ডিজিটাল ঠিকানায় যুক্ত হচ্ছেন দেশের প্রতিটি নাগরিক
➤চার কোটি পরিবারের তথ্য নিয়ে তৈরি হবে সমন্বিত তথ্যভান্ডার
➤ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ ও মোবাইল নম্বর যুক্ত করার পরিকল্পনা
➤প্রথম ধাপে পাঁচ লাখ মানুষের তথ্য নিয়ে হবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম
➤নদীভাঙন, বস্তি ও ভাসমান জনগোষ্ঠীকেও আনার পরিকল্পনা
দেশের প্রতিটি নাগরিককে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ঠিকানার আওতায় আনতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ব্যবস্থায় একজন নাগরিকের প্রচলিত ঠিকানার পাশাপাশি তাঁর ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ ও মোবাইল নম্বরের মতো ডিজিটাল যোগাযোগের তথ্য যুক্ত করা হবে। পরিচয় যাচাইয়ের পর প্রত্যেক নাগরিককে দেওয়া হবে একটি নির্দিষ্ট ডিজিটাল পরিচিতি নম্বর। ওই নম্বরের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ঠিকানা ও প্রয়োজনীয় তথ্য শনাক্ত করার ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডাক অধিদপ্তরের ‘নাগরিক প্রান্তে বিদ্যমান ডাকসেবার সম্প্রসারণ ও সহজলভ্যকরণ’ প্রকল্পের আওতায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি চলতি বছরের মার্চে শুরু হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এর মধ্যে শুধু ডিজিটাল ঠিকানা ব্যবস্থাপনা তৈরির জন্য দুই কোটি টাকার বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ধাপে ধাপে দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারের তথ্য এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে একবারে এত বড় পরিসরে কাজ শুরু না করে প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে পাঁচ লাখ মানুষের তথ্য নিয়ে ব্যবস্থা চালু করা হবে। এই পর্যায়ে প্রযুক্তিগত কাঠামো, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, নাগরিকদের অংশগ্রহণ এবং ব্যবস্থাটির ব্যবহারিক কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। এরপর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরিধি বাড়ানো হবে।
পোস্টম্যানের বিট থেকে শুরু: ডিজিটাল ঠিকানা তৈরির ক্ষেত্রে ডাক বিভাগের বিদ্যমান কাঠামোকেই ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় পোস্টম্যানদের নির্দিষ্ট বিট রয়েছে। একজন পোস্টম্যানের দায়িত্বে কয়েক শ পরিবার থাকতে পারে। প্রথম পর্যায়ে এসব বিট এলাকা ডিজিটালভাবে চিহ্নিত করে একটি মানচিত্র তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এরপর প্রতিটি বিটের আওতায় থাকা পরিবার, বাড়ি, প্রতিষ্ঠান এবং ডাক পৌঁছানোর স্থান বা ডেলিভারি পয়েন্টের তথ্য সংগ্রহ করে একটি তথ্যভান্ডারে যুক্ত করা হবে। এভাবে ধাপে ধাপে পুরো দেশের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল ঠিকানা কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে দেশের অনেক এলাকায় ঠিকানা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতা রয়েছে। শহরের বেশির ভাগ এলাকায় বাড়ি বা সড়কের নম্বর থাকলেও গ্রামাঞ্চলের অনেক জায়গায় ব্যক্তির নাম, বাড়ির নাম, গ্রামের নাম বা স্থানীয় পরিচিতির ওপর নির্ভর করেই ঠিকানা শনাক্ত করতে হয়। একই নামে একাধিক ব্যক্তি বা বাড়ি থাকলে কিংবা ঠিকানায় প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকলে ডাক পৌঁছাতে সমস্যা হয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ডিজিটাল ঠিকানা চালু হলে এ ধরনের জটিলতা কমবে। একজন নাগরিকের অবস্থান ও যোগাযোগের তথ্য একটি নির্দিষ্ট ডিজিটাল পরিচিতির সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাঁকে শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় বার্তা বা সেবা পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।
শুধু ঠিকানা নয়, থাকবে ডিজিটাল পরিচিতিও: এই উদ্যোগের বিশেষ দিক হলো, এটি শুধু বাড়ি বা পরিবারের ঠিকানা নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। একজন নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজিটাল তথ্যও একই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ও মোবাইল নম্বরের মতো তথ্য যুক্ত করা হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে কোনো নাগরিকের কাছে প্রয়োজনীয় বার্তা, নোটিশ বা তথ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে ডাক বিভাগের প্রচলিত ব্যবস্থার পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
এর ফলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে যোগাযোগের একটি নতুন পথ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সরকারি সেবা, জরুরি তথ্য, নোটিশ কিংবা নাগরিকসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন যোগাযোগ দ্রুত করার ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা কাজে লাগতে পারে।
তবে এই ব্যবস্থার বাস্তব ব্যবহার কীভাবে হবে, কোন কোন সরকারি সংস্থা তথ্য ব্যবহার করতে পারবে এবং নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এসব বিষয় এখনো বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। প্রকল্পের কারিগরি কাঠামো তৈরি হওয়ার পর এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
কাঠামো নির্ধারণ করবে বুয়েট: ডিজিটাল ঠিকানা ব্যবস্থাপনার পুরো কাঠামো কীভাবে তৈরি হবে, তা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। ডাক বিভাগ এ বিষয়ে মূল ধারণা দিয়েছে। এরপর তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল পরিচিতি নম্বর এবং প্রযুক্তিগত বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারণ করবে বুয়েট।
‘নাগরিক প্রান্তে বিদ্যমান ডাকসেবার সম্প্রসারণ ও সহজলভ্যকরণ’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক সঞ্জিত চন্দ্র পণ্ডিত বলেন, ‘ডিজিটাল ঠিকানা ব্যবস্থাপনার পুরো কাঠামো কীভাবে তৈরি হবে, তা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারণ করবে। ডাক বিভাগ মূল ধারণাটি দিচ্ছে। এরপর কারিগরি দিক, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি ঠিক করবে বুয়েট।’
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে পাঁচ লাখ মানুষের তথ্য নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবস্থা চালু করা হবে। তাঁদের ডিজিটাল পরিচয় যাচাইয়ের পর একটি নম্বর দেওয়া হবে। ওই নম্বরের মাধ্যমে একজন নাগরিকের ঠিকানা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে।
নিজের তথ্য নিজেই হালনাগাদ করার সুযোগ: ডিজিটাল ঠিকানা ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখতে নাগরিকদের নিজের তথ্য নিজেরাই হালনাগাদ করার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। এ জন্য একটি ওয়েবসাইট বা অনলাইন ব্যবস্থা তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সচেতন ও প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম নাগরিকেরা ভবিষ্যতে নিজেরাই তাঁদের ঠিকানা ও প্রয়োজনীয় তথ্য অনলাইনে যুক্ত করতে পারবেন। ঠিকানা পরিবর্তন হলে সেটিও হালনাগাদ করার সুযোগ থাকবে।
তবে দেশের সব নাগরিকের প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এক নয়। অনেক মানুষ এখনো ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে অভ্যস্ত নন। আবার এমন মানুষও রয়েছেন, যাঁদের স্থায়ী ঠিকানা নেই। তাঁদের তথ্য অনলাইনে নিজেরা যুক্ত করার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে সেটি করা সম্ভব নাও হতে পারে।
এ কারণে এসব মানুষের তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক।
স্থায়ী ঠিকানা নেই যাঁদের: ডিজিটাল ঠিকানা তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে স্থায়ী ঠিকানাবিহীন জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা। বাংলাদেশে নদীভাঙনে প্রতিবছর অনেক মানুষ বসতভিটা হারিয়ে অন্য এলাকায় চলে যান। আবার শহরের বস্তি ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর অনেকের স্থায়ী ঠিকানা নেই। নদীনির্ভর ও যাযাবর জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডিজিটাল ঠিকানা ব্যবস্থার উদ্দেশ্যই হচ্ছে কোনো নাগরিককে ঠিকানার বাইরে না রাখা। তাই স্থায়ী ঠিকানা না থাকলেও তাঁদের কোনো না কোনোভাবে এই ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।
সঞ্জিত চন্দ্র পণ্ডিত বলেন, ‘যাদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই, তাদেরও রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে একটি ঠিকানা ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। তবে তাদের তথ্য সংগ্রহ ও ঠিকানা নির্ধারণের কাজটি প্রাথমিক পর্যায়ে পুরোপুরি করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে এ কাজ করা হতে পারে।’
অর্থাৎ ডিজিটাল ঠিকানা বলতে শুধু একটি বাড়ি বা সড়কের অবস্থান বোঝাবে না; বরং নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগের একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচিতিও এর অংশ হবে।
কাজে লাগতে পারে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্য: ডিজিটাল ঠিকানা ব্যবস্থাপনা তৈরিতে নতুন করে সব তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বিদ্যমান তথ্য কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক।
বিবিএসের বিভিন্ন জরিপ ও কার্যক্রমে পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব তথ্য ডিজিটাল ঠিকানা ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানো গেলে সময় ও ব্যয় দুটোই কমানো সম্ভব। তবে এসব তথ্যের অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির পূর্ণ নাম বা বিস্তারিত ঠিকানা নেই। ফলে সব তথ্য সরাসরি ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘আমরা আগে পুরো ব্যবস্থাটি তৈরি করতে চাই। এরপর এর ব্যবহার কতটা হচ্ছে এবং নাগরিকরা কীভাবে এটি ব্যবহার করছেন, তা দেখে ধাপে ধাপে পরিধি বাড়ানো হবে। এতে অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে।’
লক্ষ্য কেউ যেন ডিজিটাল ঠিকানার বাইরে না থাকেন: ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘নাগরিক প্রান্তে বিদ্যমান ডাকসেবার সম্প্রসারণ ও সহজলভ্যকরণ’ প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ডিজিটাল ঠিকানা ব্যবস্থাপনা।
তিনি বলেন, অনেক মানুষ নদীভাঙন বা আর্থিক কারণে স্থায়ী ঠিকানায় থাকেন না। তাঁদেরও একটি ডিজিটাল ঠিকানা থাকা প্রয়োজন। ই-মেইল, মোবাইল নম্বর বা অন্য ডিজিটাল পরিচিতির সঙ্গে ঠিকানার তথ্য যুক্ত করে একটি তথ্যভান্ডার তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
তাঁর ভাষায়, লক্ষ্য হচ্ছে দেশের কোনো নাগরিক যেন ডিজিটাল ঠিকানার বাইরে না থাকেন। বড় উদ্যোগ, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ: চার কোটি পরিবারের তথ্য এক ব্যবস্থায় আনার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের নাগরিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, নিয়মিত হালনাগাদ ও নিরাপদে সংরক্ষণ করা সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে ঠিকানাবিহীন জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করা এবং একই ব্যক্তির একাধিক বা ভুল তথ্য যেন তথ্যভান্ডারে যুক্ত না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এ ছাড়া নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য কারা ব্যবহার করতে পারবে, কীভাবে তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং কোনো তথ্য ভুল হলে তা সংশোধনের সুযোগ কীভাবে থাকবে এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এখন প্রকল্পটি রয়েছে প্রাথমিক বাস্তবায়ন পর্যায়ে। প্রথম ধাপে পাঁচ লাখ মানুষের তথ্য নিয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের ফলাফলই নির্ধারণ করবে পরবর্তী ধাপের গতি ও পরিধি। সেই পরীক্ষা সফল হলে ধীরে ধীরে চার কোটি পরিবারের তথ্য যুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে এগোবে ডাক বিভাগ।
এর ফলে ভবিষ্যতে একজন নাগরিককে শুধু তাঁর প্রচলিত ঠিকানা দিয়ে নয়, একটি ডিজিটাল পরিচিতি ও ডিজিটাল ঠিকানার মাধ্যমে শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর সেটিই হতে পারে দেশের নাগরিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার একটি নতুন ধাপ।




















