Dhaka ০৫:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে প্রথমবার শনাক্ত হলো নতুন প্রজাতির ঝিঁঝিঁ পোকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
10 / 100 SEO Score

 

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ‘ডান্ডুবিয়া অ্যানানডালেই বুলার্ড’ নামের সিকাডা বা ঝিঁঝিঁ পোকার একটি প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন বাংলাদেশ, চীন ও ভারতের গবেষকেরা। মাঠপর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ, গঠনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ ও পরিবেশগত তথ্য পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রজাতিটির পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে।

গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর খান এবং চীনের নর্থওয়েস্ট এ অ্যান্ড এফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কং ওয়েই। মাঠপর্যায়ে তথ্য ও নমুনা সংগ্রহ এবং পোকা শনাক্তকরণে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ভারতীয় গবেষক বাবু সাদ্দাম ও বাকৃবির স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী শাহমত জাওয়াদ। গবেষণাপত্রটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘ইনসেক্টস’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণার জন্য ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঠ জরিপ চালিয়ে মোট ৬৩টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এসব নমুনা বাকৃবির কীটতত্ত্ব বিভাগের জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একটি রাস্তার বাতির নিচ থেকে একটি স্ত্রী ঝিঁঝিঁ পোকার নমুনাও সংগ্রহ করা হয়।

জরিপে আম, লিচু, ড্রাগন ফল, পেয়ারা, আনারস, কলা, কাঁঠাল, লেবু ও কমলাসহ বিভিন্ন ফলের বাগানে প্রজাতিটির উপস্থিতি পাওয়া যায়। পাশাপাশি শাল, বাঁশ, সেগুন, জারুলসহ বিভিন্ন গাছ ও ঝোপঝাড়ে পূর্ণবয়স্ক ঝিঁঝিঁ পোকা এবং এদের পরিত্যক্ত খোলস শনাক্ত করেন গবেষকরা।

গঠনগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘ডান্ডুবিয়া অ্যানানডালেই’ সাধারণত ঘাসের মতো সবুজ রঙের হয়ে থাকে। জীবিত অবস্থায় সবুজ থাকলেও শুকিয়ে গেলে এটি বাদামি রং ধারণ করে। বাহ্যিকভাবে ‘ডান্ডুবিয়া টার্পসিকোর’ প্রজাতির সঙ্গে সাদৃশ্য থাকলেও পুরুষ পোকার দেহের বিশেষ গঠন প্রজাতিটি শনাক্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

এর আগে বাংলাদেশে ‘ডান্ডুবিয়া’ গণের কেবল ‘ডান্ডুবিয়া এনসিফেরা’ প্রজাতির উপস্থিতি নথিভুক্ত ছিল। এবার ‘ডান্ডুবিয়া অ্যানানডালেই’ শনাক্ত হওয়ায় দেশের ঝিঁঝিঁ পোকার বৈচিত্র্যের তালিকায় যুক্ত হলো আরও একটি প্রজাতি।

ঝিঁঝিঁ পোকাটির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিস্তৃতি নির্ণয়ে ‘ম্যাক্সএন্ট’ নামের প্রজাতির বিস্তৃতি নির্ধারণকারী মডেল ব্যবহার করেছেন বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর খান। এতে সংগৃহীত উপস্থিতির তথ্যের পাশাপাশি বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, ভূমির উচ্চতা ও অন্যান্য পরিবেশগত উপাদান বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য উপযোগী আবাসস্থল চিহ্নিত করা হয়েছে।

ফলাফলে দেখা গেছে, প্রজাতিটির বিস্তৃতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে বৃষ্টিপাত। বিশেষত বছরের উষ্ণ সময়ে বৃষ্টিপাতের তারতম্য এর বসবাসের উপযোগী এলাকার পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এছাড়া ভূমির উচ্চতা ও তাপমাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

গবেষকদের হিসাবে, বর্তমানে গবেষণার আওতাভুক্ত প্রায় ৮ লাখ ৬১ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রজাতিটির বসবাসের উপযোগী। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ বর্গকিলোমিটার অত্যন্ত উপযোগী এবং ১ লাখ ৭৯ হাজার বর্গকিলোমিটার মাঝারি উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা তুলনামূলক কম বাড়লে ২০৬০ সালের মধ্যে প্রজাতিটির উপযোগী আবাসস্থল প্রায় ১৭ লাখ ৫২ হাজার বর্গকিলোমিটারে পৌঁছাতে পারে। শতাব্দীর শেষ নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৯ লাখ ৪০ হাজার বর্গকিলোমিটারে।

অন্যদিকে বৈশ্বিক উষ্ণতা অনেক বেশি বাড়লে শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে উপযোগী আবাসস্থল সাময়িকভাবে সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে তা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে ২১০০ সালের মধ্যে প্রায় ২৬ লাখ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটারে পৌঁছাতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে পোকামাকড়ের ভৌগোলিক বিস্তৃতিও বদলে যেতে পারে। তবে ‘ম্যাক্সএন্ট’ মডেলে দেখানো আবাসস্থলের সম্প্রসারণ সম্ভাব্য পরিবেশগত উপযোগিতার পূর্বাভাস মাত্র। এটি বাস্তবে ঝিঁঝিঁ পোকার বিস্তার কিংবা কৃষিতে ক্ষয়ক্ষতির নিশ্চিত চিত্র নয়।

ঝিঁঝিঁ পোকা অপরিণত অবস্থায় মূলত উদ্ভিদের জাইলেম বা পানি ও খনিজ পদার্থ পরিবহনকারী কলার রস গ্রহণ করে। বিভিন্ন প্রজাতির ঝিঁঝিঁ পোকা গাছ ও ফসলের ক্ষতি করতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশে নতুন শনাক্ত ‘ডান্ডুবিয়া অ্যানানডালেই’ কৃষিতে বর্তমানে কী মাত্রায় প্রভাব ফেলছে, তা এ গবেষণায় নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে সম্ভাব্য আবাসস্থল বাড়ার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা নিশ্চিতভাবে প্রকাশ করার সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে বাকৃবির কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর খান বলেন, দেশের বিভিন্ন ফলের বাগানে ঝিঁঝিঁ পোকার উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে আম পরিপক্ব হওয়ার সময় গাছের আশপাশে এদের প্রজননকালীন তীব্র শব্দ শোনা যায়। এর মাধ্যমে আমবাগানে ঝিঁঝিঁ পোকার উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

তিনি জানান, দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন ফলের চাষ সম্প্রসারিত হচ্ছে। ম্যাক্সএন্ট মডেল অনুযায়ী এসব অঞ্চলের কিছু এলাকা ঝিঁঝিঁ পোকার সম্ভাব্য বিস্তৃতির আওতায় রয়েছে। তবে সেখানকার বাণিজ্যিক ফলবাগানে পোকাটি কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলের উৎপাদন ও গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি।

অধ্যাপক মঞ্জুর খান বলেন, শুধু নতুন প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। এর বিস্তৃতি, জীবনচক্র, খাদ্যাভ্যাস ও কৃষিতে সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করাও জরুরি। পোকাটি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর প্রমাণিত হলে কার্যকর ব্যবস্থাপনা কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সম্ভাব্য কৃষিঝুঁকি মূল্যায়নে দীর্ঘমেয়াদি মাঠপর্যায়ের গবেষণা অপরিহার্য। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলের বাণিজ্যিক ফলবাগানে প্রজাতিটির উপস্থিতি, ক্ষতির মাত্রা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নির্ধারণে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।

গবেষকদের মতে, সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যাপ্ত গবেষণা সহায়তা পেলে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রজাতিটির পরিবেশগত বিস্তৃতি এবং কৃষিতে প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। এতে ভবিষ্যতে কোনো অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি চিহ্নিত হলে সময়োপযোগী ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে।

 

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

seven + eleven =

About Author Information

দেশে প্রথমবার শনাক্ত হলো নতুন প্রজাতির ঝিঁঝিঁ পোকা

Update Time : ০৬:৩৪:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
10 / 100 SEO Score

 

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ‘ডান্ডুবিয়া অ্যানানডালেই বুলার্ড’ নামের সিকাডা বা ঝিঁঝিঁ পোকার একটি প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন বাংলাদেশ, চীন ও ভারতের গবেষকেরা। মাঠপর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ, গঠনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ ও পরিবেশগত তথ্য পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রজাতিটির পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে।

গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর খান এবং চীনের নর্থওয়েস্ট এ অ্যান্ড এফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কং ওয়েই। মাঠপর্যায়ে তথ্য ও নমুনা সংগ্রহ এবং পোকা শনাক্তকরণে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ভারতীয় গবেষক বাবু সাদ্দাম ও বাকৃবির স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী শাহমত জাওয়াদ। গবেষণাপত্রটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘ইনসেক্টস’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণার জন্য ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঠ জরিপ চালিয়ে মোট ৬৩টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এসব নমুনা বাকৃবির কীটতত্ত্ব বিভাগের জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একটি রাস্তার বাতির নিচ থেকে একটি স্ত্রী ঝিঁঝিঁ পোকার নমুনাও সংগ্রহ করা হয়।

জরিপে আম, লিচু, ড্রাগন ফল, পেয়ারা, আনারস, কলা, কাঁঠাল, লেবু ও কমলাসহ বিভিন্ন ফলের বাগানে প্রজাতিটির উপস্থিতি পাওয়া যায়। পাশাপাশি শাল, বাঁশ, সেগুন, জারুলসহ বিভিন্ন গাছ ও ঝোপঝাড়ে পূর্ণবয়স্ক ঝিঁঝিঁ পোকা এবং এদের পরিত্যক্ত খোলস শনাক্ত করেন গবেষকরা।

গঠনগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘ডান্ডুবিয়া অ্যানানডালেই’ সাধারণত ঘাসের মতো সবুজ রঙের হয়ে থাকে। জীবিত অবস্থায় সবুজ থাকলেও শুকিয়ে গেলে এটি বাদামি রং ধারণ করে। বাহ্যিকভাবে ‘ডান্ডুবিয়া টার্পসিকোর’ প্রজাতির সঙ্গে সাদৃশ্য থাকলেও পুরুষ পোকার দেহের বিশেষ গঠন প্রজাতিটি শনাক্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

এর আগে বাংলাদেশে ‘ডান্ডুবিয়া’ গণের কেবল ‘ডান্ডুবিয়া এনসিফেরা’ প্রজাতির উপস্থিতি নথিভুক্ত ছিল। এবার ‘ডান্ডুবিয়া অ্যানানডালেই’ শনাক্ত হওয়ায় দেশের ঝিঁঝিঁ পোকার বৈচিত্র্যের তালিকায় যুক্ত হলো আরও একটি প্রজাতি।

ঝিঁঝিঁ পোকাটির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিস্তৃতি নির্ণয়ে ‘ম্যাক্সএন্ট’ নামের প্রজাতির বিস্তৃতি নির্ধারণকারী মডেল ব্যবহার করেছেন বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর খান। এতে সংগৃহীত উপস্থিতির তথ্যের পাশাপাশি বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, ভূমির উচ্চতা ও অন্যান্য পরিবেশগত উপাদান বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য উপযোগী আবাসস্থল চিহ্নিত করা হয়েছে।

ফলাফলে দেখা গেছে, প্রজাতিটির বিস্তৃতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে বৃষ্টিপাত। বিশেষত বছরের উষ্ণ সময়ে বৃষ্টিপাতের তারতম্য এর বসবাসের উপযোগী এলাকার পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এছাড়া ভূমির উচ্চতা ও তাপমাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

গবেষকদের হিসাবে, বর্তমানে গবেষণার আওতাভুক্ত প্রায় ৮ লাখ ৬১ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রজাতিটির বসবাসের উপযোগী। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ বর্গকিলোমিটার অত্যন্ত উপযোগী এবং ১ লাখ ৭৯ হাজার বর্গকিলোমিটার মাঝারি উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা তুলনামূলক কম বাড়লে ২০৬০ সালের মধ্যে প্রজাতিটির উপযোগী আবাসস্থল প্রায় ১৭ লাখ ৫২ হাজার বর্গকিলোমিটারে পৌঁছাতে পারে। শতাব্দীর শেষ নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৯ লাখ ৪০ হাজার বর্গকিলোমিটারে।

অন্যদিকে বৈশ্বিক উষ্ণতা অনেক বেশি বাড়লে শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে উপযোগী আবাসস্থল সাময়িকভাবে সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে তা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে ২১০০ সালের মধ্যে প্রায় ২৬ লাখ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটারে পৌঁছাতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে পোকামাকড়ের ভৌগোলিক বিস্তৃতিও বদলে যেতে পারে। তবে ‘ম্যাক্সএন্ট’ মডেলে দেখানো আবাসস্থলের সম্প্রসারণ সম্ভাব্য পরিবেশগত উপযোগিতার পূর্বাভাস মাত্র। এটি বাস্তবে ঝিঁঝিঁ পোকার বিস্তার কিংবা কৃষিতে ক্ষয়ক্ষতির নিশ্চিত চিত্র নয়।

ঝিঁঝিঁ পোকা অপরিণত অবস্থায় মূলত উদ্ভিদের জাইলেম বা পানি ও খনিজ পদার্থ পরিবহনকারী কলার রস গ্রহণ করে। বিভিন্ন প্রজাতির ঝিঁঝিঁ পোকা গাছ ও ফসলের ক্ষতি করতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশে নতুন শনাক্ত ‘ডান্ডুবিয়া অ্যানানডালেই’ কৃষিতে বর্তমানে কী মাত্রায় প্রভাব ফেলছে, তা এ গবেষণায় নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে সম্ভাব্য আবাসস্থল বাড়ার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা নিশ্চিতভাবে প্রকাশ করার সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে বাকৃবির কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর খান বলেন, দেশের বিভিন্ন ফলের বাগানে ঝিঁঝিঁ পোকার উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে আম পরিপক্ব হওয়ার সময় গাছের আশপাশে এদের প্রজননকালীন তীব্র শব্দ শোনা যায়। এর মাধ্যমে আমবাগানে ঝিঁঝিঁ পোকার উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

তিনি জানান, দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন ফলের চাষ সম্প্রসারিত হচ্ছে। ম্যাক্সএন্ট মডেল অনুযায়ী এসব অঞ্চলের কিছু এলাকা ঝিঁঝিঁ পোকার সম্ভাব্য বিস্তৃতির আওতায় রয়েছে। তবে সেখানকার বাণিজ্যিক ফলবাগানে পোকাটি কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলের উৎপাদন ও গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি।

অধ্যাপক মঞ্জুর খান বলেন, শুধু নতুন প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। এর বিস্তৃতি, জীবনচক্র, খাদ্যাভ্যাস ও কৃষিতে সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করাও জরুরি। পোকাটি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর প্রমাণিত হলে কার্যকর ব্যবস্থাপনা কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সম্ভাব্য কৃষিঝুঁকি মূল্যায়নে দীর্ঘমেয়াদি মাঠপর্যায়ের গবেষণা অপরিহার্য। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলের বাণিজ্যিক ফলবাগানে প্রজাতিটির উপস্থিতি, ক্ষতির মাত্রা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নির্ধারণে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।

গবেষকদের মতে, সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যাপ্ত গবেষণা সহায়তা পেলে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রজাতিটির পরিবেশগত বিস্তৃতি এবং কৃষিতে প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। এতে ভবিষ্যতে কোনো অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি চিহ্নিত হলে সময়োপযোগী ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে।