজের আধিপত্য ধরে রাখাই ছিল তার মূল লক্ষ্য—এমন অভিযোগও শোনা যায়।

সাত বছর পর, ২০২৬ সালে দৃশ্যপট প্রায় একই—কেবল মঞ্চের কুশীলব বদলেছে। এবার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নবনিযুক্ত প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী-কে শুভেচ্ছা জানাতে আবারও সেই পরিচিত ভঙ্গিতে হাজির সবেদ ড্রাইভার। পার্থক্য শুধু একটাই—এবার তিনি নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন ‘কট্টর বিএনপি সমর্থক’ হিসেবে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ‘নৌকা’ থেকে ‘ধানের শীষ’—এই রূপান্তর ঘটেছে চোখের পলকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে তার দুই সময়ের ছবি, যা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।
পাথর কোয়ারি নিয়ন্ত্রণই কি মূল লক্ষ্য?
জাফলংয়ের অর্থনীতির বড় একটি অংশ নির্ভর করে পাথর কোয়ারি ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসার ওপর। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার আশীর্বাদ ছাড়া এই ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সবেদ ড্রাইভারের দলবদলের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো কোয়ারি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা।
একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“জাফলংয়ে রাজনীতি মানে শুধু আদর্শ না, ব্যবসাও। ক্ষমতা যার, কোয়ারি তার—এই ধারণাই অনেকের মধ্যে কাজ করে।”
সবেদের এই ধারাবাহিক রূপ বদল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ যেমন আছে, তেমনি আছে তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রূপও। জাফলংয়ের এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন,
“রঙ বদলায়, দল বদলায়, মন্ত্রী বদলায়—কিন্তু সবেদ ড্রাইভারের ফুলের তোড়া আর তেলবাজি বদলায় না। হাওয়া যেদিকে, সবেদ সেদিকে!”
স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের সুবিধাবাদী রাজনীতি আদর্শভিত্তিক রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দলের দুর্দিনে অনুপস্থিত থেকে কেবল সুসময়ে মন্ত্রীদের পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের কারণে তৃণমূলের কর্মীরা হতাশ হন।
প্রশাসনের ভূমিকা কী?
এখন প্রশ্ন উঠেছে—নতুন প্রশাসন কি এ ধরনের ‘হাইব্রিড’ ও ‘সুবিধাবাদী’ রাজনীতিকদের চিহ্নিত করতে পারবে? নাকি পুরনো পদ্ধতিই নতুন মোড়কে চলবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলবদল নতুন কিছু নয়। তবে যখন ব্যক্তিস্বার্থ ও অবৈধ ব্যবসা রক্ষার অভিযোগ এতে যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক কৌশল থাকে না; তা হয়ে ওঠে প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।
জাফলংবাসী এখন তাকিয়ে আছে—ক্ষমতার পালাবদলে ফুলের তোড়া বদলালেও, বাস্তবতার পরিবর্তন আদৌ হবে কি না। নাকি একই থাকবেন ‘চালক’, বদলাবে শুধু গাড়ির স্টিয়ারিং।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জাফলংয়ে সবেদের রঙ বদলের রাজনীতি

Update Time : ০৬:১৬:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
10 / 100 SEO Score

রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই—এই বহুল প্রচলিত প্রবাদ যেন নতুন করে প্রমাণ করলেন জাফলংয়ের আলোচিত পাথর ব্যবসায়ী ও কথিত ‘পাথরখেকো’ হিসেবে পরিচিত সবেদ ড্রাইভার। স্থানীয়দের ভাষায়, তিনি কোনো নির্দিষ্ট দলের নন; তিনি করেন ‘ক্ষমতার রাজনীতি’। আর ক্ষমতার পালাবদল হলেই বদলে যায় তার রাজনৈতিক পরিচয়, কিন্তু বদলায় না হাতে থাকা ফুলের তোড়া আর মুখের তোষামোদী হাসি।

২০১৯ সালের একটি বহুল আলোচিত দৃশ্য এখনো ঘুরে বেড়ায় জাফলংবাসীর স্মৃতিতে। তৎকালীন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ-কে শুভেচ্ছা জানাতে হাতে বিশাল লাল গোলাপের তোড়া নিয়ে হাজির হয়েছিলেন সবেদ ড্রাইভার। সে সময় তিনি নিজেকে পরিচয় দিতেন ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর ‘নিবেদিতপ্রাণ কর্মী’ হিসেবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাথর উত্তোলন, কোয়ারি নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির মতো নানা অভিযোগে নাম এলেও রাজনৈতিক ছায়াতলে থাকায় তিনি ছিলেন প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় নিজের আধিপত্য ধরে রাখাই ছিল তার মূল লক্ষ্য—এমন অভিযোগও শোনা যায়।

সাত বছর পর, ২০২৬ সালে দৃশ্যপট প্রায় একই—কেবল মঞ্চের কুশীলব বদলেছে। এবার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নবনিযুক্ত প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী-কে শুভেচ্ছা জানাতে আবারও সেই পরিচিত ভঙ্গিতে হাজির সবেদ ড্রাইভার। পার্থক্য শুধু একটাই—এবার তিনি নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন ‘কট্টর বিএনপি সমর্থক’ হিসেবে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ‘নৌকা’ থেকে ‘ধানের শীষ’—এই রূপান্তর ঘটেছে চোখের পলকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে তার দুই সময়ের ছবি, যা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।
পাথর কোয়ারি নিয়ন্ত্রণই কি মূল লক্ষ্য?
জাফলংয়ের অর্থনীতির বড় একটি অংশ নির্ভর করে পাথর কোয়ারি ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসার ওপর। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার আশীর্বাদ ছাড়া এই ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সবেদ ড্রাইভারের দলবদলের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো কোয়ারি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা।
একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“জাফলংয়ে রাজনীতি মানে শুধু আদর্শ না, ব্যবসাও। ক্ষমতা যার, কোয়ারি তার—এই ধারণাই অনেকের মধ্যে কাজ করে।”
সবেদের এই ধারাবাহিক রূপ বদল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ যেমন আছে, তেমনি আছে তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রূপও। জাফলংয়ের এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন,
“রঙ বদলায়, দল বদলায়, মন্ত্রী বদলায়—কিন্তু সবেদ ড্রাইভারের ফুলের তোড়া আর তেলবাজি বদলায় না। হাওয়া যেদিকে, সবেদ সেদিকে!”
স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের সুবিধাবাদী রাজনীতি আদর্শভিত্তিক রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দলের দুর্দিনে অনুপস্থিত থেকে কেবল সুসময়ে মন্ত্রীদের পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের কারণে তৃণমূলের কর্মীরা হতাশ হন।
প্রশাসনের ভূমিকা কী?
এখন প্রশ্ন উঠেছে—নতুন প্রশাসন কি এ ধরনের ‘হাইব্রিড’ ও ‘সুবিধাবাদী’ রাজনীতিকদের চিহ্নিত করতে পারবে? নাকি পুরনো পদ্ধতিই নতুন মোড়কে চলবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলবদল নতুন কিছু নয়। তবে যখন ব্যক্তিস্বার্থ ও অবৈধ ব্যবসা রক্ষার অভিযোগ এতে যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক কৌশল থাকে না; তা হয়ে ওঠে প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।
জাফলংবাসী এখন তাকিয়ে আছে—ক্ষমতার পালাবদলে ফুলের তোড়া বদলালেও, বাস্তবতার পরিবর্তন আদৌ হবে কি না। নাকি একই থাকবেন ‘চালক’, বদলাবে শুধু গাড়ির স্টিয়ারিং।