Dhaka ০৬:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এখনো থামছে না হামের প্রকোপ

14 / 100 SEO Score

 

দেশব্যাপী হামের প্রকোপ রুখতে সরকারের টিকাদান কর্মসূচির কাভারেজ শতভাগ পূরণ হলেও কমছে না আক্রান্তের সংখ্যা। ভ্যাকসিন দেওয়ার নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরও প্রতিদিন হাজারেরও বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।

সাধারণত টিকা প্রয়োগের ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু ৬ থেকে ৭ সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও সংক্রমণের হার আগের মতোই ঊর্ধ্বমুখী। ফলে ভ্যাকসিনের মান ও কার্যকারিতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে, তেমনি প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকা পাঠানোর সময় সঠিক কোল্ড চেইন (তাপমাত্রা) বজায় রাখা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় চলতি বছরের ৫ এপ্রিল প্রথমে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় টিকাদান শুরু করে স্বাস্থ্য বিভাগ। মাত্র ১৫ দিনেই এসব এলাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ শতাংশ বেশি কাভারেজ অর্জিত হয়। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ৬-৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়ে চলে ২০ মে পর্যন্ত। চূড়ান্ত হিসাবে দেশজুড়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ শতাংশ বেশি টিকা কাভারেজ সম্পন্ন হয়।

আমার মনে হয় কাগজে-কলমে দেখানো কাভারেজ ও প্রকৃত কাভারেজের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো এলাকায় ৩ হাজার শিশু টিকার উপযোগী হলেও লক্ষ্যমাত্রা হয়তো ধরা হয়েছে ২ হাজার। ওই ২ হাজার শিশুকে টিকা দিয়ে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দাবি করা হলেও, বাস্তবে কিন্তু বাকি ১ হাজার শিশু বাদ পড়েছে। ফলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে না এবং আক্রান্তের সংখ্যাও কমছে না। বিষয়টি সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত, জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে–নজির আহমেদ।

তবে শতভাগ সাফল্যের এই দাবির পরও ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত শিশুদের শরীরে আদৌ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে রক্তের নমুনা পরীক্ষার পরামর্শ দিলেও তা উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। একই সঙ্গে, নিয়মিত টিকাদানের বয়স (৯ মাস) হওয়ার আগেই শিশুরা কেন হামে আক্রান্ত হচ্ছে, তা নিয়েও কোনো পর্যাপ্ত গবেষণা না হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, টিকা যদি শরীরে কার্যকর হতো, তবে দেশজুড়ে এখনো প্রতিনিয়ত সংক্রমণ ঘটত না। শিশুদের শরীরে আদৌ কতটুকু অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, তা বয়সভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে খতিয়ে দেখা উচিত। যদি অ্যান্টিবডি তৈরি না হয়ে থাকে, তবে টিকার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

টিকা দিলেই যে কাজ হবে, এমন নয়। যেসব শিশু টিকা পেয়েছে, তাদের বয়সভিত্তিক নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা দরকার যে টিকা প্রদানের ফলে কতটুকু রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এটি খুব বড় কোনো কাজ নয়। আমরা বারবার এ কথা বলার পরও সরকার কেমন যেন গা-ছাড়াভাব দেখাচ্ছে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়
জনস্বাস্থ্যবিদ ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী

সরকারি কাভারেজের তথ্যে গরমিল থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার মনে হয় কাগজে-কলমে দেখানো কাভারেজ ও প্রকৃত কাভারেজের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো এলাকায় ৩ হাজার শিশু টিকার উপযোগী হলেও লক্ষ্যমাত্রা হয়তো ধরা হয়েছে ২ হাজার। ওই ২ হাজার শিশুকে টিকা দিয়ে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দাবি করা হলেও, বাস্তবে কিন্তু বাকি ১ হাজার শিশু বাদ পড়েছে। ফলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে না এবং আক্রান্তের সংখ্যাও কমছে না। বিষয়টি সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।

ভ্যাকসিনের গুণগত মান ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে এই জনস্বাস্থ্যবিদ আরও বলেন, বর্তমানে যে টিকা দেওয়া হয়েছে, তার যথাযথ মান বজায় ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। টিকা উৎপাদন থেকে শুরু করে শরীরে প্রয়োগ করা পর্যন্ত নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। যদি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা না হয়, তাহলে টিকার কার্যকারিতা নষ্ট হতে পারে এবং শিশুদের শরীরে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি নাও হতে পারে। শিশুদের দেওয়া এই টিকাগুলো গত সেপ্টেম্বর থেকে ইপিআই-তে পড়ে ছিল। সেখান থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের টিকাদান কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছানো ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা (কোল্ড চেইন) বজায় রাখা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ নির্ধারিত তাপমাত্রার চেয়ে সামান্য বেশি তাপের সংস্পর্শে এলেই টিকার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়।

এখনো আমরা এটি পরীক্ষা করে দেখিনি। আপনারা যেহেতু বিষয়টি বলছেন, আমি ডিজিকে (মহাপরিচালক) জানাব। দেখি কী করা যায়
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশীদ
জনস্বাস্থ্যবিদ ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, টিকা দিলেই যে কাজ হবে, এমন নয়। যেসব শিশু টিকা পেয়েছে, তাদের বয়সভিত্তিক নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা দরকার যে টিকা প্রদানের ফলে কতটুকু রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এটি খুব বড় কোনো কাজ নয়। আমরা বারবার এ কথা বলার পরও সরকার কেমন যেন গা-ছাড়াভাব দেখাচ্ছে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

তিনি বলেন, সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পেইনের টিকা কাভারেজ শতভাগ পূরণেরও প্রায় এক মাস হতে চলেছে। কিন্তু এখনো হামে আক্রান্তের সংখ্যা কমছে না। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। টিকা প্রদানের দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই ইমিউনিটি তৈরি হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। তবে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত শিশুদের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা উচিত ছিল। কিন্তু সরকার সেটি করছে না। ফলে প্রকৃত চিত্রও জানা যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে কবে শিশুরা হাম থেকে সুরক্ষা পাবে, তা বলা কঠিন।

টিকা প্রদানের পর শিশুদের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি হচ্ছে কি না জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশীদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, এখনো আমরা এটি পরীক্ষা করে দেখিনি। আপনারা যেহেতু বিষয়টি বলছেন, আমি ডিজিকে (মহাপরিচালক) জানাব। দেখি কী করা যায়।

হামের প্রকোপ কখন হ্রাস পেতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা বলা সম্ভব নয়, আল্লাহই ভালো জানেন। তবে সময় লাগবে। সে পর্যন্ত আমাদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে হামের প্রকোপ আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরও ১ হাজার ৪১১ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ২৪৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৫ জন।

নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের হিসাব মতে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে সর্বমোট ৭৬ হাজার ৮৭৬ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় ৯ হাজার ৫০৩ জনের হাম নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে দেশজুড়ে মোট ৬১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ৯১ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিল এবং বাকি ৫১৯ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।

Tag :

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

এখনো থামছে না হামের প্রকোপ

Update Time : ০৭:৩০:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
14 / 100 SEO Score

 

দেশব্যাপী হামের প্রকোপ রুখতে সরকারের টিকাদান কর্মসূচির কাভারেজ শতভাগ পূরণ হলেও কমছে না আক্রান্তের সংখ্যা। ভ্যাকসিন দেওয়ার নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরও প্রতিদিন হাজারেরও বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।

সাধারণত টিকা প্রয়োগের ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু ৬ থেকে ৭ সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও সংক্রমণের হার আগের মতোই ঊর্ধ্বমুখী। ফলে ভ্যাকসিনের মান ও কার্যকারিতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে, তেমনি প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকা পাঠানোর সময় সঠিক কোল্ড চেইন (তাপমাত্রা) বজায় রাখা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় চলতি বছরের ৫ এপ্রিল প্রথমে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় টিকাদান শুরু করে স্বাস্থ্য বিভাগ। মাত্র ১৫ দিনেই এসব এলাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ শতাংশ বেশি কাভারেজ অর্জিত হয়। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ৬-৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়ে চলে ২০ মে পর্যন্ত। চূড়ান্ত হিসাবে দেশজুড়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ শতাংশ বেশি টিকা কাভারেজ সম্পন্ন হয়।

আমার মনে হয় কাগজে-কলমে দেখানো কাভারেজ ও প্রকৃত কাভারেজের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো এলাকায় ৩ হাজার শিশু টিকার উপযোগী হলেও লক্ষ্যমাত্রা হয়তো ধরা হয়েছে ২ হাজার। ওই ২ হাজার শিশুকে টিকা দিয়ে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দাবি করা হলেও, বাস্তবে কিন্তু বাকি ১ হাজার শিশু বাদ পড়েছে। ফলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে না এবং আক্রান্তের সংখ্যাও কমছে না। বিষয়টি সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত, জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে–নজির আহমেদ।

তবে শতভাগ সাফল্যের এই দাবির পরও ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত শিশুদের শরীরে আদৌ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে রক্তের নমুনা পরীক্ষার পরামর্শ দিলেও তা উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। একই সঙ্গে, নিয়মিত টিকাদানের বয়স (৯ মাস) হওয়ার আগেই শিশুরা কেন হামে আক্রান্ত হচ্ছে, তা নিয়েও কোনো পর্যাপ্ত গবেষণা না হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, টিকা যদি শরীরে কার্যকর হতো, তবে দেশজুড়ে এখনো প্রতিনিয়ত সংক্রমণ ঘটত না। শিশুদের শরীরে আদৌ কতটুকু অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, তা বয়সভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে খতিয়ে দেখা উচিত। যদি অ্যান্টিবডি তৈরি না হয়ে থাকে, তবে টিকার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

টিকা দিলেই যে কাজ হবে, এমন নয়। যেসব শিশু টিকা পেয়েছে, তাদের বয়সভিত্তিক নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা দরকার যে টিকা প্রদানের ফলে কতটুকু রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এটি খুব বড় কোনো কাজ নয়। আমরা বারবার এ কথা বলার পরও সরকার কেমন যেন গা-ছাড়াভাব দেখাচ্ছে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়
জনস্বাস্থ্যবিদ ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী

সরকারি কাভারেজের তথ্যে গরমিল থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার মনে হয় কাগজে-কলমে দেখানো কাভারেজ ও প্রকৃত কাভারেজের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো এলাকায় ৩ হাজার শিশু টিকার উপযোগী হলেও লক্ষ্যমাত্রা হয়তো ধরা হয়েছে ২ হাজার। ওই ২ হাজার শিশুকে টিকা দিয়ে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দাবি করা হলেও, বাস্তবে কিন্তু বাকি ১ হাজার শিশু বাদ পড়েছে। ফলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে না এবং আক্রান্তের সংখ্যাও কমছে না। বিষয়টি সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।

ভ্যাকসিনের গুণগত মান ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে এই জনস্বাস্থ্যবিদ আরও বলেন, বর্তমানে যে টিকা দেওয়া হয়েছে, তার যথাযথ মান বজায় ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। টিকা উৎপাদন থেকে শুরু করে শরীরে প্রয়োগ করা পর্যন্ত নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। যদি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা না হয়, তাহলে টিকার কার্যকারিতা নষ্ট হতে পারে এবং শিশুদের শরীরে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি নাও হতে পারে। শিশুদের দেওয়া এই টিকাগুলো গত সেপ্টেম্বর থেকে ইপিআই-তে পড়ে ছিল। সেখান থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের টিকাদান কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছানো ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা (কোল্ড চেইন) বজায় রাখা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ নির্ধারিত তাপমাত্রার চেয়ে সামান্য বেশি তাপের সংস্পর্শে এলেই টিকার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়।

এখনো আমরা এটি পরীক্ষা করে দেখিনি। আপনারা যেহেতু বিষয়টি বলছেন, আমি ডিজিকে (মহাপরিচালক) জানাব। দেখি কী করা যায়
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশীদ
জনস্বাস্থ্যবিদ ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, টিকা দিলেই যে কাজ হবে, এমন নয়। যেসব শিশু টিকা পেয়েছে, তাদের বয়সভিত্তিক নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা দরকার যে টিকা প্রদানের ফলে কতটুকু রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এটি খুব বড় কোনো কাজ নয়। আমরা বারবার এ কথা বলার পরও সরকার কেমন যেন গা-ছাড়াভাব দেখাচ্ছে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

তিনি বলেন, সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পেইনের টিকা কাভারেজ শতভাগ পূরণেরও প্রায় এক মাস হতে চলেছে। কিন্তু এখনো হামে আক্রান্তের সংখ্যা কমছে না। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। টিকা প্রদানের দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই ইমিউনিটি তৈরি হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। তবে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত শিশুদের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা উচিত ছিল। কিন্তু সরকার সেটি করছে না। ফলে প্রকৃত চিত্রও জানা যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে কবে শিশুরা হাম থেকে সুরক্ষা পাবে, তা বলা কঠিন।

টিকা প্রদানের পর শিশুদের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি হচ্ছে কি না জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশীদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, এখনো আমরা এটি পরীক্ষা করে দেখিনি। আপনারা যেহেতু বিষয়টি বলছেন, আমি ডিজিকে (মহাপরিচালক) জানাব। দেখি কী করা যায়।

হামের প্রকোপ কখন হ্রাস পেতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা বলা সম্ভব নয়, আল্লাহই ভালো জানেন। তবে সময় লাগবে। সে পর্যন্ত আমাদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে হামের প্রকোপ আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরও ১ হাজার ৪১১ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ২৪৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৫ জন।

নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের হিসাব মতে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে সর্বমোট ৭৬ হাজার ৮৭৬ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় ৯ হাজার ৫০৩ জনের হাম নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে দেশজুড়ে মোট ৬১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ৯১ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিল এবং বাকি ৫১৯ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।