রাজধানীর মিরপুরে ‘ডাক্তার বাড়ি’ নামে পরিচালিত একটি বেসরকারি সেবাকেন্দ্রকে ঘিরে লাইসেন্সের বৈধতা, ল্যাব পরিচালনার অনুমোদন, পরীক্ষার রিপোর্টের নির্ভরযোগ্যতা এবং চিকিৎসাসেবার পরিধি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ অনুমোদন ও মাননিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে রোগী দেখা, নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রিপোর্ট সরবরাহের মতো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, মিরপুরের ৬০ ফিট সড়কের বারেক মোল্লার মোড় এলাকায় অবস্থিত ‘ডাক্তার বাড়ি’ দীর্ঘদিন ধরে ক্লিনিক বা সেবাকেন্দ্র ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রোগী দেখা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রিপোর্ট সরবরাহ—সবই একটি পূর্ণাঙ্গ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আদলে পরিচালিত হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স, ল্যাব পরিচালনার অনুমোদন এবং নিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্য সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসী ও কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ, কেন্দ্রটি শুধু নিজস্ব রোগীদের নয়, আশপাশের এলাকা এমনকি বাইরের রোগীদের কাছ থেকেও নমুনা সংগ্রহ করে থাকে। তবে সেই নমুনা কোথায় পরীক্ষা করা হয়, কার তত্ত্বাবধানে হয়, কীভাবে সংরক্ষণ ও পরিবহন করা হয় এবং মাননিয়ন্ত্রণ কীভাবে নিশ্চিত করা হয়—এসব বিষয়ে সন্তোষজনক তথ্য পাওয়া যায়নি।
কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনের দাবি, ‘ডাক্তার বাড়ি’ থেকে দেওয়া কিছু পরীক্ষার রিপোর্টে অসঙ্গতি পাওয়ার পর তারা অন্য প্রতিষ্ঠানে পুনরায় পরীক্ষা করাতে বাধ্য হয়েছেন। এক রোগীর স্বজন জানান, প্রথম রিপোর্ট দেখে চিকিৎসক সন্দেহ প্রকাশ করলে তারা অন্য একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করান এবং সেখানে ভিন্ন ফলাফল পাওয়া যায়। আরেকজন বলেন, প্রথম রিপোর্টের ভিত্তিতে চিকিৎসা শুরু হলেও পরবর্তী পরীক্ষায় রিপোর্টে ত্রুটি থাকার বিষয়টি সামনে আসে।
অভিযোগগুলো সত্য হলে তা রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং ওষুধ প্রয়োগে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের অনুমোদন, সেবার ধরন এবং কার্যক্রমের পরিধি সম্পর্কে রোগীদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ করে না। এটি অনুমোদিত ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার নাকি কেবল নমুনা সংগ্রহ ও রেফারেল-ভিত্তিক সেবাকেন্দ্র—সে বিষয়েও স্পষ্টতা নেই। অথচ রোগীদের কাছে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে বৈধ লাইসেন্স, অনুমোদিত ল্যাব সুবিধা, প্রশিক্ষিত জনবল, মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বায়োসেফটি মানদণ্ড নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। কোনো প্রতিষ্ঠান সীমিত অনুমোদন নিয়ে বাস্তবে বৃহত্তর পরিসরে চিকিৎসা বা ডায়াগনস্টিক কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা আইনগত প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ‘ডাক্তার বাড়ি’ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। লাইসেন্স, ল্যাব অনুমোদন, রিপোর্টের উৎস এবং চিকিৎসাসেবার পরিধি সম্পর্কেও কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।
স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াগনস্টিক রিপোর্টের নির্ভুলতা সরাসরি রোগীর জীবন, চিকিৎসা এবং আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভুল রিপোর্টের কারণে ভুল চিকিৎসা, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ কিংবা গুরুতর রোগের ভুল নির্ণয়ের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তাই ‘ডাক্তার বাড়ি’কে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
তাদের ভাষ্য, অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত। তবে জনস্বার্থে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স, ল্যাব সুবিধা, রিপোর্টিং পদ্ধতি, জনবল এবং নমুনা সংগ্রহ প্রক্রিয়া দ্রুত যাচাই করা সময়ের দাবি।