Dhaka ০৫:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিল্পকলায় বরাদ্দ নিয়ে নাটকীয়তা

নিজেস্ব প্রতিবেদক
8 / 100 SEO Score

 

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে হল বরাদ্দ ঘিরে বিশৃঙ্খলা যেন থামছেই না। এতে নিয়মিত ভোগান্তিতে পড়ছে নাট্যদলগুলো। এ ধরনের আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট নাট্যকর্মীরা।

সম্প্রতি ‘তাড়ুয়া’ নামে একটি নাট্যদল জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তন তিন দিনের জন্য ব্যবহারের আবেদন জানায়। তারা ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ শিরোনামে একটি যুদ্ধবিরোধী নাটক মঞ্চস্থ করার পরিকল্পনা করে।

আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ২২, ২৩ ও ২৪ এপ্রিল তারিখ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী দলটি মহড়া চালায় এবং দর্শকদের জন্য টিকিট বিক্রিও শুরু করে। কিন্তু হঠাৎ করেই গত রোববার জানানো হয়, ২৩ এপ্রিলের বরাদ্দ কার্যকর রাখা যাচ্ছে না।

কর্তৃপক্ষের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে নির্ধারিত দিনে মিলনায়তন ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না এবং এজন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অভিনেত্রী কাজী রোকসানা রুমা সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, ‘প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অজুহাতে মাঝের একটি দিন বাতিল করে দেওয়ার এই প্রবণতা নতুন নয়; আমরা দেখতে চাই, ওই দিন সেখানে কী এমন গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হচ্ছে।

আমাদের পরিকল্পনা ছিল ২২ তারিখ টেকনিক্যাল শো এবং ২৩ ও ২৪ তারিখ মূল প্রদর্শনী। এখন মাঝপথে বাতিল হওয়ায় পুরো আয়োজন নতুন করে সাজাতে হবে।’

প্রশ্ন তুলে তিনি লেখেন, ‘গত দুই সপ্তাহের প্রচার ও টিকিট বিক্রির কী হবে—তার দায় কি কর্তৃপক্ষ নেবে? একটি দল চালানো ও মঞ্চায়নের পেছনের শ্রম কি তাদের অজানা? এমন অযৌক্তিক আচরণের নিন্দা জানাচ্ছি। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে।

পরিবর্তনের আশা কম হলেও নতুনরূপে পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি হতাশাজনক। তাড়ুয়ার পাশে আছি। তাদের বরাদ্দ ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।’

রুমার মন্তব্যের ঘরে খালিদ বিন নাসির লিখেছেন, ‘শিল্পকলা তো শিল্পীদের জন্য হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। এভাবে বরাদ্দ বাতিলের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। প্রতিবাদ জোরালো হওয়া উচিত।’

জানা গেছে, তাড়ুয়ার নির্ধারিত ২৩ এপ্রিলের বরাদ্দ বাতিল করে সেটি জাতীয়তাবাদী দলের সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

এ ঘটনায় নাট্যাঙ্গনে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে পরে সিদ্ধান্ত বদলানো হয়। ২৩ তারিখের অনুষ্ঠান বাতিল করে আবারও তাড়ুয়াকে মঞ্চায়নের অনুমতি দেওয়া হয়।

তাড়ুয়ার বরাদ্দ বাতিল প্রসঙ্গে নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক দীপক কুমার গোস্বামী সমকালকে বলেন, ‘বিষয়টি সমাধান হয়েছে।

মহাপরিচালক প্রয়োজনে যে কোনো সময় বরাদ্দ পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। প্রথমে ওই তারিখে পরিবর্তন আনা হলেও পরে সিদ্ধান্ত সংশোধন করা হয় এবং তাড়ুয়াকেই নাটক মঞ্চায়নের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’

এ ধরনের ঘটনা শুধু তাড়ুয়ার ক্ষেত্রেই নয়; সাম্প্রতিক সময়ে আরও কয়েকটি নাট্যদল ও সাংস্কৃতিক সংগঠন একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে।

চলতি মাসেই আগের বরাদ্দ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নাট্যকেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠিত দলের বরাদ্দ বাতিল করে এক প্রতিমন্ত্রীর অনুরোধে ‘বাংলা সংগীত সংস্থা’কে হল দেওয়া হয়।

আবার বারডেমের একটি ব্যাচের সমাপনী অনুষ্ঠানের জন্য আগামী মাসে জাতীয় নাট্যশালার বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে। হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট এমন আয়োজন নাট্যশালায় করার খবরে ক্ষোভ জানিয়েছেন সংস্কৃতিকর্মীরা।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আরণ্যক নাট্যদলকেও মিলনায়তন বরাদ্দ দিয়ে পরে তা বাতিল করার অভিযোগ রয়েছে। এর আগে গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পথ মূকাভিনয় পরিষদের একটি সম্মেলন চলাকালে মাঝপথেই অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়।

নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, ‘হঠাৎ করে বরাদ্দ বাতিল হলে দর্শকের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায় এবং সংগঠনগুলো আর্থিক ও সাংগঠনিক সংকটে পড়ে। এমন সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

নৃত্যশিল্পী পূজা সেনগুপ্ত বলেন, ‘এটি অত্যন্ত হতাশাজনক। রাষ্ট্রীয় আয়োজনের জন্য আলাদা ভেন্যু রয়েছে। জাতীয় নাট্যশালা মূলত সংস্কৃতিকর্মীদের কাজের জায়গা, যা রাষ্ট্র কেবল তত্ত্বাবধান করে। সেখানে নাটকের বরাদ্দ বাতিল করে অন্য অনুষ্ঠান আয়োজন করা অনৈতিক সিদ্ধান্ত।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

শিল্পকলায় বরাদ্দ নিয়ে নাটকীয়তা

Update Time : ০৩:৩৬:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
8 / 100 SEO Score

 

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে হল বরাদ্দ ঘিরে বিশৃঙ্খলা যেন থামছেই না। এতে নিয়মিত ভোগান্তিতে পড়ছে নাট্যদলগুলো। এ ধরনের আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট নাট্যকর্মীরা।

সম্প্রতি ‘তাড়ুয়া’ নামে একটি নাট্যদল জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তন তিন দিনের জন্য ব্যবহারের আবেদন জানায়। তারা ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ শিরোনামে একটি যুদ্ধবিরোধী নাটক মঞ্চস্থ করার পরিকল্পনা করে।

আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ২২, ২৩ ও ২৪ এপ্রিল তারিখ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী দলটি মহড়া চালায় এবং দর্শকদের জন্য টিকিট বিক্রিও শুরু করে। কিন্তু হঠাৎ করেই গত রোববার জানানো হয়, ২৩ এপ্রিলের বরাদ্দ কার্যকর রাখা যাচ্ছে না।

কর্তৃপক্ষের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে নির্ধারিত দিনে মিলনায়তন ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না এবং এজন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অভিনেত্রী কাজী রোকসানা রুমা সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, ‘প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অজুহাতে মাঝের একটি দিন বাতিল করে দেওয়ার এই প্রবণতা নতুন নয়; আমরা দেখতে চাই, ওই দিন সেখানে কী এমন গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হচ্ছে।

আমাদের পরিকল্পনা ছিল ২২ তারিখ টেকনিক্যাল শো এবং ২৩ ও ২৪ তারিখ মূল প্রদর্শনী। এখন মাঝপথে বাতিল হওয়ায় পুরো আয়োজন নতুন করে সাজাতে হবে।’

প্রশ্ন তুলে তিনি লেখেন, ‘গত দুই সপ্তাহের প্রচার ও টিকিট বিক্রির কী হবে—তার দায় কি কর্তৃপক্ষ নেবে? একটি দল চালানো ও মঞ্চায়নের পেছনের শ্রম কি তাদের অজানা? এমন অযৌক্তিক আচরণের নিন্দা জানাচ্ছি। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে।

পরিবর্তনের আশা কম হলেও নতুনরূপে পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি হতাশাজনক। তাড়ুয়ার পাশে আছি। তাদের বরাদ্দ ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।’

রুমার মন্তব্যের ঘরে খালিদ বিন নাসির লিখেছেন, ‘শিল্পকলা তো শিল্পীদের জন্য হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। এভাবে বরাদ্দ বাতিলের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। প্রতিবাদ জোরালো হওয়া উচিত।’

জানা গেছে, তাড়ুয়ার নির্ধারিত ২৩ এপ্রিলের বরাদ্দ বাতিল করে সেটি জাতীয়তাবাদী দলের সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

এ ঘটনায় নাট্যাঙ্গনে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে পরে সিদ্ধান্ত বদলানো হয়। ২৩ তারিখের অনুষ্ঠান বাতিল করে আবারও তাড়ুয়াকে মঞ্চায়নের অনুমতি দেওয়া হয়।

তাড়ুয়ার বরাদ্দ বাতিল প্রসঙ্গে নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক দীপক কুমার গোস্বামী সমকালকে বলেন, ‘বিষয়টি সমাধান হয়েছে।

মহাপরিচালক প্রয়োজনে যে কোনো সময় বরাদ্দ পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। প্রথমে ওই তারিখে পরিবর্তন আনা হলেও পরে সিদ্ধান্ত সংশোধন করা হয় এবং তাড়ুয়াকেই নাটক মঞ্চায়নের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’

এ ধরনের ঘটনা শুধু তাড়ুয়ার ক্ষেত্রেই নয়; সাম্প্রতিক সময়ে আরও কয়েকটি নাট্যদল ও সাংস্কৃতিক সংগঠন একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে।

চলতি মাসেই আগের বরাদ্দ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নাট্যকেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠিত দলের বরাদ্দ বাতিল করে এক প্রতিমন্ত্রীর অনুরোধে ‘বাংলা সংগীত সংস্থা’কে হল দেওয়া হয়।

আবার বারডেমের একটি ব্যাচের সমাপনী অনুষ্ঠানের জন্য আগামী মাসে জাতীয় নাট্যশালার বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে। হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট এমন আয়োজন নাট্যশালায় করার খবরে ক্ষোভ জানিয়েছেন সংস্কৃতিকর্মীরা।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আরণ্যক নাট্যদলকেও মিলনায়তন বরাদ্দ দিয়ে পরে তা বাতিল করার অভিযোগ রয়েছে। এর আগে গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পথ মূকাভিনয় পরিষদের একটি সম্মেলন চলাকালে মাঝপথেই অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়।

নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, ‘হঠাৎ করে বরাদ্দ বাতিল হলে দর্শকের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায় এবং সংগঠনগুলো আর্থিক ও সাংগঠনিক সংকটে পড়ে। এমন সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

নৃত্যশিল্পী পূজা সেনগুপ্ত বলেন, ‘এটি অত্যন্ত হতাশাজনক। রাষ্ট্রীয় আয়োজনের জন্য আলাদা ভেন্যু রয়েছে। জাতীয় নাট্যশালা মূলত সংস্কৃতিকর্মীদের কাজের জায়গা, যা রাষ্ট্র কেবল তত্ত্বাবধান করে। সেখানে নাটকের বরাদ্দ বাতিল করে অন্য অনুষ্ঠান আয়োজন করা অনৈতিক সিদ্ধান্ত।