Dhaka ০৭:০২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

৫০০ বছরের পুরোনো মানচিত্র বদল, বিশ্বকে নতুনভাবে দেখাবে জাতিসংঘ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
4 / 100 SEO Score

 

বিশ্বকে দেখার প্রচলিত মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতিসংঘ। মহাদেশগুলোর প্রকৃত আয়তনের তুলনামূলক চিত্র আরও বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরতে ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন ব্যবহারের পক্ষে ভোট দিয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। নতুন মানচিত্রে আফ্রিকা তুলনামূলকভাবে বড় এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা আগের চেয়ে ছোট দেখাবে।

শুক্রবারের (৪ সেপ্টম্বর) ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৬৪টি দেশ। বিপক্ষে ভোট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আরও ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।

জাতিসংঘের প্রস্তাবে সদস্য দেশগুলোকে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ‘মারকেটর প্রজেকশন’-এর পরিবর্তে ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। ১৫৬৯ সালে ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর সমুদ্রপথে নৌ চলাচল সহজ করার উদ্দেশ্যে যে মানচিত্র তৈরি করেছিলেন, সেটিই বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত বিশ্ব মানচিত্রের অন্যতম ভিত্তি।

নতুন উদ্যোগের অন্যতম উদ্যোক্তা টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসি বলেন, মানচিত্র শুধু ভৌগোলিক তথ্য উপস্থাপন করে না; মানুষের শিক্ষা, কল্পনা এবং পৃথিবী সম্পর্কে সামষ্টিক ধারণা তৈরিতেও এর প্রভাব রয়েছে।

তার ভাষ্য, মানচিত্র পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। পৃথিবীর কোনো বিকৃত চিত্র দীর্ঘদিন প্রচলিত থাকলে তা মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে এবং সেই ধারণা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে যেতে পারে।

তবে জাতিসংঘের এ উদ্যোগে আপত্তি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ভোটের আগে মার্কিন প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচ সমালোচনা করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সমস্যায় মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে জাতিসংঘ ১৬ শতকের একটি মানচিত্র, ক্ষতিপূরণ এবং তথাকথিত ‘কগনিটিভ জাস্টিস’ নিয়ে আলোচনা করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কেন বদলানো হচ্ছে মানচিত্র
মারকেটর প্রজেকশনের বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এতে মহাদেশগুলোর আকৃতি ও কোণ মোটামুটি ঠিক থাকলেও প্রকৃত আয়তনের অনুপাত বজায় থাকে না। গোলাকার পৃথিবীকে সমতল পৃষ্ঠে উপস্থাপন করতে গিয়ে এ ধরনের বিকৃতি তৈরি হয়।

এর প্রভাবে বিষুবীয় অঞ্চলের তুলনায় উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলগুলোকে অনেক বড় দেখায় প্রচলিত মানচিত্র। ফলে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার আয়তন বাস্তবের তুলনায় বেশি মনে হয়। বিপরীতে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা তুলনামূলক ছোট দেখায়।

২০১৮ সালে একদল মানচিত্রবিদ ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন তৈরি করেন। এই পদ্ধতিতে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও ওশেনিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের আয়তনকে বাস্তবের কাছাকাছি রেখে মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে।

মানচিত্রটির অন্যতম নির্মাতা বোয়ান সাভরিচ ২০২৫ সালে এএফপিকে বলেন, ইকুয়াল আর্থ মহাদেশগুলোর পারস্পরিক আয়তনের অনুপাত ধরে রাখে এবং পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠে তাদের প্রকৃত আকৃতি যতটা সম্ভব সঠিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করে।

প্রচলিত মানচিত্র বাদ দিচ্ছে ফ্রান্সও
নতুন প্রজেকশনের পক্ষে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স। শুক্রবার দেশটি জানিয়েছে, তারা আর মারকেটর প্রজেকশন ব্যবহার করবে না।

ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো বলেন, প্রচলিত মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনকে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বড় ও প্রভাবশালী দেখায়। একইভাবে গ্রিনল্যান্ডকেও প্রায় আফ্রিকার সমান বড় বলে মনে হয়।

তার মতে, মানচিত্র পরিবর্তন করলেই পৃথিবী বদলে যাবে না। তবে দীর্ঘদিনের বিকৃত উপস্থাপনাকে সংশোধন করা বাস্তবতাকে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে সাবেক ফরাসি উপনিবেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে ফ্রান্স। ফলে নতুন মানচিত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে দেশটির বৃহত্তর কূটনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গেও সম্পৃক্ত করে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

তথ্যসূত্র: আরব নিউজ

 

Tag :

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

eleven + ten =

About Author Information

৫০০ বছরের পুরোনো মানচিত্র বদল, বিশ্বকে নতুনভাবে দেখাবে জাতিসংঘ

Update Time : ০৭:০২:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
4 / 100 SEO Score

 

বিশ্বকে দেখার প্রচলিত মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতিসংঘ। মহাদেশগুলোর প্রকৃত আয়তনের তুলনামূলক চিত্র আরও বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরতে ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন ব্যবহারের পক্ষে ভোট দিয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। নতুন মানচিত্রে আফ্রিকা তুলনামূলকভাবে বড় এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা আগের চেয়ে ছোট দেখাবে।

শুক্রবারের (৪ সেপ্টম্বর) ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৬৪টি দেশ। বিপক্ষে ভোট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আরও ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।

জাতিসংঘের প্রস্তাবে সদস্য দেশগুলোকে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ‘মারকেটর প্রজেকশন’-এর পরিবর্তে ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। ১৫৬৯ সালে ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর সমুদ্রপথে নৌ চলাচল সহজ করার উদ্দেশ্যে যে মানচিত্র তৈরি করেছিলেন, সেটিই বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত বিশ্ব মানচিত্রের অন্যতম ভিত্তি।

নতুন উদ্যোগের অন্যতম উদ্যোক্তা টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসি বলেন, মানচিত্র শুধু ভৌগোলিক তথ্য উপস্থাপন করে না; মানুষের শিক্ষা, কল্পনা এবং পৃথিবী সম্পর্কে সামষ্টিক ধারণা তৈরিতেও এর প্রভাব রয়েছে।

তার ভাষ্য, মানচিত্র পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। পৃথিবীর কোনো বিকৃত চিত্র দীর্ঘদিন প্রচলিত থাকলে তা মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে এবং সেই ধারণা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে যেতে পারে।

তবে জাতিসংঘের এ উদ্যোগে আপত্তি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ভোটের আগে মার্কিন প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচ সমালোচনা করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সমস্যায় মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে জাতিসংঘ ১৬ শতকের একটি মানচিত্র, ক্ষতিপূরণ এবং তথাকথিত ‘কগনিটিভ জাস্টিস’ নিয়ে আলোচনা করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কেন বদলানো হচ্ছে মানচিত্র
মারকেটর প্রজেকশনের বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এতে মহাদেশগুলোর আকৃতি ও কোণ মোটামুটি ঠিক থাকলেও প্রকৃত আয়তনের অনুপাত বজায় থাকে না। গোলাকার পৃথিবীকে সমতল পৃষ্ঠে উপস্থাপন করতে গিয়ে এ ধরনের বিকৃতি তৈরি হয়।

এর প্রভাবে বিষুবীয় অঞ্চলের তুলনায় উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলগুলোকে অনেক বড় দেখায় প্রচলিত মানচিত্র। ফলে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার আয়তন বাস্তবের তুলনায় বেশি মনে হয়। বিপরীতে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা তুলনামূলক ছোট দেখায়।

২০১৮ সালে একদল মানচিত্রবিদ ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন তৈরি করেন। এই পদ্ধতিতে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও ওশেনিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের আয়তনকে বাস্তবের কাছাকাছি রেখে মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে।

মানচিত্রটির অন্যতম নির্মাতা বোয়ান সাভরিচ ২০২৫ সালে এএফপিকে বলেন, ইকুয়াল আর্থ মহাদেশগুলোর পারস্পরিক আয়তনের অনুপাত ধরে রাখে এবং পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠে তাদের প্রকৃত আকৃতি যতটা সম্ভব সঠিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করে।

প্রচলিত মানচিত্র বাদ দিচ্ছে ফ্রান্সও
নতুন প্রজেকশনের পক্ষে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স। শুক্রবার দেশটি জানিয়েছে, তারা আর মারকেটর প্রজেকশন ব্যবহার করবে না।

ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো বলেন, প্রচলিত মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনকে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বড় ও প্রভাবশালী দেখায়। একইভাবে গ্রিনল্যান্ডকেও প্রায় আফ্রিকার সমান বড় বলে মনে হয়।

তার মতে, মানচিত্র পরিবর্তন করলেই পৃথিবী বদলে যাবে না। তবে দীর্ঘদিনের বিকৃত উপস্থাপনাকে সংশোধন করা বাস্তবতাকে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে সাবেক ফরাসি উপনিবেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে ফ্রান্স। ফলে নতুন মানচিত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে দেশটির বৃহত্তর কূটনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গেও সম্পৃক্ত করে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

তথ্যসূত্র: আরব নিউজ