গ্যাস সরবরাহে গতি: আবাসিক-শিল্পে কমেছে ভোগান্তি
***চার দিনে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে ২৬১ মিলিয়ন ঘনফুট
***স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন প্রায় অপরিবর্তিত, বাড়তি সরবরাহের মূল উৎস এলএনজি
***গ্যাসের চাপ বাড়ায় আবাসিক ও সিএনজি খাতে কমেছে ভোগান্তি
***শিল্পে ফিরছে উৎপাদনের গতি, তবে সংকট পুরোপুরি কাটেনি
কয়েক দিনের ব্যবধানে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ায় রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার কাজে যেমন স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে, তেমনি সিএনজি স্টেশন ও শিল্পকারখানাতেও কমেছে সরবরাহ ঘিরে ভোগান্তি। কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ আগের তুলনায় বাড়ায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা কিংবা বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতার প্রয়োজনও কিছুটা কমেছে।
তবে এই স্বস্তি এখনো পুরোপুরি স্থায়ী নয়। চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহে ঘাটতি থাকায় বিভিন্ন এলাকায় কম চাপ এবং নির্দিষ্ট সময়ে গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ রয়ে গেছে। ফলে সাম্প্রতিক সরবরাহ বৃদ্ধিকে গ্যাস সংকটের সাময়িক উন্নতি হিসেবে দেখা হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রশ্নটি এখনো সামনে রয়েছে।
চার দিনে বেড়েছে ২৬১ মিলিয়ন ঘনফুট: পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চার দিনের ব্যবধানে দেশে গ্যাসের মোট সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ২৬১ মিলিয়ন ঘনফুট। এ সময়ে স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনে বড় কোনো পরিবর্তন না এলেও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
১৩-১৪ সেপ্টেম্বর ২৪ ঘণ্টায় দেশে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন ও রিগ্যাসিফায়েড এলএনজি (আরএলএনজি) মিলিয়ে মোট সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৩৪৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট। পরদিন অর্থাৎ ১৪-১৫ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৪৭৮ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুটে। ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহ আরও বেড়ে হয় ২ হাজার ৬০৪ মিলিয়ন ঘনফুট। সর্বশেষ ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর তা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০৬ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুটে।
অর্থাৎ ১৩-১৪ সেপ্টেম্বরের তুলনায় ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর দৈনিক গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে ২৬০ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ১১ দশমিক ১ শতাংশ।
তথ্য বলছে, এই বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে এলএনজি থেকে। ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর আরএলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ ছিল ৭৩১ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ১৪-১৫ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ৮৫৮ দশমিক ৪ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়ায়। ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহ হয় ৯৮২ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর তা দাঁড়ায় ৯৮২ দশমিক ৯ মিলিয়ন ঘনফুটে।
চার দিনের ব্যবধানে এলএনজি থেকে সরবরাহ বেড়েছে ২৫১ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ যে পরিমাণ বেড়েছে, তার প্রায় ৯৬ শতাংশই এসেছে এলএনজি থেকে।
আবাসিকে ফিরছে স্বস্তি, কমেছে সিএনজি স্টেশনের অপেক্ষা: সাম্প্রতিক সরবরাহ বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত দেখা যাচ্ছে আবাসিক পর্যায়ে। কয়েক দিন আগেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় একটি সময় গ্যাস না থাকার অভিযোগ ছিল। কোথাও রান্নার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা করতে হয়েছে, আবার কোথাও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে দৈনন্দিন রান্নার কাজ চালাতে হয়েছে।
বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে এবং তুলনামূলক ভালো চাপ থাকায় রান্নার কাজ আগের চেয়ে সহজ হচ্ছে। দীর্ঘ সময় গ্যাস না থাকার কারণে যে বাড়তি ভোগান্তি তৈরি হয়েছিল, সরবরাহ বাড়ায় তা কিছুটা কমেছে।
সিএনজি খাতেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সংকটের সময় অনেক সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছিল। গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে চালকদের। সরবরাহ বাড়ার ফলে বর্তমানে অনেক স্টেশনে অপেক্ষার সময় আগের তুলনায় কমেছে। কোথাও কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষার পরিবর্তে এক ঘণ্টা বা তারও কম সময়ে গ্যাস নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এর ফলে সিএনজি অটোরিকশাচালকদের সময়ের অপচয় কিছুটা কমেছে। দীর্ঘ লাইনে আটকে থাকার কারণে যে সময়টুকু কর্মঘণ্টা থেকে বাদ যাচ্ছিল, সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতিতে তারও কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।
শিল্পে বাড়ছে উৎপাদনের গতি: গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার কারণে শিল্প খাতের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর ডাইং, ওয়াশিংসহ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে এর প্রভাব ছিল বেশি। উৎপাদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে গ্যাসের চাপ প্রয়োজন অনুযায়ী না থাকায় কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ বাড়ায় শিল্পকারখানাগুলোতেও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। উৎপাদন কার্যক্রম আগের তুলনায় স্বাভাবিক গতিতে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। গ্যাসের চাপ বাড়ার ফলে উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং কারখানার কার্যক্রম চালু রাখার ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা হচ্ছে।
তবে শিল্প খাতে স্বস্তি ফিরলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক বলা যাচ্ছে না। কারণ গ্যাসের সরবরাহ কতটা স্থিতিশীল থাকবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাম্প্রতিক সরবরাহ বৃদ্ধির বড় অংশ এলএনজিনির্ভর হওয়ায় আমদানি করা জ্বালানির সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতির ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে।
স্থানীয় উৎপাদন প্রায় স্থির, বাড়তি গ্যাস আসছে এলএনজি থেকে: পেট্রোবাংলার তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির মূল উৎস স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র নয়। ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৬১৩ দশমিক ৭ মিলিয়ন ঘনফুট। ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬২৩ দশমিক ২ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ চার দিনে স্থানীয় উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট।
অন্যদিকে একই সময়ে এলএনজি থেকে সরবরাহ বেড়েছে ২৫১ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে সাম্প্রতিক গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধিতে এলএনজির ওপর নির্ভরতা কতটা, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দেশের মোট গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহের সক্ষমতা ৩ হাজার ৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর সরবরাহ হয়েছে ২ হাজার ৬০৬ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ মোট সক্ষমতার প্রায় ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে। চার দিন আগে ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর এই হার ছিল ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ।
গ্যাস সরবরাহের সাম্প্রতিক চিত্রে তাই একদিকে যেমন স্বস্তির বার্তা রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত। স্থানীয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে চাহিদা পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িকভাবে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় উৎসের অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় আবাসিক, সিএনজি ও শিল্প খাতে যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ভোগান্তি কমিয়েছে। কিন্তু এই স্বস্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে শুধু আমদানিনির্ভর সরবরাহ বাড়ানো নয়, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে। কারণ চাহিদা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে সাময়িক সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে সংকট সামাল দেওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা কঠিন হবে।




















