Dhaka ০৫:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬, ২৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভুয়া নথিতে চাকরির অভিযোগ বিমানের ৮ পাইলটের বিরুদ্ধে তদন্ত

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:১৯:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬
  • ১ Time View
12 / 100 SEO Score

জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কর্মরত ৮ পাইলটের বিরুদ্ধে ভুয়া উড্ডয়ন ঘণ্টা, জাল লগবুক এবং তথ্য গোপনের মাধ্যমে চাকরি নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ চিফ অব ফ্লাইট সেফটি পদে দায়িত্ব পেয়েছেন ক্যাপ্টেন আহমেদ ইমরান, যার বিরুদ্ধেও আগে থেকে অসদাচরণ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এ দুটি বিষয়কে ঘিরে সংস্থাটির অভ্যন্তরে উদ্বেগ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিক গোপন অনুসন্ধানে ৮ পাইলটের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন, ভুয়া নথি ব্যবহার, জাল লগবুক ও উড্ডয়ন ঘণ্টা বাড়িয়ে দেখিয়ে বাণিজ্যিক ও পরিবহন পাইলট লাইসেন্স অর্জনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্তে বিমান কর্তৃপক্ষ চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

 

অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কয়েকজন পাইলটের ক্ষেত্রে নির্ধারিত উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা ছাড়াই লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যাপ্টেন আব্দুর রহমান আকন্দের বাণিজ্যিক পাইলট লাইসেন্সের জন্য প্রয়োজন ছিল ২৫০ ঘণ্টা উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা। অথচ তার লগবুকে পাওয়া গেছে মাত্র ১৫৪.৩৫ ঘণ্টা। প্রায় ৯৫ ঘণ্টা ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রায় চার মাস ফ্লাইট পরিচালনা করেন।

 

ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদের লাইসেন্সে একই উড্ডয়ন ঘণ্টা পাইলট ইন কমান্ড ও কো-পাইলট হিসেবে দুবার লিপিবদ্ধ করার অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রায় ৩৫০ ঘণ্টার অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে।

 

ক্যাপ্টেন আনিসের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ২০০ ঘণ্টার পরিবর্তে মাত্র ১৬২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তাকে লাইসেন্স দেওয়া হয়।

 

ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাবের নথিতে পাইলট ইন কমান্ড উড্ডয়ন সময় ছিল মাত্র ৩৩ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট, যা পরে জাল সনদের মাধ্যমে ১৫৫ ঘণ্টা দেখানো হয়।

এ ছাড়া ক্যাপ্টেন নুরুদ্দিন আহমেদ, ইউসুফ মাহমুদ ও মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

 

প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু পাইলটদের ক্ষেত্রেই নয়, লাইসেন্স যাচাই ও তদারকি ব্যবস্থাতেও গুরুতর অনিয়ম রয়েছে। কিছু ফ্লাইট পরিদর্শকের বৈধ লাইসেন্স, শারীরিক সক্ষমতা ও সাম্প্রতিক উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তারা পাইলট যাচাইয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। এতে পুরো লাইসেন্সিং ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা ছাড়া পাইলট দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করলে জরুরি পরিস্থিতিতে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।

 

এদিকে সংস্থার চিফ অব ফ্লাইট সেফটি পদে নিয়োগ পাওয়া ক্যাপ্টেন আহমেদ ইমরানের বিরুদ্ধেও অতীতে অসদাচরণ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

অভিযোগ অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে নারী কেবিন ক্রু ও ফার্স্ট অফিসারদের প্রতি আপত্তিকর আচরণ, ককপিটে অশোভন ভাষা ব্যবহার এবং অনৈতিক মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল একটি লিখিত অভিযোগে এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়। ওই অভিযোগে বলা হয়, তার আচরণের কারণে ককপিটের পরিবেশ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে এবং কয়েকজন নারী ক্রু তার সঙ্গে ফ্লাইট পরিচালনায় অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।

 

এ ছাড়া নিষিদ্ধ এপ্রন এলাকায় ধূমপান, স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) লঙ্ঘন এবং ফ্লাইটের আগে ব্রেথালাইজার অ্যালকোহল পরীক্ষায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোর মতো ঘটনার অভিযোগেও তাকে সতর্কতামূলক চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।

 

বেসামরিক বিমান চলাচল বিধি অনুযায়ী, ফ্লাইট সেফটি প্রধান পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত সেফটি প্রশিক্ষণ, সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার গ্রহণযোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের দাবি, ক্যাপ্টেন ইমরান পূর্ণাঙ্গ কোনো বিশেষায়িত সেফটি কোর্স সম্পন্ন করেননি; কেবল কয়েকটি সেমিনারে অংশ নিয়েছেন।

 

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, জাল সনদ দিয়ে যারা পাইলট হিসেবে চাকরি করছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও দায় এড়াতে পারে না।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ বলেন, অভিযোগ ওঠা লাইসেন্সগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

 

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ক্যাপ্টেন আহমেদ ইমরানের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

 

 

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ভুয়া নথিতে চাকরির অভিযোগ বিমানের ৮ পাইলটের বিরুদ্ধে তদন্ত

Update Time : ০৫:১৯:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬
12 / 100 SEO Score

জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কর্মরত ৮ পাইলটের বিরুদ্ধে ভুয়া উড্ডয়ন ঘণ্টা, জাল লগবুক এবং তথ্য গোপনের মাধ্যমে চাকরি নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ চিফ অব ফ্লাইট সেফটি পদে দায়িত্ব পেয়েছেন ক্যাপ্টেন আহমেদ ইমরান, যার বিরুদ্ধেও আগে থেকে অসদাচরণ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এ দুটি বিষয়কে ঘিরে সংস্থাটির অভ্যন্তরে উদ্বেগ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিক গোপন অনুসন্ধানে ৮ পাইলটের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন, ভুয়া নথি ব্যবহার, জাল লগবুক ও উড্ডয়ন ঘণ্টা বাড়িয়ে দেখিয়ে বাণিজ্যিক ও পরিবহন পাইলট লাইসেন্স অর্জনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্তে বিমান কর্তৃপক্ষ চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

 

অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কয়েকজন পাইলটের ক্ষেত্রে নির্ধারিত উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা ছাড়াই লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যাপ্টেন আব্দুর রহমান আকন্দের বাণিজ্যিক পাইলট লাইসেন্সের জন্য প্রয়োজন ছিল ২৫০ ঘণ্টা উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা। অথচ তার লগবুকে পাওয়া গেছে মাত্র ১৫৪.৩৫ ঘণ্টা। প্রায় ৯৫ ঘণ্টা ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রায় চার মাস ফ্লাইট পরিচালনা করেন।

 

ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদের লাইসেন্সে একই উড্ডয়ন ঘণ্টা পাইলট ইন কমান্ড ও কো-পাইলট হিসেবে দুবার লিপিবদ্ধ করার অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রায় ৩৫০ ঘণ্টার অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে।

 

ক্যাপ্টেন আনিসের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ২০০ ঘণ্টার পরিবর্তে মাত্র ১৬২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তাকে লাইসেন্স দেওয়া হয়।

 

ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাবের নথিতে পাইলট ইন কমান্ড উড্ডয়ন সময় ছিল মাত্র ৩৩ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট, যা পরে জাল সনদের মাধ্যমে ১৫৫ ঘণ্টা দেখানো হয়।

এ ছাড়া ক্যাপ্টেন নুরুদ্দিন আহমেদ, ইউসুফ মাহমুদ ও মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

 

প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু পাইলটদের ক্ষেত্রেই নয়, লাইসেন্স যাচাই ও তদারকি ব্যবস্থাতেও গুরুতর অনিয়ম রয়েছে। কিছু ফ্লাইট পরিদর্শকের বৈধ লাইসেন্স, শারীরিক সক্ষমতা ও সাম্প্রতিক উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তারা পাইলট যাচাইয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। এতে পুরো লাইসেন্সিং ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা ছাড়া পাইলট দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করলে জরুরি পরিস্থিতিতে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।

 

এদিকে সংস্থার চিফ অব ফ্লাইট সেফটি পদে নিয়োগ পাওয়া ক্যাপ্টেন আহমেদ ইমরানের বিরুদ্ধেও অতীতে অসদাচরণ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

অভিযোগ অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে নারী কেবিন ক্রু ও ফার্স্ট অফিসারদের প্রতি আপত্তিকর আচরণ, ককপিটে অশোভন ভাষা ব্যবহার এবং অনৈতিক মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল একটি লিখিত অভিযোগে এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়। ওই অভিযোগে বলা হয়, তার আচরণের কারণে ককপিটের পরিবেশ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে এবং কয়েকজন নারী ক্রু তার সঙ্গে ফ্লাইট পরিচালনায় অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।

 

এ ছাড়া নিষিদ্ধ এপ্রন এলাকায় ধূমপান, স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) লঙ্ঘন এবং ফ্লাইটের আগে ব্রেথালাইজার অ্যালকোহল পরীক্ষায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোর মতো ঘটনার অভিযোগেও তাকে সতর্কতামূলক চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।

 

বেসামরিক বিমান চলাচল বিধি অনুযায়ী, ফ্লাইট সেফটি প্রধান পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত সেফটি প্রশিক্ষণ, সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার গ্রহণযোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের দাবি, ক্যাপ্টেন ইমরান পূর্ণাঙ্গ কোনো বিশেষায়িত সেফটি কোর্স সম্পন্ন করেননি; কেবল কয়েকটি সেমিনারে অংশ নিয়েছেন।

 

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, জাল সনদ দিয়ে যারা পাইলট হিসেবে চাকরি করছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও দায় এড়াতে পারে না।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ বলেন, অভিযোগ ওঠা লাইসেন্সগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

 

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ক্যাপ্টেন আহমেদ ইমরানের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।