এক মণেও মিলছে না শ্রমিক
“এক মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের মজুরি জোটে না”— এমন বাস্তবতায় চরম বিপাকে পড়েছেন হাকালুকি হাওরের কৃষকরা।শ্রমিক সংকট, বাড়তি মজুরি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সময়মতো ধান কাটতে না পেরে পানির নিচেই নষ্ট হচ্ছে সোনালি ফসল, বাড়ছে কৃষকের হতাশা ও ক্ষতির বোঝা।
কৃষকদের অভিযোগ, হাওর থেকে এক বিঘা ধান কেটে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা খরচ হয়। তার মধ্যে খোলা বাজারে বর্তমানে বোরো ধান প্রতি মণ ৯০০–১০০০ টাকা বিক্রি হলেও ধান সংগ্রহে একেকজন শ্রমিকের মজুরি পড়েছে হাজার টাকার উপরে। ফলে, এক মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের মজুরি দিতে পারছেন না তারা।
বেশ কয়েক দিনের কালবৈশাখীর ঝড়, বজ্রপাত, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নিমজ্জিত এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকি হাওরে বানের জলে বোরো ধান সংগ্রহে প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা। পানির নিচ থেকে তুলে আনা ধান ডেরায় রেখে পচন ধরতে শুরু করেছে। অনেক কৃষক ধানের আশা ছেড়ে দিয়েছেন।
হাওর তীরের ভূকশিমইল, জয়চণ্ডী, কাদিপুর, বরমচাল, ভাটেরা ও ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রামে প্রায় তিন হাজার কৃষকের বোরো ধানের জমি অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন।
সরেজমিনে হাকালুকি হাওরের দক্ষিণ তীরের কুলাউড়া উপজেলা অংশের ভূকশিমইল, জয়চণ্ডী, কাদিপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে গেলে কৃষকদের প্রতিকূল আবহাওয়া মোকাবিলা করে ধান কাটতে দেখা যায়।
নৌকা ও কলাগাছের ভেলা দিয়ে অনেক কৃষক ধান কাটছেন এবং বহন করে স্তুপ করে রাখছেন পাশ্ববর্তী সড়কে। অনেক কৃষকের ধান স্তুপ করে রাখার পর খড়ে পচন ধরে নতুন অঙ্কুরোদ্গম হচ্ছে। মাড়াই দিতে রোদের আশায় অপেক্ষায় রয়েছেন কৃষকরা।
শুধু মীরশংকর ও কাদিপুর নয়, হাওর তীরের সাদিপুর, কোরবানপুর, মহেশগৌরী, মদনগৌরী, মীরশংকর, জাবদা, মুক্তাজিপুর, বড়দল, কাড়েরা, গৌড়করণ, বাদে ভূকশিমইল, মিঠুপুর, দুর্গাপুর, ঘাটের বাজার, ভৈরব বাজার, গৌরিশংকর, কাদিপুর, গুপ্তগ্রাম, ছকাপন, ভাগমতপুর, মৈন্তাম, আলীনগর, পূর্ব সিঙ্গুর, রাউৎগাঁও, সিংহনাথ, হোসেনপুর, বেড়কুড়ি, নওয়াগাঁও, বড়গাঁও, শাহমির, খামাউরা, হরিপুর, শ্রীপুর, জালালাবাদ, দাউদপুর, শেরপুরসহ সবকটি গ্রাম ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে একই হতাশার চিত্র।
কুলাউড়া উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, এবার উপজেলায় ৮ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ৪ হাজার ৮০৫ হেক্টর। অতিবৃষ্টি ও ঢলে ৩৮০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় তিন হাজার কৃষক প্রাথমিকভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
হাওর তীরের ভূকশিমইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান, হাওর তীরসহ তার ইউনিয়নে পাহাড়ি ঢলে অর্ধেকের বেশি বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে।
উপজেলা কৃষি অফিসার মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, এখন পর্যন্ত হাকালুকি হাওর এলাকায় প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ বোরো ধান কাটতে সক্ষম হয়েছেন। আর গ্রামাঞ্চলে ৬৫ ভাগ ধান কাটতে সক্ষম হয়েছেন কৃষকরা।
বৈরী আবহাওয়া, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক কৃষকের আধাপাকা ধান এখনো পানির নিচে নিমজ্জিত রয়েছে। এগুলো দ্রুত সংগ্রহ করতে কৃষি বিভাগসহ প্রশাসন তদারকিতে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারিভাবে কুলাউড়ায় রোববার থেকে সরকারি মূল্যে বোরো সংগ্রহ শুরু হয়েছে। এবারের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮৩৫ টন। প্রতি কৃষক সর্বোচ্চ তিন টন ধান ১৪৪০ টাকা মূল্যে বিক্রি করতে পারবেন।



















