Dhaka ০৭:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: সংসার খরচ বাড়ার শঙ্কায় নিম্নআয়ের মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
10 / 100 SEO Score

 

***ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে ১৩৫, পণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচ
***আন্তঃজেলা বাসভাড়া কিলোমিটারে ২০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব, শহরে ১৮ পয়সা
***বেসরকারি আইসিডিতে কনটেইনার পরিবহন ও হ্যান্ডলিং চার্জ বেড়েছে ৯.৮৫ শতাংশ
***কৃষিতে সেচ ও যান্ত্রিক কাজে বাড়ছে ব্যয়, শিল্পেও বাড়ছে উৎপাদন ও লজিস্টিক খরচ

জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে। পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন, কৃষির সেচ, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে বাসভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে, আবার চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোগুলো (আইসিডি) কয়েক ধরনের সেবা ও পরিবহন চার্জ প্রায় ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখন শুধু পাম্পে তেলের দামেই সীমাবদ্ধ নেই; অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

গত সোমবার মধ্যরাত থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে।

ডিজেলের দাম বৃদ্ধিই অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের পরিবহন ব্যবস্থা, কৃষির সেচ ও যান্ত্রিক কৃষিকাজ এবং পণ্য সরবরাহে ডিজেলের ব্যবহার বেশি। ফলে এই জ্বালানির বাড়তি খরচ উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কৃষি অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেচ, যান্ত্রিকভাবে ফসল কাটা ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচও বাড়তে পারে।

পরিবহন থেকে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ: জ্বালানির দাম বাড়ার পরই পরিবহন খাতে এর প্রভাব দৃশ্যমান হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং শহরের বাসে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৪৩ পয়সা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৭৩ পয়সা হতে পারে। তবে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত এই নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার কথা নয়।

এদিকে বেসরকারি আইসিডিগুলো জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব সামলাতে ছয় ধরনের কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও পরিবহন চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। নতুন চার্জ ২১ সেপ্টেম্বর থেকেই কার্যকর হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও পাটেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের সঙ্গে আইসিডিগুলোর পণ্য পরিবহনের ওপর এই বাড়তি ব্যয় পড়বে।

এ ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি পণ্য উৎপাদন বা আমদানির পর তা গুদাম, বন্দর, পাইকারি বাজার ও খুচরা পর্যায়ে পৌঁছাতে একাধিক পরিবহন ধাপ অতিক্রম করে। প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়লে শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্যেও তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

মূল্যস্ফীতির নতুন ঝুঁকি: অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি মূল্যস্ফীতিতে পড়তে পারে। কারণ জ্বালানি শুধু একটি ভোগ্যপণ্য নয়; অর্থনীতির প্রায় সব উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রমের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকার দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক তেল ও জাহাজভাড়া বেড়েছে। নতুন মূল্য সমন্বয়ের ফলে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তবে জ্বালানির দাম যতটা বাড়বে, তার চেয়ে বেশি হারে যাতে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম না বাড়াতে পারেন, সে বিষয়ে নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। কারণ জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি হলে তার চাপ সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়বে।

কৃষিতেও বাড়তে পারে উৎপাদন ব্যয়: ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে কৃষিতে। সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে জ্বালানি ব্যবহারের কারণে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল কৃষিকাজে বাড়তি ব্যয় সরাসরি উৎপাদন খরচে যোগ হতে পারে।

দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে কৃষি বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়ায় সেচ, যান্ত্রিকভাবে ফসল কাটা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়তে পারে। এর ফলে চাল, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়লে এর প্রভাব শুধু কৃষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাজারে পণ্য পরিবহন ও সরবরাহের ব্যয় যুক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়েও চাপ তৈরি হতে পারে।

শিল্প ও রপ্তানিতেও প্রভাবের আশঙ্কা: জ্বালানি ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন খরচ বাড়লে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিল্প ইতিমধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে উৎপাদন চালাচ্ছে, তাদের জন্য বাড়তি জ্বালানি ব্যয় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরীর বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসা সংকোচন ও কর্মসংস্থানের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে। তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

সরকারেরও বড় আর্থিক চাপ: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্য নয়, সরকারি অর্থের ওপর চাপও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে জ্বালানি বিক্রি করলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) বড় লোকসান বহন করতে হয়।

দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের হিসাব অনুযায়ী ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের শুরুতে বিপিসির ব্যবহারযোগ্য কার্যকরী মূলধন ছিল প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা; অক্টোবরের আমদানি পরিশোধ চালিয়ে যেতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে বলে সংস্থাটি জানিয়েছিল।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। সরকারের যুক্তি হলো, মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে লোকসান কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ ও প্রতিবেশী দেশে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকিও কমানো যাবে।

অর্থাৎ সরকারকে এখন দুটি দিক সামলাতে হচ্ছে। একদিকে জ্বালানি খাতে বড় লোকসান ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমানো, অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসার ওপর বাড়তি ব্যয় যেন অতিরিক্ত না পড়ে, তা নিয়ন্ত্রণ করা।

সবচেয়ে বেশি চাপে নিম্নআয়ের মানুষ: জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অর্থনৈতিক অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভূত হতে পারে নিম্ন ও স্থির আয়ের পরিবারে। কারণ তাঁদের আয়ের সঙ্গে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। যাতায়াত খরচ, খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবার ব্যয় একসঙ্গে বাড়লে সংসারের বাজেটে দ্রুত চাপ তৈরি হয়।

একজন উচ্চআয়ের ভোক্তা বাড়তি পরিবহন বা বাজার খরচ কিছুটা সামলাতে পারলেও নিম্নআয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে একই পরিমাণ বাড়তি ব্যয় অন্য কোনো প্রয়োজনীয় খরচ কমানোর কারণ হতে পারে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু মূল্যস্ফীতির একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি পরিবারের ব্যয়ের কাঠামোকেও বদলে দিতে পারে।

সামনে নজরদারিই বড় বিষয়: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর এখন অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর দ্বিতীয় ধাপের প্রভাব কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি ব্যয় কতটা পণ্যের দামে যুক্ত হবে, সেটিই মূল্যস্ফীতির ওপর চাপের মাত্রা নির্ধারণ করবে।

এ অবস্থায় বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো, পরিবহন ভাড়া আইনসম্মতভাবে সমন্বয় করা এবং নিম্নআয়ের মানুষের সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে শিল্প ও কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারলে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের একটি অংশ সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকারের আর্থিক লোকসান কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে এটি এক দিকের বাস্তবতা। অন্যদিকে সেই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যদি পরিবহন, কৃষি, উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের বাজারে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তার বড় অংশের ভার শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বহন করতে হবে। তাই এখন অর্থনীতির মূল চ্যালেঞ্জ শুধু জ্বালানির দাম সমন্বয় নয়; বরং সেই সমন্বয়ের অভিঘাত কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, সেটিও।

 

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

11 − 1 =

About Author Information

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: সংসার খরচ বাড়ার শঙ্কায় নিম্নআয়ের মানুষ

Update Time : ০৬:২৬:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
10 / 100 SEO Score

 

***ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে ১৩৫, পণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচ
***আন্তঃজেলা বাসভাড়া কিলোমিটারে ২০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব, শহরে ১৮ পয়সা
***বেসরকারি আইসিডিতে কনটেইনার পরিবহন ও হ্যান্ডলিং চার্জ বেড়েছে ৯.৮৫ শতাংশ
***কৃষিতে সেচ ও যান্ত্রিক কাজে বাড়ছে ব্যয়, শিল্পেও বাড়ছে উৎপাদন ও লজিস্টিক খরচ

জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে। পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন, কৃষির সেচ, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে বাসভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে, আবার চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোগুলো (আইসিডি) কয়েক ধরনের সেবা ও পরিবহন চার্জ প্রায় ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখন শুধু পাম্পে তেলের দামেই সীমাবদ্ধ নেই; অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

গত সোমবার মধ্যরাত থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে।

ডিজেলের দাম বৃদ্ধিই অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের পরিবহন ব্যবস্থা, কৃষির সেচ ও যান্ত্রিক কৃষিকাজ এবং পণ্য সরবরাহে ডিজেলের ব্যবহার বেশি। ফলে এই জ্বালানির বাড়তি খরচ উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কৃষি অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেচ, যান্ত্রিকভাবে ফসল কাটা ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচও বাড়তে পারে।

পরিবহন থেকে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ: জ্বালানির দাম বাড়ার পরই পরিবহন খাতে এর প্রভাব দৃশ্যমান হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং শহরের বাসে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৪৩ পয়সা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৭৩ পয়সা হতে পারে। তবে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত এই নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার কথা নয়।

এদিকে বেসরকারি আইসিডিগুলো জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব সামলাতে ছয় ধরনের কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও পরিবহন চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। নতুন চার্জ ২১ সেপ্টেম্বর থেকেই কার্যকর হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও পাটেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের সঙ্গে আইসিডিগুলোর পণ্য পরিবহনের ওপর এই বাড়তি ব্যয় পড়বে।

এ ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি পণ্য উৎপাদন বা আমদানির পর তা গুদাম, বন্দর, পাইকারি বাজার ও খুচরা পর্যায়ে পৌঁছাতে একাধিক পরিবহন ধাপ অতিক্রম করে। প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়লে শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্যেও তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

মূল্যস্ফীতির নতুন ঝুঁকি: অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি মূল্যস্ফীতিতে পড়তে পারে। কারণ জ্বালানি শুধু একটি ভোগ্যপণ্য নয়; অর্থনীতির প্রায় সব উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রমের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকার দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক তেল ও জাহাজভাড়া বেড়েছে। নতুন মূল্য সমন্বয়ের ফলে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তবে জ্বালানির দাম যতটা বাড়বে, তার চেয়ে বেশি হারে যাতে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম না বাড়াতে পারেন, সে বিষয়ে নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। কারণ জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি হলে তার চাপ সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়বে।

কৃষিতেও বাড়তে পারে উৎপাদন ব্যয়: ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে কৃষিতে। সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে জ্বালানি ব্যবহারের কারণে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল কৃষিকাজে বাড়তি ব্যয় সরাসরি উৎপাদন খরচে যোগ হতে পারে।

দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে কৃষি বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়ায় সেচ, যান্ত্রিকভাবে ফসল কাটা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়তে পারে। এর ফলে চাল, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়লে এর প্রভাব শুধু কৃষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাজারে পণ্য পরিবহন ও সরবরাহের ব্যয় যুক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়েও চাপ তৈরি হতে পারে।

শিল্প ও রপ্তানিতেও প্রভাবের আশঙ্কা: জ্বালানি ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন খরচ বাড়লে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিল্প ইতিমধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে উৎপাদন চালাচ্ছে, তাদের জন্য বাড়তি জ্বালানি ব্যয় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরীর বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসা সংকোচন ও কর্মসংস্থানের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে। তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

সরকারেরও বড় আর্থিক চাপ: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্য নয়, সরকারি অর্থের ওপর চাপও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে জ্বালানি বিক্রি করলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) বড় লোকসান বহন করতে হয়।

দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের হিসাব অনুযায়ী ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের শুরুতে বিপিসির ব্যবহারযোগ্য কার্যকরী মূলধন ছিল প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা; অক্টোবরের আমদানি পরিশোধ চালিয়ে যেতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে বলে সংস্থাটি জানিয়েছিল।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। সরকারের যুক্তি হলো, মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে লোকসান কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ ও প্রতিবেশী দেশে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকিও কমানো যাবে।

অর্থাৎ সরকারকে এখন দুটি দিক সামলাতে হচ্ছে। একদিকে জ্বালানি খাতে বড় লোকসান ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমানো, অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসার ওপর বাড়তি ব্যয় যেন অতিরিক্ত না পড়ে, তা নিয়ন্ত্রণ করা।

সবচেয়ে বেশি চাপে নিম্নআয়ের মানুষ: জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অর্থনৈতিক অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভূত হতে পারে নিম্ন ও স্থির আয়ের পরিবারে। কারণ তাঁদের আয়ের সঙ্গে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। যাতায়াত খরচ, খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবার ব্যয় একসঙ্গে বাড়লে সংসারের বাজেটে দ্রুত চাপ তৈরি হয়।

একজন উচ্চআয়ের ভোক্তা বাড়তি পরিবহন বা বাজার খরচ কিছুটা সামলাতে পারলেও নিম্নআয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে একই পরিমাণ বাড়তি ব্যয় অন্য কোনো প্রয়োজনীয় খরচ কমানোর কারণ হতে পারে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু মূল্যস্ফীতির একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি পরিবারের ব্যয়ের কাঠামোকেও বদলে দিতে পারে।

সামনে নজরদারিই বড় বিষয়: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর এখন অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর দ্বিতীয় ধাপের প্রভাব কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি ব্যয় কতটা পণ্যের দামে যুক্ত হবে, সেটিই মূল্যস্ফীতির ওপর চাপের মাত্রা নির্ধারণ করবে।

এ অবস্থায় বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো, পরিবহন ভাড়া আইনসম্মতভাবে সমন্বয় করা এবং নিম্নআয়ের মানুষের সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে শিল্প ও কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারলে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের একটি অংশ সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকারের আর্থিক লোকসান কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে এটি এক দিকের বাস্তবতা। অন্যদিকে সেই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যদি পরিবহন, কৃষি, উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের বাজারে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তার বড় অংশের ভার শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বহন করতে হবে। তাই এখন অর্থনীতির মূল চ্যালেঞ্জ শুধু জ্বালানির দাম সমন্বয় নয়; বরং সেই সমন্বয়ের অভিঘাত কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, সেটিও।