কেন বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে ঢাকা
****অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জনসংখ্যার চাপে বিপর্যস্ত ঢাকা
****যানজট, বায়ুদূষণ ও জলাবদ্ধতায় দুর্বিষহ নাগরিক জীবন
****দুর্বল অবকাঠামো ও সেবার সংকটে হারাচ্ছে বাসযোগ্যতা
****পরিকল্পিত উদ্যোগেই ফিরতে পারে ঢাকার প্রাণ
একসময় স্বপ্নের শহর হিসেবে পরিচিত ছিল ঢাকা। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও উন্নত জীবনের আশায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ ছুটে আসে এই মহানগরে। কিন্তু মানুষের চাপ, অপরিকল্পিত নগর বিস্তার এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় সেই ঢাকা এখন পরিণত হয়েছে নানা সংকটের শহরে। যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, শব্দদূষণ, সবুজের সংকট, গণপরিবহনের দুরবস্থা এবং নাগরিক সেবার সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে রাজধানীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
এরই প্রতিফলন দেখা গেল বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের সর্বশেষ সূচকে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) প্রকাশিত তালিকায় ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরের তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী। উদ্বেগের বিষয় হলো, গত বছরের তুলনায় এবারও ঢাকার অবস্থানের কোনো উন্নতি হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের বিষয় নয়; বরং ঢাকার প্রতিদিনের নাগরিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একটি শহর কতটা বাসযোগ্য, তা নির্ভর করে মানুষের নিরাপদ চলাচল, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবেশ, অবকাঠামো ও সার্বিক জীবনমানের ওপর। এসব ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন ধরে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ঢাকা।
জনসংখ্যার চাপ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ: ঢাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ। সীমিত জায়গার মধ্যে বিপুল মানুষের বসবাসের কারণে শহরের অবকাঠামোর ওপর বাড়ছে চাপ। প্রতিদিন নতুন নতুন ভবন নির্মাণ হলেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না রাস্তা, পার্ক, খেলার মাঠ, হাসপাতাল কিংবা নাগরিক সুবিধা।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি এবং অপরিকল্পিতভাবে শহরের সম্প্রসারণ ঢাকার অনেক সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম বৃদ্ধি, খাল ও জলাশয় দখল এবং পর্যাপ্ত খোলা জায়গা না থাকা নগরের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
যানজট: প্রতিদিনের ভোগান্তি: ঢাকার অন্যতম বড় পরিচিতি এখন যানজট। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের দিনের বড় একটি অংশ কেটে যায় সড়কে আটকে থেকে। এতে শুধু সময় নষ্ট হচ্ছে না, বাড়ছে মানসিক চাপ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন সড়ক নির্মাণ করে যানজট কমানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে গণপরিবহন ব্যবহার করতে পারে।
বায়ুদূষণ ও পরিবেশগত সংকট: ঢাকার আরেক বড় সমস্যা বায়ুদূষণ। নির্মাণকাজের ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার দূষণ এবং সবুজের অভাব শহরের বাতাসের মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব আরও বাড়বে। একই সঙ্গে শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে পার্ক, খেলার মাঠ ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ জরুরি।
জলাবদ্ধতা ও নাগরিক সেবা: বর্ষা এলেই ঢাকার অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যাওয়া, যান চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং মানুষের দুর্ভোগ এখন পরিচিত চিত্র। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল দখল এবং পানি নিষ্কাশনের সমস্যাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে রাজধানীতে বসবাস করেও অনেক মানুষ মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বিশ্বের অন্যান্য শহরের চিত্র: ইআইইউর তালিকায় এবার বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের স্বীকৃতি পেয়েছে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন। টানা দ্বিতীয়বারের মতো শীর্ষস্থান ধরে রাখা শহরটির স্কোর ৯৮। তালিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে ভিয়েনা ও মেলবোর্ন।
অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক রয়েছে তালিকার সর্বশেষ স্থানে। ৩১ দশমিক ৬ স্কোর নিয়ে ১৭৩তম অবস্থানে রয়েছে শহরটি। ঢাকার স্কোর ৪১ দশমিক ৭। ঢাকার ঠিক ওপরে রয়েছে লিবিয়ার ত্রিপোলি এবং নিচে রয়েছে পাকিস্তানের করাচি।
কীভাবে ফিরবে বাসযোগ্যতা: বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হলে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজ করতে হবে। গণপরিবহন উন্নয়ন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, জলাধার সংরক্ষণ, পরিকল্পিত আবাসন, নাগরিক সেবার মান বৃদ্ধি এবং রাজধানীর ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানো জরুরি।
এ ছাড়া ঢাকার বাইরে কর্মসংস্থান ও সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে জনসংখ্যার চাপ বিকেন্দ্রীকরণ করা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সুশাসন এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল ঢাকাকে আবারও বাসযোগ্য শহরে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এই শহরের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া গেলে সংকটের শহর নয়, ঢাকা আবারও হয়ে উঠতে পারে মানুষের নিরাপদ ও স্বস্তির ঠিকানা।



















