অবৈধ তেল মজুতে কঠোর সরকার
***মজুতদারির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড
****জ্বালানি তেল মজুতদারির তথ্য দিলে মিলবে পুরস্কার
***বাসাবাড়িতে জ্বালানি তেল মজুতে বড় ঝুঁকি
দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে অবৈধ মজুতের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এতে যেমন বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তেমনি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজার ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলার আশঙ্কাও বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, নজরদারি জোরদার এবং তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা—সব মিলিয়ে অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে মুদি দোকানি শাহজালাল বাড়িতে অবৈধভাবে ৩৭০ লিটার পেট্রোল মজুত করেছিলেন। বেশি দামে বিক্রির আশায় রাখা এই তেল প্রশাসন জব্দ করে। একইভাবে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় মামুন নামে এক যুবকের বাসা থেকে ৩২০ লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়। গত ১ এপ্রিল পরিচালিত অভিযানে তাকে ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, সাধারণ আবাসিক এলাকাতেও কীভাবে বিপজ্জনকভাবে দাহ্য পদার্থ মজুত করা হচ্ছে।
শুধু এই দুই ঘটনাই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিকের বোতল, ড্রাম, ট্যাংক এমনকি মাটির নিচেও জ্বালানি তেল সংরক্ষণের প্রবণতা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব সংরক্ষণ সম্পূর্ণ অনিরাপদ ও অপরিকল্পিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। কারণ জ্বালানি তেল অত্যন্ত দাহ্য এবং অল্প অসতর্কতায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (অপারেশন ও মেনটেন্যান্স) মো. মামুনুর রশিদ সতর্ক করে বলেন, দাহ্য পদার্থ অরক্ষিতভাবে সংরক্ষণ করলে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সামান্য স্ফুলিঙ্গ বা আগুনের সংস্পর্শ পেলেই বিস্ফোরণ ঘটার ঝুঁকি থাকে। অনেকেই মোটরসাইকেল বা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বোতলে করে বাসায় তেল রেখে দিচ্ছেন, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। গ্যাসের চুলা জ্বালানো, ম্যাচ বা লাইটার ব্যবহার করার সময় এমন মজুত তেল ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে চলমান অস্থিরতার প্রভাব বিশ্ববাজারের মতো দেশের জ্বালানি খাতেও পড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, যার ফলে অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে মজুত করছেন—যা ‘প্যানিক বায়িং’ নামে পরিচিত। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য মানুষের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে অবৈধ মজুতের পথ বেছে নিচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, পেট্রোল ও অকটেন খুব দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয় এবং খোলা অবস্থায় থাকলে তা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ঘরের ভেতরে গ্যাসের মতো পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এমন অবস্থায় সামান্য সিগারেটের আগুন বা ছোট একটি স্পার্ক থেকেও বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। দীর্ঘ সময় এসব বাষ্প শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও দেখা দিতে পারে।
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ব্যক্তি পর্যায়ে জ্বালানি তেল মজুত করা সম্পূর্ণ আইনবিরুদ্ধ এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সরকার যে তেল সংরক্ষণ করে, তা নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও নিরাপত্তা মান বজায় রেখে করা হয়। কিন্তু বাসাবাড়িতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে তেল রাখলে তা যেকোনো সময় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এখন পর্যন্ত বড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলেও ভবিষ্যতে তা ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আইন অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে অবৈধ মজুত বা কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হতে পারে। এছাড়া ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি লাভের উদ্দেশ্যে নয়, অন্য কারণে তেল সংরক্ষণ করেছিলেন, তাহলে তার শাস্তি কমে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডে নেমে আসতে পারে।
সরকার ইতোমধ্যে অবৈধ মজুত বন্ধে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের মতো জ্বালানি বাসাবাড়িতে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং আইনত দণ্ডনীয়। এ কারণে সারাদেশে ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে, যারা নিয়মিত বাজার তদারকি করছে এবং সন্দেহভাজন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে।
এছাড়া অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা করছে, সচেতন নাগরিকদের সহযোগিতায় এই অবৈধ কার্যক্রম দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। কারণ অনেকেই ঝুঁকির বিষয়টি না বুঝেই বাসাবাড়িতে তেল সংরক্ষণ করছেন। সামান্য অসতর্কতা থেকে যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই নিজেদের নিরাপত্তা ও জনস্বার্থে সবাইকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।




















