জ্বালানি তেল সংকটের প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্যে
জ্বালানি তেলের সংকটের প্রভাব ধীরে ধীরে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পণ্য উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। এতে করে বাজারে অনেক পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা পড়ছেন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত এই সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে সামনের দিনগুলোতে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। দেশেও জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় বেশি পরিমাণে তেল কিনতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জমছে ভিড়। এ অবস্থায় গত ৬ মার্চ ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দিয়ে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
ফলে অনেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না। আবার বেঁধে দেওয়া পরিমাণ পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে চলে যাচ্ছে অনেকটা সময়। যথাসময়ে পণ্য ডেলিভারি দিতে পারছে না কোম্পানিগুলো। মহাখালী এলাকার একটি পেট্রোল পাম্পে অপেক্ষমাণ ডেলিভারি ড্রাইভার রাকিব বলেন, ‘আমি বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখন সন্ধ্যা ৭টা বাজে। এখনো ফুয়েল পাইনি। মনে হচ্ছে আমার সিরিয়াল পেতে আরও অন্তত এক ঘণ্টা সময় লাগবে।’
তিনি জানান, শহরের বিভিন্ন স্থানে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেন তিনি। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে ফুয়েলের জন্য কিউতে দাঁড়িয়ে থাকায় তার কাজের সময়সূচি ব্যাহত হচ্ছে।
‘আমার রাজধানীর বাইরে যাওয়ার কথা ছিল পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার জন্য। কিন্তু এখনো লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে সময়মতো ডেলিভারি দেওয়া আমাদের জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়বে’, যোগ করেন তিনি।
‘বর্তমান তেল সংকট আমাদের সাপ্লাই চেইনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। পণ্য পরিবহন ও ডিস্ট্রিবিউশনের জন্য পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় ডেলিভারি এবং বিতরণ ব্যাহত হচ্ছে।’ এ মন্তব্য করেন প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল।সরাসরি উৎপাদন খরচ এখনো বাড়েনি, কিন্তু যেহেতু রিসোর্স সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না এবং কর্মীরা অপেক্ষায় থাকছেন, তাই শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ও ডেলিভারির খরচ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কামাল বলেন, ‘এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে, সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন কেবল সময়ের ক্ষতি নয়, বরং খরচেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্যবসার খরচ বাড়ার শঙ্কার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ট্রান্সপোর্ট না পাওয়ার অভিযোগও করছেন ব্যবসায়ীরা। দেশের অন্যতম পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, ‘নিজস্ব পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা কোনোভাবে চালিয়ে নেওয়া গেলেও বাড়তি পরিবহন ভাড়া করতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে। চাহিদামতো কার্গো বা ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না, ভাড়া বেশি নিচ্ছে। এতে পণ্য বিপণন খরচ বাড়ছে।
প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিফস অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান বলেন, ‘ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ১০ হাজার টাকার ট্রাক ভাড়া নির্বাচনের পরে ১৯ হাজার টাকা হলো। আর গতকাল সেই ট্রাক ৩০ হাজার টাকায় ভাড়া করেছি। অন্যদিকে, আমাদের নিজস্ব কারখানায় গাড়িগুলোর জন্য দিনে কমপক্ষে ৩০০ লিটার ডিজেল লাগে, সেখানে গতকাল ১০০ লিটার পেয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের কারণে পরিবহন খাতে অস্থিরতার প্রভাব আমাদের দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’
জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জেনারেটর চালাতে প্রয়োজনীয় তেল না পাওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন ক্ষতির মুখে পড়েছে বলেও জানিয়েছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।
তারা জানান, যদি চলমান তেলের সংকট দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত থাকে, তবে তা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুতর বিঘ্ন ঘটাতে পারে। পরিবহন ও বিতরণ ব্যবস্থা মূলত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানির ঘাটতি বা দামের অস্থিরতা দেখা দিলে খাদ্যপণ্য, দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বাজারে পণ্যের ঘাটতি, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ার মতো ঘটনা ঘটে।
এই পরিস্থিতিতে সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। জ্বালানির স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং পণ্যের বিতরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সরকার, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও পরিবহন খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে চালু রাখা যায়।
আগামী সপ্তাহে ঈদ উৎসব সামনে রেখে এ বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই সময়ে সাধারণত খাদ্যপণ্য, পোশাকসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো বিঘ্ন ঘটলে মানুষ উৎসবের প্রস্তুতিতে বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। তাই এই চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ ও কার্যকর সমাধান বের করার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে জোর দাবি জানানো হচ্ছে।
কতটুকু তেল পাচ্ছেন গাড়িপ্রতি: বিপিসির নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি মোটরসাইকেলে দিনে ২ লিটার পেট্রোল বা অকটেন নেওয়া যাবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল। এসইউভি/জিপ/মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার, পিকআপ/লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার, দূরপাল্লার বাস/ট্রাক/কার্ভাডভ্যান/কনটেইনার ট্রাকে ২০০ থেকে ২২০ লিটার জ্বালানি তেল নেওয়া যাবে।
বিপিসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দেশের ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যবস্থাপনা মাঝেমধ্যে বাধাগ্রস্ত/বিলম্বিত হয়। চলমান বৈশ্বিক সংকট পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গণমাধ্যম/সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার হওয়ায় ভোক্তা/গ্রাহকদের মধ্যে অতিরিক্ত চাহিদার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অতিরিক্ত চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ডিলাররা বিগত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল ডিপো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।




















