জ্বালানি সংকটে ভরসা সোলার পাম্প
তীব্র জ্বালানি সংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের মধ্যে চুয়াডাঙ্গার কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার নাম হয়ে উঠেছে সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ পাম্প। ডিজেলনির্ভরতা ও বিদ্যুৎ সংকটের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এ প্রযুক্তি এখন মাঠ পর্যায়ে কার্যকর সমাধান দিচ্ছে। ফলে বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ নিয়ে অনিশ্চয়তা কমেছে। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে এসেছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাঠজুড়ে সবুজ বোরো ধানের আবাদ এখন প্রায় পরিপূর্ণ। কৃষকরা বলছেন, ধান রক্ষা করতে নিয়মিত সেচ অপরিহার্য হলেও চলমান ডিজেল সংকট তাদের চাপে ফেলেছিল। ঠিক সেসময়েই সৌরচালিত সেচ পাম্প হয়ে ওঠে নির্ভরতার জায়গা। সূর্যের আলো থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে পানি তোলায় জ্বালানি সংকট বা লোডশেডিং কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চুয়াডাঙ্গায় মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৯৪ হাজার ৪২০ হেক্টর। চলতি বোরো মৌসুমে ৩৫ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমিতে আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা অতিক্রম করে ৩৫ হাজার ২৩৯ হেক্টর জমিতে চাষ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ধানক্ষেতে শীষ এসেছে। এক মাসের মধ্যেই ফসল ঘরে তোলার আশা করছেন কৃষকরা।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) চুয়াডাঙ্গা জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ৫১টি সৌরচালিত সেচ পাম্পের মাধ্যমে তিন হাজার ৬ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি সংস্থা ওয়েভ ফাউন্ডেশন জেলার চার উপজেলায় মোট ৫৪টি সৌর সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদরে ১৫টি, আলমডাঙ্গায় তিনটি, দামুড়হুদায় পাঁচটি এবং জীবননগরে ৩১টি। এসব প্রকল্পের আওতায় প্রায় ছয় হাজার হেক্টর জমিতে সেচ কার্যক্রম চলছে।
সংস্থাটি জানায়, সৌরচালিত সেচ পাম্পের কারণে চুয়াডাঙ্গাসহ আশপাশের চার জেলায় তাদের মোট ১২৮টি প্রকল্পে প্রায় চার হাজার ৫০০ কৃষক সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে ডিজেলচালিত সেচে এক বিঘা জমিতে বোরো চাষে শুধু সেচ বাবদ খরচ হতো প্রায় ছয় হাজার টাকা। বর্তমানে সেই খরচ সোলার পাম্প ব্যবহারে কমে প্রায় তিন হাজার টাকায় নেমে এসেছে। একইভাবে ভুট্টা চাষে সেচ খরচ হচ্ছে এক হাজার ৬০০ টাকা। এতে উৎপাদন ব্যয় কমে যাওয়ায় কৃষকের লাভের সম্ভাবনাও বাড়ছে।
‘এক বিঘা জমিতে বোরো ধান উৎপাদনে খরচ হয় ১৫-১৬ হাজার টাকা। সেখানে প্রতি বিঘায় ধান উৎপাদন হয় গড়ে ২৩-২৫ মণ। কিন্তু ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিনে সেচ দিলে শুধু সেচ খরচ পড়ে প্রায় ছয় হাজার। কিন্তু সোলার পাম্প ব্যবহারে সেই খরচ অর্ধেকে নেমে এসেছে। খরচ পড়ছে তিন হাজার টাকার মতো। শুধু ধান নয়, ভুট্টা উৎপাদনেও খরচ কমেছে’
বোরো ধানের জন্য নিয়মিত সেচ প্রয়োজন হয়। ধানের গোড়ায় প্রায় সবসময় পানি রাখতে হয়। একদিন পরপর সেচ দিতে হয়। কিন্তু এখন ডিজেল সংটের কারণে সেচ দিতে বেগ পেতে হচ্ছে কৃষকদের। এ সমস্যা সমাধানে সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ পাম্প কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলে জানান কৃষকরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক বিঘা জমিতে বোরো ধান উৎপাদনে খরচ হয় ১৫-১৬ হাজার টাকা। সেখানে প্রতি বিঘায় ধান উৎপাদন হয় গড়ে ২৩-২৫ মণ। কিন্তু ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিনে সেচ দিলে শুধু সেচ খরচ পড়ে প্রায় ছয় হাজার। কিন্তু সোলার পাম্প ব্যবহারে সেই খরচ অর্ধেকে নেমে এসেছে। খরচ পড়ছে তিন হাজার টাকার মতো। শুধু ধান নয়, ভুট্টা উৎপাদনেও খরচ কমেছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার শৈলগাড়ি গ্রামের কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, ‘ডিজেল সংকটে আগে সেচ দেওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। এখন সোলার পাম্পে সহজে সেচ দিতে পারছি। খরচ অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। ফলনও ভালো হচ্ছে।’
‘সোলার পাম্পে সেচ দিতে সময় কম লাগে, আবার তেলেরও দরকার হয় না। আমাদের মাঠে প্রায় ১২০ বিঘা জমিতে এই পাম্পে সেচ দেওয়া হচ্ছে। এতে ভোগান্তি নেই। কাজও দ্রুত হচ্ছে’—কৃষক
সদর উপজেলার মোমিনপুর গ্রামের কৃষক শাহিন আলী বলেন, ‘সোলার পাম্পে সেচ দিতে সময় কম লাগে, আবার তেলেরও দরকার হয় না। আমাদের মাঠে প্রায় ১২০ বিঘা জমিতে এই পাম্পে সেচ দেওয়া হচ্ছে। এতে ভোগান্তি নেই। কাজও দ্রুত হচ্ছে।’
একই এলাকার কৃষক রোকন হোসেন বলেন, ‘আগে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হতো। তেল না পেলে জমিতে পানি দেওয়া যেত না। এখন সেই চিন্তা নেই। সোলার পাম্পে নিয়মিত সেচ দিতে পারছি। ফলে ধানের ফলনও ভালো হচ্ছে।’
বর্তমান জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিং পরিস্থিতিতে সৌরচালিত সেচ পাম্প কৃষকদের জন্য কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠেছে বলে জানান চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার।
তিনি বলেন, ‘এ পদ্ধতিতে সেচ কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে। উৎপাদন খরচও কমছে। কৃষি বিভাগ ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প আরও সম্প্রসারণে কাজ করছে।’



















