Dhaka ০৯:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্যাশলেস লেনদেনে পাঁচ বছরে বড় অগ্রগতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
6 / 100 SEO Score

 

****প্রিপেইড কার্ডে ১৬৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, বদলাচ্ছে কার্ড ব্যবহারের ধরন
****ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেই ক্রেডিট কার্ডের অর্ধেকের বেশি লেনদেন
***বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যয় ৯৮৫ কোটি, যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ
***ডিজিটাল অবকাঠামো ও সাইবার নিরাপত্তায় রয়ে গেছে বড় চ্যালেঞ্জ

নগদ টাকার পাশাপাশি বিকল্প লেনদেনব্যবস্থা হিসেবে কার্ডের ব্যবহার দেশে দ্রুত বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ১০৮ শতাংশ। একই সময়ে কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৯৭ শতাংশ। সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ হয়েছে প্রিপেইড কার্ডে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে এ ধরনের কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ১৬৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের আগস্টে দেশে মোট কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৬৫ লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৯টি। চলতি বছরের জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৯৭টিতে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে কার্ডের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে কার্ডের মাধ্যমে মাসিক লেনদেন ২২ হাজার ৭৮৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৪৭ হাজার ৪৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে।

কার্ডের সংখ্যা ও লেনদেনের পরিমাণ দুই ক্ষেত্রেই এই প্রবৃদ্ধি দেশের লেনদেন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কেনাকাটা, বিল পরিশোধ, পরিবহন, সরকারি সেবা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক লেনদেনেও কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে নগদ অর্থের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেনের পরিধিও বিস্তৃত হচ্ছে।

প্রিপেইড কার্ডে সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার: কার্ডের ধরনভেদে প্রবৃদ্ধির চিত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৩৬ শতাংশ। ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ২৮ শতাংশ। বিপরীতে প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ১৬৮ শতাংশ।

অর্থাৎ প্রচলিত ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের তুলনায় প্রিপেইড কার্ডের বিস্তার হয়েছে অনেক দ্রুত। কার্ডভিত্তিক লেনদেনের সামগ্রিক সম্প্রসারণে এই প্রবৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশে কার্ডের মোট সংখ্যা পাঁচ বছরে ২ কোটি ৬৫ লাখ থেকে ৫ কোটি ২৪ লাখে পৌঁছানোও লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে কার্ডের বিস্তারের বিষয়টি স্পষ্ট করে। তবে কার্ডের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি এর কার্যকর ব্যবহার কতটা বাড়ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। মাসিক লেনদেনের পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি হওয়ার তথ্য বলছে, কার্ড শুধু ইস্যু হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর মাধ্যমে লেনদেনও বাড়ছে।

এক বছরে ক্রেডিট কার্ডে ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি: সাম্প্রতিক সময়ের পরিসংখ্যানেও কার্ড ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন বেড়েছে ৪০ দশমিক ২৪ শতাংশ।

চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৩২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আগের মাস জুনে এ পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। মাসভিত্তিক হিসাবে জুলাইয়ে লেনদেন কিছুটা কমলেও এক বছরের হিসাবে প্রবৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্য।

দেশীয় ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। জুলাইয়ে এ খাতে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা, যা মোট লেনদেনের ৫০ দশমিক ৩১ শতাংশ। খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ৪৮৭ কোটি ৯০ লাখ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধে ৩৭৭ কোটি ১০ লাখ এবং নগদ উত্তোলনে ৩৩৪ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।

এ চিত্রে দেখা যায়, কার্ডের ব্যবহার শুধু পণ্য কেনাকাটায় সীমিত নেই। নিয়মিত বিল পরিশোধের মতো কাজেও কার্ড ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। তবে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে মোট লেনদেনের অর্ধেকের বেশি হওয়ায় ভোক্তা ব্যয়ই এখনো কার্ড ব্যবহারের বড় ক্ষেত্র।

বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড লেনদেন ৯৮৫ কোটি টাকা: দেশের অভ্যন্তরের পাশাপাশি বিদেশেও বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যবহারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। চলতি বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশি কার্ডধারীরা বিদেশে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডে মোট ৯৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা লেনদেন করেছেন। এ সময়ে লেনদেনের সংখ্যা ছিল ১৭ লাখ ৪৪ হাজার ৩০টি।

এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে ৫২৫ কোটি ৯০ লাখ, ডেবিট কার্ডে ৪০১ কোটি ১০ লাখ এবং প্রিপেইড কার্ডে ৫৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। জুনে বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। ফলে এক মাসের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ৫ দশমিক ০৫ শতাংশ।

বিদেশে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। জুলাইয়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এরপর খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র, পরিবহন, ওষুধ ও ফার্মেসি এবং পোশাকের দোকানে উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে।

দেশভিত্তিক হিসাবে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে শীর্ষে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। জুলাইয়ে দেশটিতে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৯৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। থাইল্যান্ডে ৬১ কোটি ৪০ লাখ, যুক্তরাজ্যে ৫৪ কোটি ৪০ লাখ এবং সিঙ্গাপুরে ৩৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।

বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ড লেনদেন ২৩৪ কোটি টাকা: বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ড ব্যবহারের চিত্রও আন্তর্জাতিক লেনদেনের আরেকটি দিক তুলে ধরে। জুলাইয়ে বিদেশে ইস্যু করা কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকেরা মোট ২৩৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা লেনদেন করেছেন। এ সময়ে মোট লেনদেন হয়েছে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৪টি। জুনে এ পরিমাণ ছিল ২৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

বিদেশিদের কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ৮২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। নগদ উত্তোলনে ৫৬ কোটি ৩০ লাখ, পরিবহনে ৩২ কোটি ৩০ লাখ এবং পোশাকের দোকানে ২০ কোটি ৯০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।

দেশভিত্তিক হিসাবে বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ড ব্যবহারে এগিয়ে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ইস্যু করা কার্ডে ৫১ কোটি ৬০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। এরপর ভারত, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও সিঙ্গাপুরে ইস্যু করা কার্ডে উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে।

ভিসা কার্ডে লেনদেন ৩ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা: দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে কার্ড নেটওয়ার্কের ব্যবহারেও বড় পার্থক্য রয়েছে। জুলাইয়ে ভিসা কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৩ হাজার ২৯৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা মোট দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের ৭৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।

একই সময়ে মাস্টারকার্ডে লেনদেন হয়েছে ৬৬৫ কোটি ৯০ লাখ এবং অ্যামেক্সে ৩৪৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ফলে দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে ভিসা কার্ডের ব্যবহার ছিল সবচেয়ে বেশি।

নগদনির্ভরতা কমার ইঙ্গিত: কার্ডের ব্যবহার বাড়াকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কেনাকাটা, বিল পরিশোধ, পরিবহন, সরকারি সেবা ও আন্তর্জাতিক লেনদেনে কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে।

জুলাই পর্যন্ত ৪৮টি ব্যাংক ও একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ডে অনুমোদিত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বকেয়া ঋণের স্থিতি রয়েছে ১৪ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা।

তবে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের বিস্তার সত্ত্বেও ক্যাশলেস লেনদেন পুরোপুরি বিস্তৃত করার পথে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, আর্থিক জ্ঞানের ঘাটতি, সাইবার নিরাপত্তা, প্রতারণা এবং লেনদেন ব্যয় এখনো বড় বাধা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এসব ক্ষেত্রে নিরাপত্তা জোরদার এবং গ্রাহক সচেতনতা বাড়ানো গেলে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের বিস্তার আরও বাড়তে পারে। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান অন্তত দেখাচ্ছে, দেশের লেনদেন ব্যবস্থায় নগদের পাশাপাশি কার্ডের ব্যবহার এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত। কার্ডের সংখ্যা ও লেনদেন দুই ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ক্যাশলেস লেনদেনের দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে।

Tag :

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

5 × 5 =

About Author Information

ক্যাশলেস লেনদেনে পাঁচ বছরে বড় অগ্রগতি

Update Time : ০৩:৫৪:৩২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
6 / 100 SEO Score

 

****প্রিপেইড কার্ডে ১৬৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, বদলাচ্ছে কার্ড ব্যবহারের ধরন
****ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেই ক্রেডিট কার্ডের অর্ধেকের বেশি লেনদেন
***বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যয় ৯৮৫ কোটি, যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ
***ডিজিটাল অবকাঠামো ও সাইবার নিরাপত্তায় রয়ে গেছে বড় চ্যালেঞ্জ

নগদ টাকার পাশাপাশি বিকল্প লেনদেনব্যবস্থা হিসেবে কার্ডের ব্যবহার দেশে দ্রুত বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ১০৮ শতাংশ। একই সময়ে কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৯৭ শতাংশ। সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ হয়েছে প্রিপেইড কার্ডে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে এ ধরনের কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ১৬৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের আগস্টে দেশে মোট কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৬৫ লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৯টি। চলতি বছরের জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৯৭টিতে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে কার্ডের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে কার্ডের মাধ্যমে মাসিক লেনদেন ২২ হাজার ৭৮৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৪৭ হাজার ৪৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে।

কার্ডের সংখ্যা ও লেনদেনের পরিমাণ দুই ক্ষেত্রেই এই প্রবৃদ্ধি দেশের লেনদেন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কেনাকাটা, বিল পরিশোধ, পরিবহন, সরকারি সেবা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক লেনদেনেও কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে নগদ অর্থের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেনের পরিধিও বিস্তৃত হচ্ছে।

প্রিপেইড কার্ডে সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার: কার্ডের ধরনভেদে প্রবৃদ্ধির চিত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৩৬ শতাংশ। ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ২৮ শতাংশ। বিপরীতে প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ১৬৮ শতাংশ।

অর্থাৎ প্রচলিত ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের তুলনায় প্রিপেইড কার্ডের বিস্তার হয়েছে অনেক দ্রুত। কার্ডভিত্তিক লেনদেনের সামগ্রিক সম্প্রসারণে এই প্রবৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশে কার্ডের মোট সংখ্যা পাঁচ বছরে ২ কোটি ৬৫ লাখ থেকে ৫ কোটি ২৪ লাখে পৌঁছানোও লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে কার্ডের বিস্তারের বিষয়টি স্পষ্ট করে। তবে কার্ডের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি এর কার্যকর ব্যবহার কতটা বাড়ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। মাসিক লেনদেনের পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি হওয়ার তথ্য বলছে, কার্ড শুধু ইস্যু হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর মাধ্যমে লেনদেনও বাড়ছে।

এক বছরে ক্রেডিট কার্ডে ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি: সাম্প্রতিক সময়ের পরিসংখ্যানেও কার্ড ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন বেড়েছে ৪০ দশমিক ২৪ শতাংশ।

চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৩২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আগের মাস জুনে এ পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। মাসভিত্তিক হিসাবে জুলাইয়ে লেনদেন কিছুটা কমলেও এক বছরের হিসাবে প্রবৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্য।

দেশীয় ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। জুলাইয়ে এ খাতে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা, যা মোট লেনদেনের ৫০ দশমিক ৩১ শতাংশ। খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ৪৮৭ কোটি ৯০ লাখ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধে ৩৭৭ কোটি ১০ লাখ এবং নগদ উত্তোলনে ৩৩৪ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।

এ চিত্রে দেখা যায়, কার্ডের ব্যবহার শুধু পণ্য কেনাকাটায় সীমিত নেই। নিয়মিত বিল পরিশোধের মতো কাজেও কার্ড ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। তবে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে মোট লেনদেনের অর্ধেকের বেশি হওয়ায় ভোক্তা ব্যয়ই এখনো কার্ড ব্যবহারের বড় ক্ষেত্র।

বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড লেনদেন ৯৮৫ কোটি টাকা: দেশের অভ্যন্তরের পাশাপাশি বিদেশেও বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যবহারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। চলতি বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশি কার্ডধারীরা বিদেশে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডে মোট ৯৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা লেনদেন করেছেন। এ সময়ে লেনদেনের সংখ্যা ছিল ১৭ লাখ ৪৪ হাজার ৩০টি।

এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে ৫২৫ কোটি ৯০ লাখ, ডেবিট কার্ডে ৪০১ কোটি ১০ লাখ এবং প্রিপেইড কার্ডে ৫৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। জুনে বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। ফলে এক মাসের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ৫ দশমিক ০৫ শতাংশ।

বিদেশে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। জুলাইয়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এরপর খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র, পরিবহন, ওষুধ ও ফার্মেসি এবং পোশাকের দোকানে উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে।

দেশভিত্তিক হিসাবে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে শীর্ষে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। জুলাইয়ে দেশটিতে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৯৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। থাইল্যান্ডে ৬১ কোটি ৪০ লাখ, যুক্তরাজ্যে ৫৪ কোটি ৪০ লাখ এবং সিঙ্গাপুরে ৩৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।

বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ড লেনদেন ২৩৪ কোটি টাকা: বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ড ব্যবহারের চিত্রও আন্তর্জাতিক লেনদেনের আরেকটি দিক তুলে ধরে। জুলাইয়ে বিদেশে ইস্যু করা কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকেরা মোট ২৩৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা লেনদেন করেছেন। এ সময়ে মোট লেনদেন হয়েছে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৪টি। জুনে এ পরিমাণ ছিল ২৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

বিদেশিদের কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ৮২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। নগদ উত্তোলনে ৫৬ কোটি ৩০ লাখ, পরিবহনে ৩২ কোটি ৩০ লাখ এবং পোশাকের দোকানে ২০ কোটি ৯০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।

দেশভিত্তিক হিসাবে বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ড ব্যবহারে এগিয়ে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ইস্যু করা কার্ডে ৫১ কোটি ৬০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। এরপর ভারত, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও সিঙ্গাপুরে ইস্যু করা কার্ডে উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে।

ভিসা কার্ডে লেনদেন ৩ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা: দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে কার্ড নেটওয়ার্কের ব্যবহারেও বড় পার্থক্য রয়েছে। জুলাইয়ে ভিসা কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৩ হাজার ২৯৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা মোট দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের ৭৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।

একই সময়ে মাস্টারকার্ডে লেনদেন হয়েছে ৬৬৫ কোটি ৯০ লাখ এবং অ্যামেক্সে ৩৪৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ফলে দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে ভিসা কার্ডের ব্যবহার ছিল সবচেয়ে বেশি।

নগদনির্ভরতা কমার ইঙ্গিত: কার্ডের ব্যবহার বাড়াকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কেনাকাটা, বিল পরিশোধ, পরিবহন, সরকারি সেবা ও আন্তর্জাতিক লেনদেনে কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে।

জুলাই পর্যন্ত ৪৮টি ব্যাংক ও একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ডে অনুমোদিত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বকেয়া ঋণের স্থিতি রয়েছে ১৪ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা।

তবে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের বিস্তার সত্ত্বেও ক্যাশলেস লেনদেন পুরোপুরি বিস্তৃত করার পথে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, আর্থিক জ্ঞানের ঘাটতি, সাইবার নিরাপত্তা, প্রতারণা এবং লেনদেন ব্যয় এখনো বড় বাধা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এসব ক্ষেত্রে নিরাপত্তা জোরদার এবং গ্রাহক সচেতনতা বাড়ানো গেলে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের বিস্তার আরও বাড়তে পারে। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান অন্তত দেখাচ্ছে, দেশের লেনদেন ব্যবস্থায় নগদের পাশাপাশি কার্ডের ব্যবহার এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত। কার্ডের সংখ্যা ও লেনদেন দুই ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ক্যাশলেস লেনদেনের দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে।