সামাজিক নিরাপত্তা খাতে রেকর্ড বরাদ্দের পরিকল্পনা
***ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
***আগামী অর্থবছরে ৩.৬৩ কোটি মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্য
***ভাতা ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ ও উপকারভোগী উভয়ের বৃদ্ধি
***বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য ভাতায় পরিমাণ ও সুবিধা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত
দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে আরও বিস্তৃত এবং কার্যকর করার জন্য বড় ধরনের আর্থিক বরাদ্দ ও কাঠামোগত সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা সহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি ও সুবিধা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষের কাছে সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার পরিধি আরও সম্প্রসারিত হবে এবং এটি একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে।
সব মিলিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ১৮টি ভাতা প্রদান ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে চলতি অর্থবছরে মোট ২ কোটি ৬০ লাখ উপকারভোগীর জন্য ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২১ হাজার ৭০১ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এসব কর্মসূচির আওতায় ৩৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকার সুবিধা পাবেন ৩.৬৩ কোটি মানুষ।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৭ মে) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাজেট চূড়ান্তকরণ বিষয়ক এক সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সভায় উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা টিবিএসকে নিশ্চিত করেছেন।
তারা জানান, আগামী অর্থবছরের বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এছাড়া মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানী প্রদান কার্যক্রমে প্রায় ২.৫৬ লাখ উপকারভোগী সুবিধা পাবেন।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ৯.৩০ লাখ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তব্যে বাংলাদেশকে কল্যাণকর রাষ্ট্রে রূপান্তরের রূপরেখা তুলে ধরা হবে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এটি বেড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান টিবিএসকে বলেন, সরকার সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে জীবনচক্রভিত্তিক পদ্ধতি যুক্ত করতে যাচ্ছে, তা ধাপে ধাপে সার্বজনীন কাভারেজে রূপ নেবে। তবে শুরুতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে। কারণ প্রাথমিকভাবে যে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হচ্ছে, সেখানে প্রায় ১৮ শতাংশ উপকারভোগী রয়েছে যারা প্রকৃতভাবে এই সুবিধার যোগ্য নন। এতে সরকারের লক্ষ্য নির্ধারণের দক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে রূপান্তরের জন্য জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও এ বিষয়ে অঙ্গীকার রয়েছে। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায় না হলে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড: অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে ফ্যামিলি কার্ডের উপকারভোগীর সংখ্যা ৪১ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই কর্মসূচি চালু করা হয়।
ফ্যামিলি কার্ডধারীরা প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। আগামী অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ থাকছে ১২ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ৮০ হাজার ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার ব্যয় হবে ৭২.৯৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় চলতি অর্থবছরে ২,০৬৭ জন কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে ৪২.৫০ লাখ কৃষককে এই কার্ড দেওয়া হবে। প্রতিটি কার্ডধারী কৃষক বছরে ২,৫০০ টাকা সহায়তা পাবেন, যার মোট ব্যয় হবে ১,০৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
বর্তমান সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো খাল খনন কর্মসূচি। চলতি অর্থবছরে ২৬.৬৭ লাখ মানুষ এই কর্মসূচির আওতায় রয়েছে, আগামী অর্থবছরে এটি বাড়িয়ে ৩৪.০২ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ব্যয় হবে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা।
বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা: আগামী বাজেটে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগী সংখ্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বিশেষ করে ৯০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য অতিরিক্ত ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে ৬১ লাখ বয়স্ক ব্যক্তি মাসে ৬৫০ টাকা করে ভাতা পান। আগামী অর্থবছরে এটি ৬২ লাখে উন্নীত হবে এবং ৯০ বছরের নিচে বয়সীদের ভাতা ৭০০ টাকা করা হবে, আর ৯০ বছরের বেশি বয়সীরা পাবেন ১,০০০ টাকা।
বিধবা ভাতা কর্মসূচিতে বর্তমানে ২৯ লাখ নারী উপকারভোগী রয়েছে, যা আগামী বছরও অপরিবর্তিত থাকবে। তবে ৯০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ১,০০০ টাকা ভাতা দেওয়া হবে।
প্রতিবন্ধী ভাতা কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা ৩৬ লাখে উন্নীত করা হচ্ছে এবং ৯০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ১,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।



















