Dhaka ০৮:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমী আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক
8 / 100 SEO Score

 

মণ্ডপে মণ্ডপে বাজছে ঢাক-কাঁসরের বাদ্য, চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ফুল, ধূপ ও আগরবাতির সুবাস। শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে আনন্দের জোয়ারে ভেসেছে সারাদেশের পূজামণ্ডপগুলো। ষষ্ঠীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে শনিবার ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিন মহাসপ্তমী। বিশুদ্ধ মন্ত্রোচ্চারণ ও দেবী দর্শনে সকাল থেকেই মণ্ডপগুলোতে ঢল নেমেছে ভক্তদের।

দেবীর কাছে ভক্তদের আকুল প্রার্থনা- শান্তি, সংহতি, শক্তি ও বিশ্ব কল্যাণের। তবে মহাসপ্তমীর গভীর তাৎপর্য কেবল ধর্মীয় আচারের সীমানায় আবদ্ধ নয়, এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো অশুভের বিরুদ্ধে মানবীয় শুভবোধের জাগরণ, প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং সাম্য ও সম্প্রীতির সমাজ গঠন।

মহাসপ্তমীর অন্যতম প্রধান ও আকর্ষণীয় অঙ্গ ‘নবপত্রিকা’ বা সাধারণ ভাষায় ‘কলাবউ’ স্থাপন। কলাগাছের সঙ্গে কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ একত্রে বেঁধে স্নান করানোর পর নতুন শাড়িতে ভূষিত করে মণ্ডপে স্থাপন করা হয়।

নবপত্রিকার এই নয়টি উদ্ভিদ মূলতঃ ব্রহ্মাণী, কালিকা, উমা থেকে শুরু করে দেবীর নয়টি মহাশক্তির প্রতীক। দুর্গাপূজার মূল কেন্দ্রে দেবী প্রতিমা থাকলেও মহাসপ্তমীতে সরাসরি উদ্ভিদকে পূজার অংশ বানিয়ে মূলত প্রকৃতির প্রতি মানুষের পরম কৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করা হয়।

কারণ, এসব উদ্ভিদ মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা, কৃষি ও বেঁচে থাকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। তবে সচেতন মহলের মতে, কেবল আচার পালনে প্রকৃতি পূজা সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনে গাছপালা সংরক্ষণ, জলাশয় দূষণমুক্ত রাখা এবং পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগী হওয়াই নবপত্রিকার আসল বার্তা।

সপ্তমীর অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ আচার হলো দেবীর ‘মহাস্নান’। দর্পণে দেবীমূর্তির প্রতিফলন ঘটিয়ে গঙ্গা জল, দুধ, মধু ও সুগন্ধি উপাচারে দেবীকে স্নান করানো হয়, যা বাহ্যিক ও আত্মিক শুদ্ধতার প্রতীক। এ স্নান মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অন্যের অধিকার হরণ, অহংকার, বৈষম্য বা হিংসা পুষে রেখে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় নীতি-নৈতিকতার পূর্ণতা আসে না। সমাজে দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মাধ্যমেই ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রকৃত সামাজিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

পৌরাণিক কথনে মহিষাসুর বধের ঘটনাটি শুভ ও অশুভ শক্তির চিরন্তন সংঘাত নির্দেশ করে। দেবী দুর্গার দশ হাত ও দশ অস্ত্র মূলত অন্যায়কে প্রতিরোধ করে ন্যায় প্রতিষ্ঠার শক্তিকে নির্দেশ করে। দেবীর পাশে থাকা লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ- যথাক্রমে সমৃদ্ধি, জ্ঞান, বীরত্ব ও বুদ্ধির প্রতিনিধিত্ব করেন।

রূপক অর্থে জ্ঞান ছাড়া সমৃদ্ধি অন্ধ, সাহস ছাড়া ন্যায় অসম্ভব এবং বুদ্ধি ছাড়া শক্তির সঠিক ব্যবহার অসম্ভব।

বাঙালির ঘরোয়া সংস্কৃতিতে দেবীর এই আগমন শুধু ঈশ্বর আরাধনা নয়, বরং পিতৃগৃহে কন্যাসন্তানের ফিরে আসার গভীর পারিবারিক অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। পাশাপাশি, প্রতিমাশিল্পী, মৃৎশিল্পী, ঢাকি, আলোকসজ্জাকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের শ্রমে এই উৎসব রূপ নেয় এক বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক মিলনমেলায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মহাসপ্তমীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা। উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন প্রতিটি নাগরিক কোনো ধরনের ভয় ছাড়া নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারেন।

ঢাকিদের ঢাকের বাদ্য একসময় থেমে যাবে, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, প্রকৃতির প্রতি যত্ন এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা যেন নাগরিক আচরণে সদা জাগ্রত থাকে, এটাই মহাসপ্তমীর মূল অঙ্গীকার।

 

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

20 − 9 =

About Author Information

দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমী আজ

Update Time : ০৬:১৯:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
8 / 100 SEO Score

 

মণ্ডপে মণ্ডপে বাজছে ঢাক-কাঁসরের বাদ্য, চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ফুল, ধূপ ও আগরবাতির সুবাস। শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে আনন্দের জোয়ারে ভেসেছে সারাদেশের পূজামণ্ডপগুলো। ষষ্ঠীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে শনিবার ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিন মহাসপ্তমী। বিশুদ্ধ মন্ত্রোচ্চারণ ও দেবী দর্শনে সকাল থেকেই মণ্ডপগুলোতে ঢল নেমেছে ভক্তদের।

দেবীর কাছে ভক্তদের আকুল প্রার্থনা- শান্তি, সংহতি, শক্তি ও বিশ্ব কল্যাণের। তবে মহাসপ্তমীর গভীর তাৎপর্য কেবল ধর্মীয় আচারের সীমানায় আবদ্ধ নয়, এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো অশুভের বিরুদ্ধে মানবীয় শুভবোধের জাগরণ, প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং সাম্য ও সম্প্রীতির সমাজ গঠন।

মহাসপ্তমীর অন্যতম প্রধান ও আকর্ষণীয় অঙ্গ ‘নবপত্রিকা’ বা সাধারণ ভাষায় ‘কলাবউ’ স্থাপন। কলাগাছের সঙ্গে কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ একত্রে বেঁধে স্নান করানোর পর নতুন শাড়িতে ভূষিত করে মণ্ডপে স্থাপন করা হয়।

নবপত্রিকার এই নয়টি উদ্ভিদ মূলতঃ ব্রহ্মাণী, কালিকা, উমা থেকে শুরু করে দেবীর নয়টি মহাশক্তির প্রতীক। দুর্গাপূজার মূল কেন্দ্রে দেবী প্রতিমা থাকলেও মহাসপ্তমীতে সরাসরি উদ্ভিদকে পূজার অংশ বানিয়ে মূলত প্রকৃতির প্রতি মানুষের পরম কৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করা হয়।

কারণ, এসব উদ্ভিদ মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা, কৃষি ও বেঁচে থাকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। তবে সচেতন মহলের মতে, কেবল আচার পালনে প্রকৃতি পূজা সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনে গাছপালা সংরক্ষণ, জলাশয় দূষণমুক্ত রাখা এবং পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগী হওয়াই নবপত্রিকার আসল বার্তা।

সপ্তমীর অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ আচার হলো দেবীর ‘মহাস্নান’। দর্পণে দেবীমূর্তির প্রতিফলন ঘটিয়ে গঙ্গা জল, দুধ, মধু ও সুগন্ধি উপাচারে দেবীকে স্নান করানো হয়, যা বাহ্যিক ও আত্মিক শুদ্ধতার প্রতীক। এ স্নান মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অন্যের অধিকার হরণ, অহংকার, বৈষম্য বা হিংসা পুষে রেখে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় নীতি-নৈতিকতার পূর্ণতা আসে না। সমাজে দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মাধ্যমেই ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রকৃত সামাজিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

পৌরাণিক কথনে মহিষাসুর বধের ঘটনাটি শুভ ও অশুভ শক্তির চিরন্তন সংঘাত নির্দেশ করে। দেবী দুর্গার দশ হাত ও দশ অস্ত্র মূলত অন্যায়কে প্রতিরোধ করে ন্যায় প্রতিষ্ঠার শক্তিকে নির্দেশ করে। দেবীর পাশে থাকা লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ- যথাক্রমে সমৃদ্ধি, জ্ঞান, বীরত্ব ও বুদ্ধির প্রতিনিধিত্ব করেন।

রূপক অর্থে জ্ঞান ছাড়া সমৃদ্ধি অন্ধ, সাহস ছাড়া ন্যায় অসম্ভব এবং বুদ্ধি ছাড়া শক্তির সঠিক ব্যবহার অসম্ভব।

বাঙালির ঘরোয়া সংস্কৃতিতে দেবীর এই আগমন শুধু ঈশ্বর আরাধনা নয়, বরং পিতৃগৃহে কন্যাসন্তানের ফিরে আসার গভীর পারিবারিক অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। পাশাপাশি, প্রতিমাশিল্পী, মৃৎশিল্পী, ঢাকি, আলোকসজ্জাকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের শ্রমে এই উৎসব রূপ নেয় এক বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক মিলনমেলায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মহাসপ্তমীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা। উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন প্রতিটি নাগরিক কোনো ধরনের ভয় ছাড়া নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারেন।

ঢাকিদের ঢাকের বাদ্য একসময় থেমে যাবে, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, প্রকৃতির প্রতি যত্ন এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা যেন নাগরিক আচরণে সদা জাগ্রত থাকে, এটাই মহাসপ্তমীর মূল অঙ্গীকার।