বদলে যাচ্ছে ডাক বিভাগের সেবা: চিঠির গণ্ডি পেরিয়ে যাচ্ছে ভারী পণ্যও
***প্রথম কেজিতে ১০ টাকা, কম খরচে পণ্য পাঠানোর সুযোগ
***২৪ থেকে ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য পৌঁছানোর লক্ষ্য
***ই-ভ্যান ও নতুন হাব, সক্ষমতা বাড়াচ্ছে ডাক বিভাগ
একসময় ডাক বিভাগের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে উঠত চিঠি, পোস্টকার্ড কিংবা ছোটখাটো পার্সেলের ছবি। সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের প্রয়োজন, বদলেছে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের ধরন। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবার চিঠি-পত্রের প্রচলিত সীমানা ছাড়িয়ে ভারী ও বড় আকারের পণ্য পরিবহনের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ।
ফ্রিজ, মোটরসাইকেল, আলমারি, ওয়ারড্রব, টেলিভিশন কিংবা এয়ার কন্ডিশনারের মতো তুলনামূলক বড় পণ্যও এখন ডাক বিভাগের স্পিড পোস্ট সেবার মাধ্যমে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠানো যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চালুর পর গত দুই মাসেই এই সেবার মাধ্যমে প্রায় ৪০০ টন পণ্য পরিবহন হয়েছে।
ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রচলিত আইনে নিষিদ্ধ নয়—এমন বিভিন্ন ধরনের পণ্য নির্ধারিত নিয়ম মেনে স্পিড পোস্টের মাধ্যমে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন বড় পণ্যও এরই মধ্যে পরিবহন করা হয়েছে।
শুধু গৃহস্থালির পণ্য নয়, দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা সামগ্রীও যুক্ত হচ্ছে এই সেবায়। শিক্ষার্থীদের কাঁথা-বালিশ ও বিছানাপত্র থেকে শুরু করে রান্নাঘরের বিভিন্ন সামগ্রী, প্রেসার কুকার, ইন্ডাকশন চুলা, বাইসাইকেলসহ নানা পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। এমনকি এলইডি টিভি, এয়ার কন্ডিশনার এবং বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতিও ডাকযোগে পরিবহনের তালিকায় রয়েছে।
স্পিড পোস্ট সেবার অন্যতম আকর্ষণ এর তুলনামূলক কম মাশুল। বর্তমানে প্রথম কেজির জন্য ১০ টাকা এবং পরবর্তী প্রতিটি কেজির জন্য অতিরিক্ত ৫ টাকা করে মাশুল নেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। ফলে দূরের জেলায় পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও এই সেবাকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছেন।
গ্রাহকদের খরচ সম্পর্কে আগেই ধারণা দিতে অনলাইন মাশুল ক্যালকুলেটর চালু করেছে ডাক বিভাগ। এর মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর আগে সম্ভাব্য পরিবহন খরচ সম্পর্কে জানা যায়। এতে গ্রাহকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ হচ্ছে।
বর্তমানে রাজধানীর জিপিও ছাড়াও গুলশান, বনানী, মিরপুর ও উত্তরাসহ কয়েকটি সাব-পোস্ট অফিস থেকে সরাসরি স্পিড পোস্টের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। দেশের বাইরে পার্সেল পাঠানোর জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বৈদেশিক ইএমএস সেবা চালু রয়েছে।
শুধু পণ্য পরিবহন নয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ডাক বিভাগের নির্ধারিত কার্যপ্রণালি অনুযায়ী, জেলা শহর থেকে ঢাকায় পাঠানো পণ্য সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা, এক জেলা থেকে অন্য জেলায় সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা এবং প্রত্যন্ত বা দুর্গম এলাকায় সর্বোচ্চ ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে বিলির জন্য প্রস্তুত রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সব ধরনের পণ্য এই সেবার আওতায় নেই। বিস্ফোরক বা দাহ্য পদার্থ, বিপজ্জনক রাসায়নিক, মাদকদ্রব্য, জীবন্ত প্রাণী, আগ্নেয়াস্ত্র এবং গ্যাস সিলিন্ডারের মতো পণ্য স্পিড পোস্টের মাধ্যমে পাঠানো নিষিদ্ধ।
ডাক বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, স্পিড পোস্টের জনপ্রিয়তা অনেকটাই তৈরি হয়েছে ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবাটি ব্যবহার করছেন। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ডাক বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি এমন গ্রাহকও পাওয়া গেছে, যিনি এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বাসা পরিবর্তনের সময় পুরো বাসার আসবাবপত্র ডাকযোগে পাঠাতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডাক বিভাগের মাধ্যমে আন্তঃজেলা বাসাবদলের মতো সেবা থাকলেও বাংলাদেশে এটি এখনও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সক্ষমতা ধাপে ধাপে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এই সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। গ্রিন এনার্জিতে পরিচালিত হওয়ার জন্য ইতোমধ্যে ৫০টি বৈদ্যুতিক বাইক সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
স্পিড পোস্টের পাশাপাশি ডাক বিভাগের অভ্যন্তরীণ মেইল ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকার তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মেইল প্রসেসিং সেন্টারকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় আসা মেইল, ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো মেইল এবং ঢাকার অভ্যন্তরের মেইল একই কেন্দ্র থেকে প্রক্রিয়াজাত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে কমলাপুরের রেলওয়ে মেইল সার্ভিসের ওপর চাপ কমাতে ঢাকা জিপিও ক্যাম্পাসকে সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। ভবিষ্যতে বিদেশ থেকে আসা এবং বিদেশে পাঠানো পার্সেল ব্যবস্থাপনায় জিপিওকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডাক বিভাগের এই পরিবর্তনের পেছনে মূল লক্ষ্য হিসেবে উঠে আসছে সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য পরিবহনসেবা নিশ্চিত করা। চিঠি আদান-প্রদানের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি এখন মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের পণ্য পরিবহনের অংশীদার হতে চাইছে।
ফলে সময়ের সঙ্গে ডাক বিভাগের পরিচিতিও বদলাচ্ছে। চিঠি ও ছোট পার্সেলের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে ফ্রিজ, মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে ঘরের আসবাব পর্যন্ত পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি হওয়ায় রাষ্ট্রীয় এই সেবায় নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে। ভবিষ্যতে লজিস্টিক সক্ষমতা আরও বাড়ানো গেলে দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনে ডাক বিভাগ আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


















