Dhaka ০৭:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানি ড্রোন ঠেকাতে ওড়াতে হচ্ছে যুদ্ধবিমান, ব্যয় সামলাতে হিমশিম

12 / 100 SEO Score

চলমান ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় এক অদ্ভুত লড়াই চলছে। একদিকে উড়ছে ইরানের তৈরি সস্তা ও ধীরগতির ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোন, অন্যদিকে সেগুলো ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হচ্ছে কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের অত্যাধুনিক সব পশ্চিমা যুদ্ধবিমান।

বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ অনেকটা ‘মশা মারতে কামান দাগানো’র মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষক ও পেন্টাগনের সাবেক উপদেষ্টা লরেন কানের মতে, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান দিয়ে ড্রোনের ঝাঁক প্রতিহত করা দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এর পেছনে মূল কারণ হলো আকাশচুম্বী খরচ ও ড্রোন-যুদ্ধবিমানের মধ্যকার অসম আর্থিক সমীকরণ।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) তথ্য অনুযায়ী, ইরানের একেকটি ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোনের দাম ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার। অথচ মাত্র একটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এক ঘণ্টা আকাশে ওড়াতেই খরচ হয় ২৫ হাজার ডলারের বেশি। ড্রোন ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত ‘এআইএম-৯এক্স সাইডউইন্ডার’ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিটির দাম প্রায় ৪ লাখ ৮৫ হাজার ডলার এবং ‘এআইএম-১২০ অ্যামরাম’ ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ১০ লাখ ডলার ছাড়িয়ে যায়।

প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ফ্লাই গ্রুপ’-এর নির্বাহী আনাতোলি খ্রাপচিনস্কি সতর্ক করে বলেছেন, শত্রু যদি শত শত সস্তা ড্রোন ছোড়ে আর তা ধ্বংস করতে লাখ লাখ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়, তবে এই প্রতিরক্ষা মডেল দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করবে না।

কেবল অর্থ নয়, ড্রোন মোকাবিলায় যুদ্ধবিমানের সার্বক্ষণিক ব্যবহার বিমানবাহিনীর সক্ষমতাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। স্টিমসন সেন্টারের গবেষক কেলি গ্রিকো জানান, ড্রোনের গতি যুদ্ধবিমানের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় পাইলটদের জন্য লক্ষ্যবস্তু নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা কঠিন হয়। এছাড়া একটানা উড্ডয়নের ফলে বিমানগুলোর দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন পড়ছে এবং বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

মূলত উপসাগরীয় দেশগুলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকিকে বেশি প্রাধান্য দিলেও ড্রোনের মতো ধীরগতির ও নিচ দিয়ে ওড়া ছোট লক্ষ্যবস্তুর মোকাবিলায় তারা কিছুটা অপ্রস্তুত ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান প্রায় তিন হাজার ড্রোন ছুড়েছে যার বড় অংশই উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার চেষ্টা করেছে। এই বিশাল খরচ কমাতে এখন নতুন কিছু বিকল্প নিয়ে ভাবছে মিত্র দেশগুলো। ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এমন লেজার প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা ভাবছে, যাতে প্রতিটি ড্রোন ধ্বংসের খরচ হবে প্রায় ‘শূন্য’।

এছাড়া হেলিকপ্টার ও স্বল্পপাল্লার ভারী গুলির ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইউক্রেনের তৈরি ১০ হাজার ইন্টারসেপ্টর ড্রোন এই অঞ্চলে পাঠিয়েছে যাতে সস্তা ড্রোন দিয়েই শত্রু ড্রোন প্রতিহত করা যায়। তবে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল ড্রোন ঠেকিয়ে এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা সম্ভব নয়; তেহরানের ড্রোনের মজুত ও উৎক্ষেপণ সক্ষমতা কমিয়ে আনাই হবে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান।

 

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ইরানি ড্রোন ঠেকাতে ওড়াতে হচ্ছে যুদ্ধবিমান, ব্যয় সামলাতে হিমশিম

Update Time : ০৬:০১:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬
12 / 100 SEO Score

চলমান ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় এক অদ্ভুত লড়াই চলছে। একদিকে উড়ছে ইরানের তৈরি সস্তা ও ধীরগতির ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোন, অন্যদিকে সেগুলো ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হচ্ছে কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের অত্যাধুনিক সব পশ্চিমা যুদ্ধবিমান।

বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ অনেকটা ‘মশা মারতে কামান দাগানো’র মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষক ও পেন্টাগনের সাবেক উপদেষ্টা লরেন কানের মতে, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান দিয়ে ড্রোনের ঝাঁক প্রতিহত করা দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এর পেছনে মূল কারণ হলো আকাশচুম্বী খরচ ও ড্রোন-যুদ্ধবিমানের মধ্যকার অসম আর্থিক সমীকরণ।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) তথ্য অনুযায়ী, ইরানের একেকটি ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোনের দাম ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার। অথচ মাত্র একটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এক ঘণ্টা আকাশে ওড়াতেই খরচ হয় ২৫ হাজার ডলারের বেশি। ড্রোন ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত ‘এআইএম-৯এক্স সাইডউইন্ডার’ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিটির দাম প্রায় ৪ লাখ ৮৫ হাজার ডলার এবং ‘এআইএম-১২০ অ্যামরাম’ ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ১০ লাখ ডলার ছাড়িয়ে যায়।

প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ফ্লাই গ্রুপ’-এর নির্বাহী আনাতোলি খ্রাপচিনস্কি সতর্ক করে বলেছেন, শত্রু যদি শত শত সস্তা ড্রোন ছোড়ে আর তা ধ্বংস করতে লাখ লাখ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়, তবে এই প্রতিরক্ষা মডেল দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করবে না।

কেবল অর্থ নয়, ড্রোন মোকাবিলায় যুদ্ধবিমানের সার্বক্ষণিক ব্যবহার বিমানবাহিনীর সক্ষমতাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। স্টিমসন সেন্টারের গবেষক কেলি গ্রিকো জানান, ড্রোনের গতি যুদ্ধবিমানের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় পাইলটদের জন্য লক্ষ্যবস্তু নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা কঠিন হয়। এছাড়া একটানা উড্ডয়নের ফলে বিমানগুলোর দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন পড়ছে এবং বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

মূলত উপসাগরীয় দেশগুলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকিকে বেশি প্রাধান্য দিলেও ড্রোনের মতো ধীরগতির ও নিচ দিয়ে ওড়া ছোট লক্ষ্যবস্তুর মোকাবিলায় তারা কিছুটা অপ্রস্তুত ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান প্রায় তিন হাজার ড্রোন ছুড়েছে যার বড় অংশই উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার চেষ্টা করেছে। এই বিশাল খরচ কমাতে এখন নতুন কিছু বিকল্প নিয়ে ভাবছে মিত্র দেশগুলো। ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এমন লেজার প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা ভাবছে, যাতে প্রতিটি ড্রোন ধ্বংসের খরচ হবে প্রায় ‘শূন্য’।

এছাড়া হেলিকপ্টার ও স্বল্পপাল্লার ভারী গুলির ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইউক্রেনের তৈরি ১০ হাজার ইন্টারসেপ্টর ড্রোন এই অঞ্চলে পাঠিয়েছে যাতে সস্তা ড্রোন দিয়েই শত্রু ড্রোন প্রতিহত করা যায়। তবে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল ড্রোন ঠেকিয়ে এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা সম্ভব নয়; তেহরানের ড্রোনের মজুত ও উৎক্ষেপণ সক্ষমতা কমিয়ে আনাই হবে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান।