Dhaka ০৬:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক
4 / 100 SEO Score

 

দেশের অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট নিয়ে আজ সংসদে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। প্রস্তাবিত এই বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদের প্রথম বাজেট।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে স্পিকারের সভাপতিত্বে বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটিই তার প্রথম বাজেট।

এবারের বাজেটে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় কর ব্যবস্থায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্যও কিছু স্বস্তিমূলক পদক্ষেপ থাকছে।

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা আসবে সরকারের নিজস্ব উৎস থেকে, আর ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে বৈদেশিক সহায়তা ও প্রকল্প ঋণ থেকে। চলমান মেগা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য এই বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার ও খাদ্য খাতে ভর্তুকি এবং প্রণোদনা বাবদ আগামী অর্থবছরে ১ লাখ ১৭ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই বিশাল ব্যয় নির্বাহে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে রেকর্ড ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) একাই ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব পালন করতে হবে। ভ্যাট খাত থেকে ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা এবং আয়কর ও মূলধনী মুনাফা কর থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার থেকে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হবে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।

নতুন বাজেটে কর ও শুল্ক কাঠামোয় পরিবর্তনের কারণে বেশ কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে। সিগারেট ও নিকোটিনজাত পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি করায় এসব পণ্যের দাম বাড়বে। একই সঙ্গে আমদানি করা কাজুবাদাম, হিমায়িত মাছ, বিদেশি প্রসাধনী ও এমএস রডের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে দেশীয় ইলেকট্রনিকস শিল্পকে উৎসাহ দিতে ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ও এসির উৎপাদন পর্যায়ের ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ শিল্পের বিদ্যমান কর সুবিধাও বহাল থাকবে। এছাড়া ইলেকট্রিক গাড়ি, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং কিছু চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে চাপ কমাতে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলসহ ৬০টি কৃষিপণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এবারের বাজেটের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য পাঁচ বছরের আয়কর রোডম্যাপ ঘোষণা। প্রথম ধাপে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হবে। পরবর্তী বছরগুলোতে ধাপে ধাপে তা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নারী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং জুলাই অভ্যুত্থানের গেজেটভুক্ত যোদ্ধাদের জন্যও করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি করনীতি ও রাজস্ব সংস্কারের মাধ্যমে করব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য করা হবে। তবে রেকর্ড রাজস্ব আদায়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিপুল বাজেট ঘাটতি সামাল দেওয়াই আগামী অর্থবছরে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

 

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট আজ

Update Time : ০৬:২৫:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
4 / 100 SEO Score

 

দেশের অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট নিয়ে আজ সংসদে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। প্রস্তাবিত এই বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদের প্রথম বাজেট।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে স্পিকারের সভাপতিত্বে বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটিই তার প্রথম বাজেট।

এবারের বাজেটে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় কর ব্যবস্থায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্যও কিছু স্বস্তিমূলক পদক্ষেপ থাকছে।

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা আসবে সরকারের নিজস্ব উৎস থেকে, আর ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে বৈদেশিক সহায়তা ও প্রকল্প ঋণ থেকে। চলমান মেগা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য এই বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার ও খাদ্য খাতে ভর্তুকি এবং প্রণোদনা বাবদ আগামী অর্থবছরে ১ লাখ ১৭ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই বিশাল ব্যয় নির্বাহে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে রেকর্ড ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) একাই ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব পালন করতে হবে। ভ্যাট খাত থেকে ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা এবং আয়কর ও মূলধনী মুনাফা কর থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার থেকে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হবে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।

নতুন বাজেটে কর ও শুল্ক কাঠামোয় পরিবর্তনের কারণে বেশ কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে। সিগারেট ও নিকোটিনজাত পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি করায় এসব পণ্যের দাম বাড়বে। একই সঙ্গে আমদানি করা কাজুবাদাম, হিমায়িত মাছ, বিদেশি প্রসাধনী ও এমএস রডের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে দেশীয় ইলেকট্রনিকস শিল্পকে উৎসাহ দিতে ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ও এসির উৎপাদন পর্যায়ের ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ শিল্পের বিদ্যমান কর সুবিধাও বহাল থাকবে। এছাড়া ইলেকট্রিক গাড়ি, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং কিছু চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে চাপ কমাতে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলসহ ৬০টি কৃষিপণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এবারের বাজেটের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য পাঁচ বছরের আয়কর রোডম্যাপ ঘোষণা। প্রথম ধাপে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হবে। পরবর্তী বছরগুলোতে ধাপে ধাপে তা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নারী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং জুলাই অভ্যুত্থানের গেজেটভুক্ত যোদ্ধাদের জন্যও করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি করনীতি ও রাজস্ব সংস্কারের মাধ্যমে করব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য করা হবে। তবে রেকর্ড রাজস্ব আদায়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিপুল বাজেট ঘাটতি সামাল দেওয়াই আগামী অর্থবছরে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।