Dhaka ০২:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিরাপদ পানিতেও ম্যাঙ্গানিজের ঝুঁকি

12 / 100 SEO Score

 

এত দিন ভূগর্ভস্থ পানির প্রধান উদ্বেগ ছিল আর্সেনিক। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, নিরাপদ মনে হওয়া পানিতেও লুকিয়ে থাকতে পারে আরেক নীরব হুমকি—ম্যাঙ্গানিজ। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৮ থেকে ২২ কোটি মানুষ অতিরিক্ত ম্যাঙ্গানিজযুক্ত ভূগর্ভস্থ পানি পান করছেন। গবেষকদের মতে, এ ঝুঁকির অন্যতম বড় কেন্দ্র বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার নদীবিধৌত অঞ্চল, যেখানে শিশুদের স্বাস্থ্য ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের।

ভূগর্ভস্থ পানিতে ম্যাঙ্গানিজের ঝুঁকির বৈশ্বিক মানচিত্র দেখা গেছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তরুণ পলিমাটি দ্বারা গঠিত নদী অববাহিকাগুলো ম্যাঙ্গানিজ দূষণের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ এই দূষণের অন্যতম প্রধান হটস্পট। এ ছাড়া ভিয়েতনামের মেকং বদ্বীপ, হ্যানয়ের রেড রিভার বদ্বীপ, পাকিস্তানের কিছু অংশ এবং আমেরিকার মিসিসিপি নদীর অববাহিকাতেও উচ্চ মাত্রার ম্যাঙ্গানিজ পাওয়া গেছে। মাটির নিচে কম অক্সিজেনযুক্ত পরিবেশে অণুজীবদের বিক্রিয়ার কারণে পলিতে থাকা ম্যাঙ্গানিজ অক্সাইড গলে পানিতে মিশে যায়।

ম্যাঙ্গানিজ মূলত মানবদেহের জন্য একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। মানুষ এটি খাবার থেকে গ্রহণ করে। তবে পানিতে এর মাত্রা বেশি হলে তা বিষে পরিণত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২১ সালে খাওয়ার পানিতে ম্যাঙ্গানিজের নিরাপদ মাত্রা প্রতি লিটারে ৪০০ মাইক্রোগ্রাম থেকে কমিয়ে মাত্র ৮০ মাইক্রোগ্রামে নামিয়ে এনেছে। অতিরিক্ত ম্যাঙ্গানিজ মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি শিশুদের বুদ্ধিমত্তা ও আচরণগত বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। ভূরসায়নবিদ মাইকেল বার্গ বলেন, এখন পর্যন্ত মূল ফোকাস ছিল আর্সেনিক, ফ্লোরাইড এবং নাইট্রেটের মতো পানিজনিত ঝুঁকির ওপর। এর বিপরীতে ম্যাঙ্গানিজকে এখনো বহুলাংশে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এটি কেবল মাঝেমধ্যে পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণার প্রধান লেখক এবং পরিবেশবিজ্ঞানী জোয়েল পোডগোর্স্কি জানিয়েছেন, এশিয়ার অঞ্চলগুলো অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। এখানকার জনসংখ্যার একটি বড় অংশ সরাসরি অনিরাপদ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করে। ইউরোপের পোরো বদ্বীপ কিংবা পোল্যান্ড থেকে জার্মানি পর্যন্ত ম্যাঙ্গানিজের ঝুঁকি থাকলেও সেখানকার মানুষ আধুনিক প্রযুক্তিতে পরিশোধিত পাইপের পানি পান করায় ঝুঁকিমুক্ত। কিন্তু এশিয়ায় সেই সুযোগ কম।

গবেষণায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। আর্সেনিক এবং ম্যাঙ্গানিজ একই ধরনের ভূরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হলেও এরা একই স্থানে একসাথে খুব কমই থাকে। মাত্র ৪ শতাংশ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এই দুটি উপাদান একসঙ্গে পাওয়া গেছে। জোয়েল পোডগোর্স্কি একটি বিশেষ সতর্কতা দিয়ে বলেন, কেউ যদি একটি নলকূপের পানি আর্সেনিক পরীক্ষা করে নিরাপদ পান, তবে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই পানিকে নিরাপদ ঘোষণা করতে পারবেন না। আপনাকে অবশ্যই ম্যাঙ্গানিজের জন্যও পরীক্ষা করতে হবে। তবে এই সমস্যা থেকে মুক্তির সহজ উপায়ও রয়েছে। ম্যাঙ্গানিজযুক্ত পানি অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে তা ধাতব অক্সাইডে পরিণত হয়ে নিচে জমা হয়। একটি সাধারণ বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থা এবং বালির ফিল্টার ব্যবহার করেই পানি থেকে ম্যাঙ্গানিজ পুরোপুরি দূর করা সম্ভব।

Recent Comments

No comments to show.

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

13 − 7 =

About Author Information

নিরাপদ পানিতেও ম্যাঙ্গানিজের ঝুঁকি

Update Time : ১২:৫৮:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
12 / 100 SEO Score

 

এত দিন ভূগর্ভস্থ পানির প্রধান উদ্বেগ ছিল আর্সেনিক। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, নিরাপদ মনে হওয়া পানিতেও লুকিয়ে থাকতে পারে আরেক নীরব হুমকি—ম্যাঙ্গানিজ। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৮ থেকে ২২ কোটি মানুষ অতিরিক্ত ম্যাঙ্গানিজযুক্ত ভূগর্ভস্থ পানি পান করছেন। গবেষকদের মতে, এ ঝুঁকির অন্যতম বড় কেন্দ্র বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার নদীবিধৌত অঞ্চল, যেখানে শিশুদের স্বাস্থ্য ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের।

ভূগর্ভস্থ পানিতে ম্যাঙ্গানিজের ঝুঁকির বৈশ্বিক মানচিত্র দেখা গেছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তরুণ পলিমাটি দ্বারা গঠিত নদী অববাহিকাগুলো ম্যাঙ্গানিজ দূষণের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ এই দূষণের অন্যতম প্রধান হটস্পট। এ ছাড়া ভিয়েতনামের মেকং বদ্বীপ, হ্যানয়ের রেড রিভার বদ্বীপ, পাকিস্তানের কিছু অংশ এবং আমেরিকার মিসিসিপি নদীর অববাহিকাতেও উচ্চ মাত্রার ম্যাঙ্গানিজ পাওয়া গেছে। মাটির নিচে কম অক্সিজেনযুক্ত পরিবেশে অণুজীবদের বিক্রিয়ার কারণে পলিতে থাকা ম্যাঙ্গানিজ অক্সাইড গলে পানিতে মিশে যায়।

ম্যাঙ্গানিজ মূলত মানবদেহের জন্য একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। মানুষ এটি খাবার থেকে গ্রহণ করে। তবে পানিতে এর মাত্রা বেশি হলে তা বিষে পরিণত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২১ সালে খাওয়ার পানিতে ম্যাঙ্গানিজের নিরাপদ মাত্রা প্রতি লিটারে ৪০০ মাইক্রোগ্রাম থেকে কমিয়ে মাত্র ৮০ মাইক্রোগ্রামে নামিয়ে এনেছে। অতিরিক্ত ম্যাঙ্গানিজ মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি শিশুদের বুদ্ধিমত্তা ও আচরণগত বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। ভূরসায়নবিদ মাইকেল বার্গ বলেন, এখন পর্যন্ত মূল ফোকাস ছিল আর্সেনিক, ফ্লোরাইড এবং নাইট্রেটের মতো পানিজনিত ঝুঁকির ওপর। এর বিপরীতে ম্যাঙ্গানিজকে এখনো বহুলাংশে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এটি কেবল মাঝেমধ্যে পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণার প্রধান লেখক এবং পরিবেশবিজ্ঞানী জোয়েল পোডগোর্স্কি জানিয়েছেন, এশিয়ার অঞ্চলগুলো অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। এখানকার জনসংখ্যার একটি বড় অংশ সরাসরি অনিরাপদ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করে। ইউরোপের পোরো বদ্বীপ কিংবা পোল্যান্ড থেকে জার্মানি পর্যন্ত ম্যাঙ্গানিজের ঝুঁকি থাকলেও সেখানকার মানুষ আধুনিক প্রযুক্তিতে পরিশোধিত পাইপের পানি পান করায় ঝুঁকিমুক্ত। কিন্তু এশিয়ায় সেই সুযোগ কম।

গবেষণায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। আর্সেনিক এবং ম্যাঙ্গানিজ একই ধরনের ভূরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হলেও এরা একই স্থানে একসাথে খুব কমই থাকে। মাত্র ৪ শতাংশ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এই দুটি উপাদান একসঙ্গে পাওয়া গেছে। জোয়েল পোডগোর্স্কি একটি বিশেষ সতর্কতা দিয়ে বলেন, কেউ যদি একটি নলকূপের পানি আর্সেনিক পরীক্ষা করে নিরাপদ পান, তবে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই পানিকে নিরাপদ ঘোষণা করতে পারবেন না। আপনাকে অবশ্যই ম্যাঙ্গানিজের জন্যও পরীক্ষা করতে হবে। তবে এই সমস্যা থেকে মুক্তির সহজ উপায়ও রয়েছে। ম্যাঙ্গানিজযুক্ত পানি অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে তা ধাতব অক্সাইডে পরিণত হয়ে নিচে জমা হয়। একটি সাধারণ বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থা এবং বালির ফিল্টার ব্যবহার করেই পানি থেকে ম্যাঙ্গানিজ পুরোপুরি দূর করা সম্ভব।