বৃষ্টির বাধা উপেক্ষা করে বাড়ি ফিরছে মানুষ
*****রেলযাত্রায় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা জোরদার
****বাস টার্মিনালে তুলনামূলক স্বস্তি ও টিকিট সহজলভ্যতা
****মহাসড়কে যানজট কম, নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রা
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর এই সময় ঘরমুখো মানুষের চাপ, যানজট আর ভোগান্তির চিত্রই বেশি দেখা যায়। তবে এবারের ঈদযাত্রা অনেকটাই ব্যতিক্রম। বৃষ্টির অল্পস্বল্প প্রভাব থাকলেও সেটাকে উপেক্ষা করেই মানুষ স্বস্তি ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরছে। সড়ক, রেল ও নৌপথ—সবখানেই এবার তুলনামূলকভাবে কম ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে।
সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীর প্রধান রেলওয়ে কেন্দ্র কমলাপুর স্টেশনে ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়তে শুরু করে। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে হাজারো মানুষ স্টেশনে ভিড় করেন। তবে অতীতের মতো বিশৃঙ্খলা, ধাক্কাধাক্কি বা তীব্র হুড়োহুড়ির দৃশ্য এবার তুলনামূলকভাবে কম ছিল। যাত্রীদের মধ্যে ছিল অপেক্ষা, শৃঙ্খলা এবং নিরাপদ যাত্রার স্বস্তি। স্টেশনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে হাজারো যাত্রীকে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে। এদিন অন্তত চারটি ট্রেন বিলম্বে চলাচল করায় ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। সকাল থেকে স্টেশনের পার্কিং এলাকা থেকেই যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। নিরাপত্তার অংশ হিসেবে প্রথমে বাঁশের তৈরি চেকিং পয়েন্ট পার হতে হয় যাত্রীদের। এরপর প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের আগে টিকিট পরীক্ষা করেন টিটিরা। প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দেখা যায়, অনেক যাত্রী শিডিউল বোর্ডের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছেন। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলগামী ট্রেনের যাত্রীদের উপস্থিতি ছিল বেশি। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকে প্ল্যাটফর্মে বসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করেন।
রেলযাত্রায় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা জোরদার: রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এবারের ঈদযাত্রাকে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। স্টেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। যাত্রীদের টিকিট যাচাই, প্ল্যাটফর্ম ব্যবস্থাপনা এবং ট্রেনে ওঠানামা সবকিছুই নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো ট্রেনের ছাদে ওঠা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা। অতীতে ঈদের সময় ট্রেনের ছাদে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার দৃশ্য দেখা গেলেও এবার কঠোর নজরদারির কারণে তা হয়নি। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক কমেছে এবং যাত্রীরা তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশে ভ্রমণ করতে পারছেন।
একজন যাত্রী জানান, আগের বছরের তুলনায় এবার স্টেশনের পরিবেশ অনেক বেশি গোছানো। নিরাপত্তা ব্যবস্থা চোখে পড়ার মতো। ফলে পরিবার নিয়ে যাত্রা করলেও কোনো ধরনের ভয় বা অস্বস্তি নেই। তবে ট্রেন বিলম্ব করার কারনে একটু ভোগান্তি হচ্ছে।
অতিরিক্ত ট্রেন ও ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি: রেল কর্তৃপক্ষ এবারের ঈদে যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় অতিরিক্ত ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেয়। এতে যাত্রীদের চাপ অনেকটাই কমেছে। নিয়মিত ট্রেনের পাশাপাশি বিশেষ ট্রেন সার্ভিস যুক্ত হওয়ায় মানুষ সহজে টিকিট পেয়ে গন্তব্যে যেতে পারছেন। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদের সময় যাত্রীদের চাপ সামাল দিতে সব ধরনের প্রস্তুতি আগে থেকেই নেওয়া হয়েছিল। ফলে বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়নি।
বাস টার্মিনালে তুলনামূলক স্বস্তি: শুধু রেলপথ নয়, রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতেও এবার ঈদযাত্রার চিত্র কিছুটা স্বস্তিদায়ক। গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালে যাত্রীদের চাপ থাকলেও আগের বছরের মতো চরম ভোগান্তি দেখা যায়নি। অনেক যাত্রী জানিয়েছেন, এবার অনেক আগেই তারা টিকিট সংগ্রহ করতে পেরেছেন। অনলাইনে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা এবং পরিবহন কোম্পানিগুলোর আগাম প্রস্তুতির কারণে শেষ মুহূর্তে ভোগান্তি কমেছে। গাবতলী বাস টার্মিনালে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন দূরপাল্লার বাস সময়মতো ছাড়ছে এবং টার্মিনালে দীর্ঘ যানজট বা বিশৃঙ্খলা তুলনামূলকভাবে কম। যদিও কিছু রুটে যাত্রী চাপ বেশি ছিল, তবে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পরিবহন কর্তৃপক্ষ বাড়তি বাস চালু করেছে। একজন যাত্রী বলেন, “আগের বছরগুলোতে টার্মিনালে দাঁড়ানোই কঠিন ছিল। এবার পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক। পরিবার নিয়ে সহজে বাসে উঠতে পেরেছি।
মহাসড়কে যানজট কম, স্বস্তির যাত্রা: ঈদযাত্রার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে মহাসড়কে। সাধারণত এই সময় ঢাকা–চট্টগ্রাম, ঢাকা–উত্তরবঙ্গ এবং ঢাকা–সিলেট রুটে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। তবে এবার পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। অতিরিক্ত টোল বুথ, ট্রাফিক মনিটরিং এবং মোবাইল টিমের কারণে যানজট অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। চালকরা জানান, আগের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে না। ফলে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।
নৌপথেও যাত্রার চাপ, তবে নিয়ন্ত্রণে: ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও ঘরমুখো মানুষের ভিড় দেখা গেছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাওয়ার জন্য লঞ্চে যাত্রীদের চাপ ছিল বেশি। তবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) জানিয়েছে, সব লঞ্চে নিরাপত্তা ও যাত্রী ধারণক্ষমতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
লঞ্চগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বন্ধ রাখা হয়েছে এবং নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। ফলে যাত্রীরা কিছুটা ভিড়ের মধ্যে থাকলেও নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন।
বৃষ্টির প্রভাব উপেক্ষা করেই যাত্রা: আবহাওয়া কিছুটা প্রতিকূল থাকলেও ঘরমুখো মানুষ থেমে নেই। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হলেও যাত্রীরা ছাতা ও রেইনকোট ব্যবহার করে গন্তব্যের পথে রওনা হচ্ছেন। ফলে পুরো ঈদযাত্রার চিত্রে কোনো বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়নি। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদের সময় কিছু এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও তা দীর্ঘস্থায়ী নয়। ফলে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা কম। যাত্রীদের অনুভূতি ও ঈদের আনন্দ: বিভিন্ন স্টেশন ও টার্মিনালে কথা বলে জানা যায়, এবারের যাত্রা মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। অনেকেই বলছেন, আগের বছরের তুলনায় এবার ঈদযাত্রা অনেক বেশি পরিকল্পিত ও নিরাপদ। একজন যাত্রী বলেন, “ভিড় আছে, কিন্তু বিশৃঙ্খলা নেই। পরিবার নিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারছি এটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তি। সব মিলিয়ে এবারের কোরবানির ঈদযাত্রা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও স্বস্তিদায়ক। রেল, সড়ক ও নৌপথ সবখানেই কিছুটা চাপ থাকলেও বড় কোনো ভোগান্তি তৈরি হয়নি। পরিবহন খাতে উন্নত ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত ট্রেন ও বাস, নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকার কারণে এবারের ঈদযাত্রা মানুষের কাছে তুলনামূলকভাবে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে।




















