এ বছরই পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশ
*** নভেম্বরে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ
**** পিওআরভি পরীক্ষার ত্রুটি সারিয়ে চলছে উৎপাদনের শেষ প্রস্তুতি
**** প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকার নিচে থাকার সম্ভাবনা
**** স্পেন্ট ফুয়েল ও ভারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ
দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর। কয়েক দফা সময় পেছানোর পর এখন আগামী নভেম্বর মাসে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শুরুতে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সবকিছু নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী এগোলে চলতি বছরই পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ। বিশ্বের যেসব দেশ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, বাংলাদেশও সেই তালিকায় যুক্ত হবে।
তবে উৎপাদনে যাওয়ার আগে রূপপুরকে এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ধাপ পার হতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রেসারাইজার পাইলট অপারেটেড রিলেটেড ভালব (পিওআরভি)–সংক্রান্ত পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ত্রুটি দেখা দেওয়ায় কাজ কিছুটা পিছিয়েছে। বর্তমানে সেই ত্রুটি সারানোর কাজ চলছে।
শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি: রূপপুর প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পিওআরভি পরীক্ষায় সফল হওয়ার পর ফিউশন রিয়্যাকশন ঘটিয়ে পাওয়ার স্টার্টআপের দিকে এগোবে কেন্দ্রটি। এরপর ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন গত ২৬ আগস্ট বলেন, আদর্শ কর্মসূচি অনুসরণ করা গেলে আগামী নভেম্বরের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে পারে। তবে শেষ মুহূর্তে কোনো পরীক্ষায় সমস্যা দেখা দিলে সময় আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
এ কারণে নভেম্বরের লক্ষ্য থাকলেও এখনই নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও কারিগরি পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
বর্তমান অবস্থান থেকে উৎপাদনে যেতে প্রায় দুই মাস সময় লাগতে পারে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, বি-টু ধাপ শেষ করতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ প্রয়োজন হবে। এরপর টারবাইনের মাধ্যমে ৩০ শতাংশ স্টিম তৈরির পর্যায়ে যেতে আরও প্রায় ছয় সপ্তাহ লাগতে পারে। সব মিলিয়ে প্রায় নয় সপ্তাহ সময়ের হিসাব করা হয়েছে।
যেভাবে তৈরি হবে বিদ্যুৎ: রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া প্রচলিত গ্যাস বা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে ভিন্ন হলেও মূল নীতিটি তাপশক্তিকে কাজে লাগানোর ওপর নির্ভরশীল।
পারমাণবিক জ্বালানির বিক্রিয়ার মাধ্যমে রিয়্যাক্টরের ভেতরে তাপশক্তি তৈরি হবে। সেই তাপ ব্যবহার করে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হবে। উচ্চচাপের বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘোরানো হবে। টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটর ঘুরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। পরে সেই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বি-ওয়ান ধাপে ফুয়েল লোডিং শুরু হয়। এরপর বি-টু ধাপে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ সম্পন্ন করা হয়। এই ধাপ শেষ হওয়ার পর পারমাণবিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
অর্থাৎ ফুয়েল লোডিং থেকে শুরু করে পারমাণবিক বিক্রিয়া, তাপ উৎপাদন, বাষ্প তৈরি, টারবাইন ঘোরানো এবং শেষ পর্যন্ত জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিটি ধাপ ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কত: রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে এর দাম কত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে সামনে আসছে।
২০১৬ সালে প্রকল্পটির প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছিল ৪ টাকা ৬৫ পয়সা। তবে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন খরচ বিবেচনা করা হবে না। এর সঙ্গে পরিচালন ব্যয়, বীমা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খরচ যুক্ত হবে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং রূপপুর প্রকল্প কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে পিডিবির পক্ষ থেকে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছে। এসব তথ্য পর্যালোচনার পর বিদ্যুতের মূল্য চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন জানিয়েছেন, সব ধরনের ব্যয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও রূপপুরের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকার নিচে থাকতে পারে।
স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই: রূপপুর চালুর সঙ্গে পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। রিয়্যাক্টরে ব্যবহারের পর পারমাণবিক জ্বালানি স্পেন্ট ফুয়েলে পরিণত হবে।
বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, রূপপুরে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ভবিষ্যতে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে ব্যবস্থাপনার কথা রয়েছে। তবে এ জন্য রাশিয়াকে কী পরিমাণ অর্থ দিতে হবে, সেই বাণিজ্যিক চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবহৃত জ্বালানি তাৎক্ষণিকভাবে রিয়্যাক্টর থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তা কেন্দ্রে সংরক্ষণ করা সম্ভব। ফলে এ বিষয়ে এখনই তাৎক্ষণিক চাপ না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উদ্বেগ: তবে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের জায়গা শুধু স্পেন্ট ফুয়েল নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হলে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের ভারি বর্জ্য তৈরি হবে। এসব বর্জ্য নিরাপদে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, স্পেন্ট ফুয়েলের তুলনায় এই মুহূর্তে বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যাওয়ার পর তৈরি হওয়া ভারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। তাঁর মতে, এসব বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সংরক্ষণাগার তৈরি না হওয়া উদ্বেগের বিষয়।
তিনি মনে করেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর পর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যেন নতুন সমস্যা তৈরি না করে, সে জন্য দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
শুধু বিদ্যুৎ নয়, নতুন অভিজ্ঞতাও: রূপপুরের প্রথম ইউনিট চালু হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। এত দিন গ্যাস, কয়লা, তেল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এবার যুক্ত হবে পারমাণবিক শক্তি।
প্রথম ধাপে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় নতুন একটি উৎস যুক্ত হবে।
তবে রূপপুরের সাফল্য শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রটির নিরাপদ পরিচালনা, পারমাণবিক জ্বালানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ সবকিছুর ওপরই নির্ভর করবে প্রকল্পটির কার্যকারিতা।
নভেম্বরের লক্ষ্য পূরণ হলে বাংলাদেশের জন্য এটি হবে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কারণ, সেই মুহূর্তে দেশে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক শক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
রূপপুর তাই এখন শুধু একটি নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়। এটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন অধ্যায়ের সূচনাবিন্দু। শেষ মুহূর্তের কারিগরি পরীক্ষাগুলো সফলভাবে শেষ হলে চলতি বছরই সেই অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সূচনা হতে পারে।










