Dhaka ০১:১১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হামে মৃত্যু বাড়ছে, এক শয্যায় চিকিৎসা চলছে দুই-তিন শিশুর

11 / 100 SEO Score

 

হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২৫ এপ্রিল মৃত্যু হয় ১১ শিশুর। হামে ও হামের উপসর্গ নিয়ে ইতিমধ্যে ২৫০ মৃত্যু ছাড়িয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবেই নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৪৩ জনের আর হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ২১৬ জনের, এ নিয়ে মোট মৃত্যু দাঁড়াল ২৫৯ জনের।

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ৪র্থ তলা, ৪২১ নম্বর হাম ওয়ার্ডে প্রবেশ করতেই হাতের বাঁ পাশেই চোখে পড়ে একটি বেডে দুই থেকে তিন জন করে হামে আক্রান্ত শিশু চিকিত্সা নিচ্ছে। সঙ্গে আছে তাদের উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। ওয়ার্ডের কর্মরত সিনিয়র নার্স শান্তনা জানান, তাদের দুটি হামের ওয়ার্ড চালু রয়েছে—৪২১ ও ৪২৪ নম্বর ওয়ার্ড। ৪২১ নম্বর ওয়ার্ডে আছে ৬০ বেড, সেখানে গতকাল ২৬ এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত চিকিৎসা নিচ্ছিল ৯৫ শিশু। দুপুরের পরে কিছু শিশু সুস্থ হয়ে রিলিজ হয়ে যায়, এর পরেও থাকে ৭৫ শিশু। নার্সরা জানান, সন্ধ্যায় রোগীর চাপ বেড়ে যায়। আর ৪২৪ নম্বর ওয়ার্ডে কর্তব্যরত নার্স আশা রানী বলেন, এই ওয়ার্ডে ৩০টা বেড আছে, রোগী আছে ৪২ জন। তিনি জানান, শিশুরা আসছে হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, জ্বর নিয়ে। এখানে গত রাত ২টা থেকে আজ (রবিবার) দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ১৪ জন হামের রোগী ভর্তি হয়েছে। বেড কম থাকায় আমরা এক বিছানায় দুই থেকে তিন জন করে রেখে চিকিৎসা দিচ্ছি।

৪২১ নম্বর ওয়ার্ডের ৪২-৪৩ নম্বর বিছানায় হামে আক্রান্ত পাঁচ সন্তান নিয়ে ভর্তি বাঞ্ছারামপুরের লিলি বেগম। হামে আক্রান্ত ১০ মাসের তাহিরা আছে ৩৭ নম্বর বেডে। তারা বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছে। বরিশালে চিকিৎসক জানিয়েছেন, এসব এলার্জি। আক্রান্ত শিশুর মা বকুল জানান, আমার দেবরের পরামর্শে আমি ঢাকায় আসি। এখানে আসার পর জানতে পারি বাচ্চার হাম হয়েছে। এরপর ডায়রিয়া শুরু হয়, এখন আবার নিউমোনিয়া ধরা পড়েছে। একটার পর একটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে, এখন জ্বর আছে।

মেডিক্যালে এই নারীর তিন সন্তান হামে আক্রান্ত। আর বড় দুজন এখন সুস্থ আছে। শিশুদের সামাল দিতে গিয়ে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। প্রথমে তার ১০ বছর বয়সি বড় ছেলে আলামিন হামে আক্রান্ত হয়। তাকে নিয়ে বাঞ্ছারামপুরের একটি হাসপাতালে গেলে সেখানে বিছুটা সুস্থ হলে তারা বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। বাড়িতে যাওয়ার পর আবার বাচ্চা অসুস্থ হয়, ওইবার আবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে নিতেই আরেক জন অসুস্থ হয়। দুই হাসপাতালে চিকিৎসা নেই ২০ দিন।

এত রোগীর চাপ কীভাবে সামাল দিচ্ছেন, জানতে চাইলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীন বলেন, কষ্ট করে সামাল দিচ্ছি, ন্যাশনাল ক্রাইসেস—সামাল তো দিতেই হবে। আমাদের দেশে জনগণের তুলনায় হাসপাতালে সিট সংখ্যা যেহেতু কম, সে কারণে এক বেডে দুজন-তিন জন করে রোগী রাখা যাচ্ছে। এটা ছোট শিশুর জন্যেই কেবল সম্ভব হচ্ছে। পিআইসিইউ প্রসঙ্গে পরিচালক জানান, আমরা শুরু থেকে হামের সাড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ রোগীর চিকিৎসা দিয়েছি এ পর্যন্ত। কিন্তু এর মধ্যে নিশ্চিত হামে এক জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আমাদের পিআইসিইউ এর মধ্যে চালু হবে। চিকিৎসক ও নার্স ম্যানেজ হলেই পিআইসিইউ চালু হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, হামের এই পরিস্থিতিটাকে উচিত ছিল মহামারি ঘোষণা করা। যেখানে ২০ হাজারের ওপরে আক্রান্ত রোগী, ২০০-এর ওপরে মৃত্যু—সেটা কখনোই হাল্কা করে দেখা উচিত হচ্ছে না এবং এটা একটা মারাত্মক কিছু।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে আমরা বহু জরুরি অবস্থা মোকাবিলা করি। তখন সেখানে কী হয়—একটা প্ল্যান থাকে, একটা বাজেট থাকে, অর্থ বরাদ্দ থাকে, তার সঙ্গে নানা ধরনের ব্যবস্থা থাকে। এই যে ২০ হাজারের ওপরে রোগী, তাদের যে আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি তার তো একটা গাইডলাইন থাকা উচিত। কারণ সবাই একরকম চিকিৎসা দিতে পারবে না। আমাদের এখানে খুব ভালো প্রবীণ চিকিৎসক আছেন, খুব নবীন চিকিত্সকও আছেন—যাদের এ সম্বন্ধে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। একটা গাইডলাইন দরকার ছিল, কিন্তু সেটা হলো না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৬০৩ জন। পাশাপাশি সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ৩২ হাজার ২৮ জন। এছাড়া হাম সন্দেহে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ২১ হাজার ৪৩৪ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ১৭ হাজার ৯৫৫ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। গতকাল রবিবার বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

 

Tag :

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

হামে মৃত্যু বাড়ছে, এক শয্যায় চিকিৎসা চলছে দুই-তিন শিশুর

Update Time : ০৫:২৫:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
11 / 100 SEO Score

 

হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২৫ এপ্রিল মৃত্যু হয় ১১ শিশুর। হামে ও হামের উপসর্গ নিয়ে ইতিমধ্যে ২৫০ মৃত্যু ছাড়িয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবেই নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৪৩ জনের আর হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ২১৬ জনের, এ নিয়ে মোট মৃত্যু দাঁড়াল ২৫৯ জনের।

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ৪র্থ তলা, ৪২১ নম্বর হাম ওয়ার্ডে প্রবেশ করতেই হাতের বাঁ পাশেই চোখে পড়ে একটি বেডে দুই থেকে তিন জন করে হামে আক্রান্ত শিশু চিকিত্সা নিচ্ছে। সঙ্গে আছে তাদের উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। ওয়ার্ডের কর্মরত সিনিয়র নার্স শান্তনা জানান, তাদের দুটি হামের ওয়ার্ড চালু রয়েছে—৪২১ ও ৪২৪ নম্বর ওয়ার্ড। ৪২১ নম্বর ওয়ার্ডে আছে ৬০ বেড, সেখানে গতকাল ২৬ এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত চিকিৎসা নিচ্ছিল ৯৫ শিশু। দুপুরের পরে কিছু শিশু সুস্থ হয়ে রিলিজ হয়ে যায়, এর পরেও থাকে ৭৫ শিশু। নার্সরা জানান, সন্ধ্যায় রোগীর চাপ বেড়ে যায়। আর ৪২৪ নম্বর ওয়ার্ডে কর্তব্যরত নার্স আশা রানী বলেন, এই ওয়ার্ডে ৩০টা বেড আছে, রোগী আছে ৪২ জন। তিনি জানান, শিশুরা আসছে হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, জ্বর নিয়ে। এখানে গত রাত ২টা থেকে আজ (রবিবার) দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ১৪ জন হামের রোগী ভর্তি হয়েছে। বেড কম থাকায় আমরা এক বিছানায় দুই থেকে তিন জন করে রেখে চিকিৎসা দিচ্ছি।

৪২১ নম্বর ওয়ার্ডের ৪২-৪৩ নম্বর বিছানায় হামে আক্রান্ত পাঁচ সন্তান নিয়ে ভর্তি বাঞ্ছারামপুরের লিলি বেগম। হামে আক্রান্ত ১০ মাসের তাহিরা আছে ৩৭ নম্বর বেডে। তারা বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছে। বরিশালে চিকিৎসক জানিয়েছেন, এসব এলার্জি। আক্রান্ত শিশুর মা বকুল জানান, আমার দেবরের পরামর্শে আমি ঢাকায় আসি। এখানে আসার পর জানতে পারি বাচ্চার হাম হয়েছে। এরপর ডায়রিয়া শুরু হয়, এখন আবার নিউমোনিয়া ধরা পড়েছে। একটার পর একটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে, এখন জ্বর আছে।

মেডিক্যালে এই নারীর তিন সন্তান হামে আক্রান্ত। আর বড় দুজন এখন সুস্থ আছে। শিশুদের সামাল দিতে গিয়ে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। প্রথমে তার ১০ বছর বয়সি বড় ছেলে আলামিন হামে আক্রান্ত হয়। তাকে নিয়ে বাঞ্ছারামপুরের একটি হাসপাতালে গেলে সেখানে বিছুটা সুস্থ হলে তারা বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। বাড়িতে যাওয়ার পর আবার বাচ্চা অসুস্থ হয়, ওইবার আবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে নিতেই আরেক জন অসুস্থ হয়। দুই হাসপাতালে চিকিৎসা নেই ২০ দিন।

এত রোগীর চাপ কীভাবে সামাল দিচ্ছেন, জানতে চাইলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীন বলেন, কষ্ট করে সামাল দিচ্ছি, ন্যাশনাল ক্রাইসেস—সামাল তো দিতেই হবে। আমাদের দেশে জনগণের তুলনায় হাসপাতালে সিট সংখ্যা যেহেতু কম, সে কারণে এক বেডে দুজন-তিন জন করে রোগী রাখা যাচ্ছে। এটা ছোট শিশুর জন্যেই কেবল সম্ভব হচ্ছে। পিআইসিইউ প্রসঙ্গে পরিচালক জানান, আমরা শুরু থেকে হামের সাড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ রোগীর চিকিৎসা দিয়েছি এ পর্যন্ত। কিন্তু এর মধ্যে নিশ্চিত হামে এক জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আমাদের পিআইসিইউ এর মধ্যে চালু হবে। চিকিৎসক ও নার্স ম্যানেজ হলেই পিআইসিইউ চালু হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, হামের এই পরিস্থিতিটাকে উচিত ছিল মহামারি ঘোষণা করা। যেখানে ২০ হাজারের ওপরে আক্রান্ত রোগী, ২০০-এর ওপরে মৃত্যু—সেটা কখনোই হাল্কা করে দেখা উচিত হচ্ছে না এবং এটা একটা মারাত্মক কিছু।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে আমরা বহু জরুরি অবস্থা মোকাবিলা করি। তখন সেখানে কী হয়—একটা প্ল্যান থাকে, একটা বাজেট থাকে, অর্থ বরাদ্দ থাকে, তার সঙ্গে নানা ধরনের ব্যবস্থা থাকে। এই যে ২০ হাজারের ওপরে রোগী, তাদের যে আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি তার তো একটা গাইডলাইন থাকা উচিত। কারণ সবাই একরকম চিকিৎসা দিতে পারবে না। আমাদের এখানে খুব ভালো প্রবীণ চিকিৎসক আছেন, খুব নবীন চিকিত্সকও আছেন—যাদের এ সম্বন্ধে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। একটা গাইডলাইন দরকার ছিল, কিন্তু সেটা হলো না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৬০৩ জন। পাশাপাশি সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ৩২ হাজার ২৮ জন। এছাড়া হাম সন্দেহে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ২১ হাজার ৪৩৪ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ১৭ হাজার ৯৫৫ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। গতকাল রবিবার বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।