Dhaka ০৭:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫ মাসে দেশে ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার: আইন ও সালিশ কেন্দ্র

নিজস্ব প্রতিবেদক
8 / 100 SEO Score

 

দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক এমন ঘটনায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত সাড়ে চার মাসে সারা দেশে অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গত দুই সপ্তাহেই ধর্ষণের পর অন্তত চার শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহি ও কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া শিশুদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। তারা বলছেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি সমাজের নৈতিক ভিত্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। এ পরিস্থিতিতে শিশু সুরক্ষায় পৃথক কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি কেবল বিচারিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ না থেকে ধর্ষকদের সামাজিকভাবেও চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশ্লেষকরা।

সংবিধানের ২৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদে শিশুদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় শিশু নীতিতে শিশুদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা ও বৈষম্যহীন বিকাশকে রাষ্ট্রের অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিকভাবেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ।

তবে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান দেশে শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছে আরও অন্তত ৪৬ শিশু। একই সময়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ১৭ শিশুকে। প্রতিটি ঘটনাই একটি শৈশবের নির্মম অবসান, একটি পরিবারের অসহনীয় ট্র্যাজেডি এবং সমাজে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এস এম আতিকুর রহমান বলেন, ‘বাইরের দেশে যাদের এই ধরনের মানসিকতা, তাদেরকে সমাজে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের এখানে এমনটা হয় না। বরং দেখা যায় শিশুরা একটি অনিরাপদ পরিবেশে বড় হচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘মৃত্যুটা (আমাদের দেশে) খুব সহজ হয়ে গেছে- যেন এটা কোনো ব্যাপার না। এই কোনো ব্যাপার না মানসিকতাটা আমাদের মধ্যে এমনভাবে ঢুকে গেছে, বিশেষ করে যারা অপরাধপ্রবণ মানুষ তাদের জন্য অপরাধ করাটা খুব সহজ হয়ে গেছে।’

প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, সমাজের নৈতিক অস্তিত্বও এতে জড়িত। এক্ষেত্রে রাজনীতিকদের দায়বদ্ধতা না থাকলে অবস্থা বদলাবে না, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, ‘যদি একটা চাইল্ড প্রোটেকশন কমিশন হয়, যারা শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রোটেকশনের ক্ষেত্রে সহায়তা করবে, যারা শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ করছে তাদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স থাকবে। আমি মনে করি, এই বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক এজেন্ডায় কখনোই গুরুত্ব দেওয়া হয় নাই।’

এ বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচনের আগে ইউনিসেফের একটি চাইল্ড রাইটস মেনিফেসটোতে (শিশু অধিকার ইশতেহার) স্বাক্ষর করে দেশের ১২টি রাজনৈতিক দল। কিন্তু তা সত্ত্বেও খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কার্যক্রমে এবং তাদের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে শিশু সুরক্ষা কতটুকু ধারণ করে সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে।’

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

৫ মাসে দেশে ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার: আইন ও সালিশ কেন্দ্র

Update Time : ০৪:৩৪:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
8 / 100 SEO Score

 

দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক এমন ঘটনায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত সাড়ে চার মাসে সারা দেশে অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গত দুই সপ্তাহেই ধর্ষণের পর অন্তত চার শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহি ও কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া শিশুদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। তারা বলছেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি সমাজের নৈতিক ভিত্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। এ পরিস্থিতিতে শিশু সুরক্ষায় পৃথক কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি কেবল বিচারিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ না থেকে ধর্ষকদের সামাজিকভাবেও চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশ্লেষকরা।

সংবিধানের ২৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদে শিশুদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় শিশু নীতিতে শিশুদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা ও বৈষম্যহীন বিকাশকে রাষ্ট্রের অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিকভাবেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ।

তবে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান দেশে শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছে আরও অন্তত ৪৬ শিশু। একই সময়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ১৭ শিশুকে। প্রতিটি ঘটনাই একটি শৈশবের নির্মম অবসান, একটি পরিবারের অসহনীয় ট্র্যাজেডি এবং সমাজে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এস এম আতিকুর রহমান বলেন, ‘বাইরের দেশে যাদের এই ধরনের মানসিকতা, তাদেরকে সমাজে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের এখানে এমনটা হয় না। বরং দেখা যায় শিশুরা একটি অনিরাপদ পরিবেশে বড় হচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘মৃত্যুটা (আমাদের দেশে) খুব সহজ হয়ে গেছে- যেন এটা কোনো ব্যাপার না। এই কোনো ব্যাপার না মানসিকতাটা আমাদের মধ্যে এমনভাবে ঢুকে গেছে, বিশেষ করে যারা অপরাধপ্রবণ মানুষ তাদের জন্য অপরাধ করাটা খুব সহজ হয়ে গেছে।’

প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, সমাজের নৈতিক অস্তিত্বও এতে জড়িত। এক্ষেত্রে রাজনীতিকদের দায়বদ্ধতা না থাকলে অবস্থা বদলাবে না, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, ‘যদি একটা চাইল্ড প্রোটেকশন কমিশন হয়, যারা শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রোটেকশনের ক্ষেত্রে সহায়তা করবে, যারা শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ করছে তাদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স থাকবে। আমি মনে করি, এই বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক এজেন্ডায় কখনোই গুরুত্ব দেওয়া হয় নাই।’

এ বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচনের আগে ইউনিসেফের একটি চাইল্ড রাইটস মেনিফেসটোতে (শিশু অধিকার ইশতেহার) স্বাক্ষর করে দেশের ১২টি রাজনৈতিক দল। কিন্তু তা সত্ত্বেও খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কার্যক্রমে এবং তাদের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে শিশু সুরক্ষা কতটুকু ধারণ করে সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে।’