Dhaka ০৯:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সব হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারি রুম স্থাপন না হলে লাইসেন্স বাতিল

নিজস্ব প্রতিবেদক
4 / 100 SEO Score

 

দেশের সব বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালকে আগামী শনিবারের মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে নরমাল ডেলিভারি অর্থাৎ লেবার রুম স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সোমবার (৬ জুলাই) রাজধানীতে বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

‎স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের একটি শ্রেণী অতিমাত্রায় মুনাফাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। মানুষের কল্যাণ বা দেশের স্বার্থের চেয়ে অর্থ উপার্জনই তাদের প্রধান লক্ষ্য। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

‎তিনি বলেন, একসময় দেশে অধিকাংশ সন্তান জন্ম হতো স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে। গ্রামাঞ্চলে অভিজ্ঞ দাইয়ের সহায়তায় নিরাপদে সন্তান প্রসবের দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। এখন স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ঘটলেও স্বাভাবিক প্রসবের পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের প্রবণতা বেড়েছে।

মন্ত্রী বলেন, গর্ভাবস্থার শুরুতে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অনেক ক্ষেত্রে দালালচক্র ও কিছু চিকিৎসাকেন্দ্র পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন জটিলতার ভয় দেখায়। ‘অপারেশন না করলে মা কিংবা সন্তান বাঁচবে না’ এমন আশঙ্কা তৈরি করে সিজারিয়ানের সিদ্ধান্তে বাধ্য করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই মা ও সন্তানের জীবন নিয়ে ঝুঁকি নিতে না চাওয়ায় পরিবারগুলো চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে নেয়। চিকিৎসকরা মানুষের কাছে আল্লাহর পর সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। তাই চিকিৎসা পেশায় নৈতিকতার বিষয়টি আরও শক্তিশালীভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

‎স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর পুষ্টির বিষয়ে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুর জীবনের শুরু থেকেই যথাযথ পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। অপুষ্টি, অল্প বয়সে বিয়ে এবং মায়েদের দুর্বল স্বাস্থ্য শিশুদের নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অনেক শিশুই চরম অপুষ্টিতে ভুগছে। একই সঙ্গে অনেক মায়ের শরীরেও পর্যাপ্ত পুষ্টি নেই। ফলে নবজাতকের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি এলাকায় দক্ষ মিডওয়াইফের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এটি শুধু কর্মসংস্থানের বিষয় নয়; বরং জাতির স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়। চলতি বছর স্বাস্থ্যখাতে এক লাখ নতুন কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার নারী নিয়োগ দেওয়া হবে এবং তাদের বড় অংশই মিডওয়াইফ হিসেবে কাজ করবেন, যাতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া যায়।

‎একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, আগামী শনিবারের মধ্যে দেশের সব বেসরকারি ক্লিনিকে লেবার রুম স্থাপন করতে হবে। কোনো ক্লিনিক এ নির্দেশনা না মানলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে। সব বেসরকারি ক্লিনিকে মিডওয়াইফ নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে গর্ভবতী নারীরা স্থানীয় পর্যায়ে পরামর্শ পাবেন এবং স্বাভাবিক প্রসবে উৎসাহিত হবেন।

‎তিনি বলেন, ভয়ভীতি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণে মানুষকে বাধ্য করার সংস্কৃতি থেকে দেশকে বের করে আনতে হবে। মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা ছাড়া একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ‎অনুষ্ঠানের শেষদিকে মিডওয়াইফদের সংগঠন গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের সংগঠন মাতৃস্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

‎কর্মশালায় জানানো হয়, ৪০টা নরমাল ডেলিভারি পরে একজন ধাত্রী রেজিষ্ট্রেশন পান। প্রতি বছর মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে ৫৮০০ ধাত্রী দক্ষ হয়ে উঠেন। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে তাদের কাজের সুযোগ না থাকায় এ সকল ধাত্রীদের সিংহভাগই ঝরে পড়েন। এর মধ্যে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে বছরে শুধুমাত্র ৫০০ ধাত্রী কাজ করার সুযোগ পেলেও বাকীরা সাধারণ নার্স হিসাবে কাজ করেন। এতে শিশু জন্মের সময় দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পায়।

কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটির (বিএমএস) সভাপতি রোজিনা খাতুন, সাধারণ সম্পাদক হাসনা আখতার ও বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার হালিমা আখতার প্রমুখ।

 

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

সব হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারি রুম স্থাপন না হলে লাইসেন্স বাতিল

Update Time : ০৮:২৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
4 / 100 SEO Score

 

দেশের সব বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালকে আগামী শনিবারের মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে নরমাল ডেলিভারি অর্থাৎ লেবার রুম স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সোমবার (৬ জুলাই) রাজধানীতে বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

‎স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের একটি শ্রেণী অতিমাত্রায় মুনাফাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। মানুষের কল্যাণ বা দেশের স্বার্থের চেয়ে অর্থ উপার্জনই তাদের প্রধান লক্ষ্য। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

‎তিনি বলেন, একসময় দেশে অধিকাংশ সন্তান জন্ম হতো স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে। গ্রামাঞ্চলে অভিজ্ঞ দাইয়ের সহায়তায় নিরাপদে সন্তান প্রসবের দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। এখন স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ঘটলেও স্বাভাবিক প্রসবের পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের প্রবণতা বেড়েছে।

মন্ত্রী বলেন, গর্ভাবস্থার শুরুতে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অনেক ক্ষেত্রে দালালচক্র ও কিছু চিকিৎসাকেন্দ্র পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন জটিলতার ভয় দেখায়। ‘অপারেশন না করলে মা কিংবা সন্তান বাঁচবে না’ এমন আশঙ্কা তৈরি করে সিজারিয়ানের সিদ্ধান্তে বাধ্য করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই মা ও সন্তানের জীবন নিয়ে ঝুঁকি নিতে না চাওয়ায় পরিবারগুলো চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে নেয়। চিকিৎসকরা মানুষের কাছে আল্লাহর পর সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। তাই চিকিৎসা পেশায় নৈতিকতার বিষয়টি আরও শক্তিশালীভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

‎স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর পুষ্টির বিষয়ে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুর জীবনের শুরু থেকেই যথাযথ পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। অপুষ্টি, অল্প বয়সে বিয়ে এবং মায়েদের দুর্বল স্বাস্থ্য শিশুদের নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অনেক শিশুই চরম অপুষ্টিতে ভুগছে। একই সঙ্গে অনেক মায়ের শরীরেও পর্যাপ্ত পুষ্টি নেই। ফলে নবজাতকের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি এলাকায় দক্ষ মিডওয়াইফের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এটি শুধু কর্মসংস্থানের বিষয় নয়; বরং জাতির স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়। চলতি বছর স্বাস্থ্যখাতে এক লাখ নতুন কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার নারী নিয়োগ দেওয়া হবে এবং তাদের বড় অংশই মিডওয়াইফ হিসেবে কাজ করবেন, যাতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া যায়।

‎একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, আগামী শনিবারের মধ্যে দেশের সব বেসরকারি ক্লিনিকে লেবার রুম স্থাপন করতে হবে। কোনো ক্লিনিক এ নির্দেশনা না মানলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে। সব বেসরকারি ক্লিনিকে মিডওয়াইফ নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে গর্ভবতী নারীরা স্থানীয় পর্যায়ে পরামর্শ পাবেন এবং স্বাভাবিক প্রসবে উৎসাহিত হবেন।

‎তিনি বলেন, ভয়ভীতি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণে মানুষকে বাধ্য করার সংস্কৃতি থেকে দেশকে বের করে আনতে হবে। মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা ছাড়া একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ‎অনুষ্ঠানের শেষদিকে মিডওয়াইফদের সংগঠন গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের সংগঠন মাতৃস্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

‎কর্মশালায় জানানো হয়, ৪০টা নরমাল ডেলিভারি পরে একজন ধাত্রী রেজিষ্ট্রেশন পান। প্রতি বছর মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে ৫৮০০ ধাত্রী দক্ষ হয়ে উঠেন। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে তাদের কাজের সুযোগ না থাকায় এ সকল ধাত্রীদের সিংহভাগই ঝরে পড়েন। এর মধ্যে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে বছরে শুধুমাত্র ৫০০ ধাত্রী কাজ করার সুযোগ পেলেও বাকীরা সাধারণ নার্স হিসাবে কাজ করেন। এতে শিশু জন্মের সময় দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পায়।

কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটির (বিএমএস) সভাপতি রোজিনা খাতুন, সাধারণ সম্পাদক হাসনা আখতার ও বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার হালিমা আখতার প্রমুখ।